জাতিসংঘে বাংলাদেশ-সাইপ্রাস দ্বৈরথ: বিশ্বমঞ্চে জি-৭৭ ও ডিজিটাল কূটনীতির পরীক্ষা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশ্বমঞ্চে ড. খলিলুর রহমানের পক্ষে জি-৭৭ ও ডিজিটাল কূটনীতির প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ

জাতিসংঘে বাংলাদেশ-সাইপ্রাস দ্বৈরথ: বিশ্বমঞ্চে জি-৭৭ ও ডিজিটাল কূটনীতির পরীক্ষা
২ জুন, ২০২৬ ০০:০১  

২ জুন, মঙ্গলবার, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনে। ঐতিহাসিক এ ভোটকে কেন্দ্র করে বিশ্ব কূটনীতিতে এখন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। যদিও সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটিকে অনেকে প্রথাগত বা প্রোটোকলভিত্তিক হিসেবে দেখেন, যা জাতিসংঘ মহাসচিব বা নিরাপত্তা পরিষদের মতো নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন নয়; তবুও বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রতীকী নেতৃত্ব, বহুপক্ষীয় সংলাপের দিকনির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বার্তা বিনিময়ের ক্ষেত্রে এই পদের গুরুত্ব অপরিসীম। এবারের নির্বাচনটি বিশ্বমঞ্চে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যকার নজিরবিহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে। বাংলাদেশের হেভিওয়েট প্রার্থী ড. খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস কাকুরিসের এই লড়াই শুধু দুই ব্যক্তির নয়, বরং এটি দুই ভিন্ন কূটনৈতিক অবস্থান, আঞ্চলিক সমীকরণ এবং গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বরের এক বড় পরীক্ষা।

ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখণ্ডতা ও গণমাধ্যম উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এ এইচ এম বজলুর রহমান এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তনশীল বিন্যাসের এই যুগে বাংলাদেশের বিজয়ের জন্য দুটি অস্ত্র সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হতে পারে। প্রথমত, জি-৭৭ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৃহত্তম ব্লকের রাজনৈতিক সমর্থন বাংলাদেশ কতটা সুসংহত করতে পারছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ তার ‘ডিজিটাল কূটনীতি’ কতটা লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকরভাবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারছে। জাতিসংঘে সাধারণত ভৌগোলিক রোটেশনের ভিত্তিতে আগেই ঐকমত্যের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচন হওয়ায় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে না। তবে এবার একই পদের জন্য দুই দেশের এই সক্রিয় অবস্থান নির্বাচনটিকে কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। আপাতদৃষ্টিতে প্রতিটি রাষ্ট্রের একটি গোপন ব্যালটের সরল ভোট মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ লবিং, আঞ্চলিক সমর্থন ও নীরব দরকষাকষির জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ।

কূটনৈতিক বিশ্লেষণে সাইপ্রাসের বড় সুবিধা হলো তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রচারণা। নিকোসিয়া অনেক আগে থেকেই প্রচারণা শুরু করায় বিভিন্ন আঞ্চলিক গ্রুপ ও সদস্যরাষ্ট্রের আস্থা অর্জনে সময় পেয়েছে। তাদের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকুরিস ইউরোপীয় কূটনৈতিক পরিসরে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমা কূটনৈতিক নেটওয়ার্কের জোরালো সমর্থন পাচ্ছেন। অপরদিকে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমানও জলবায়ু কূটনীতি, অভিবাসন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে অত্যন্ত সুপরিচিত নাম। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী এবং প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বমঞ্চে অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের এই সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে গ্লোবাল সাউথ ও জি-৭৭ ভুক্ত দেশগুলোর একমাত্র নৈতিক কণ্ঠ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মোক্ষম সুযোগ পেয়েছে ঢাকা।

দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসাডর এ এইচ এম বজলুর রহমান আরও মনে করেন, জি-৭৭ কোনো একক ভোটব্যাংক না হওয়ায় শুধু গ্লোবাল সাউথের আবেগ দিয়ে ভোট মিলবে না। এখানে দরকার লক্ষ্যভিত্তিক, তথ্যসমৃদ্ধ ও বহুভাষিক সমন্বিত ডিজিটাল কূটনীতি। চিরাচরিত বন্ধ দরজার বৈঠকের বাইরে গিয়ে নিউইয়র্ক, জেনেভা, ব্রাসেলস বা রিয়াদের মতো প্রধান কূটনৈতিক কেন্দ্রগুলোর সাথে সমন্বয় করে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু নেতৃত্বের প্রমাণভিত্তিক সংক্ষিপ্ত বার্তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিতে হবে। ভূরাজনৈতিক মেরুকরণে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারে, কারণ তারা বৈশ্বিক সংস্থায় পশ্চিমা প্রভাবের বাইরে উন্নয়নশীল দেশের উত্থান চায়। অন্যদিকে ভারত আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ কৌশল অবলম্বন করতে পারে। একসময়ের দুর্যোগ ও সহায়তানির্ভর বাংলাদেশ আজ শান্তিরক্ষা ও ডিজিটাল কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে যে নতুন আত্মপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, ২ জুনের এই নির্বাচন মূলত তারই একটি ঐতিহাসিক ও দৃশ্যমান প্রতিফলন।

/ডিবিটেক/ বিআর/ ইকে/