ভবিষ্যৎ পেশাগত অনুশীলনের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে নৈতিক এআই
নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ঢাকায় সাফা আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত
দক্ষিণ এশিয়ার সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদদের (সাফা) নিয়ে রাজধানীর হোটেল নিকুঞ্জ সংলগ্ন লা মেরিডিয়েনে অনুষ্ঠিত হলো ‘পরবর্তী প্রজন্মের পেশা: নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেকসই প্রতিবেদন একীভূতকরণ’ বিষয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ১৭ জানুয়ারি, শনিবার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Ethical AI) বৈশ্বিক হিসাব পেশাকে কীভাবে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করিয়েছে এবং টেকসই প্রতিবেদন (Sustainability Reporting) কীভাবে ক্রমেই ব্যবসায়িক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং জনআস্থার রূপরেখা নতুনভাবে নির্ধারণ করছে।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) আয়োজিত সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিএবির সাবেক সভাপতি ও রহমান রহমান হক, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের সিনিয়র পার্টনার আদীব হোসেন খান।
তিনি বলেন, টেকসই প্রতিবেদন ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আর দূরবর্তী কোনো ধারণা নয়; এটি ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি, পরিমাপ ও প্রকাশের কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এনেছে।
প্রথমবারের মতো বিশ্বের শীর্ষ হিসাব পেশা সংস্থার প্রধান, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস (IFAC)-এর সভাপতি জ্যঁ বুকো আইসিএবির আমন্ত্রণে ঢাকায় এ সম্মেলনে অংশ নেন।
জ্যঁ বুকো বলেন, কেননা টেকসই প্রতিবেদন ও ভবিষ্যৎ পেশাগত অনুশীলনের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে নৈতিক এআই। তাই এই সম্মেলনের আলোচনা বৈশ্বিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসময় আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতার ওপর জোর দেন তিনি।
পেশাজীবী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও মান নির্ধারকদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে আইফাক প্রেসিডেন্ট জ্যঁ বুকো বলেন, সততা ও জনস্বার্থকে কেন্দ্র করে এআই পরিচালনা করতে পারলে হিসাববিদরা অনিশ্চয়তাকে সুযোগে পরিণত করতে পারবেন এবং একটি আরও টেকসই ও সহনশীল অর্থনীতি গঠনে অবদান রাখতে হবে।
সম্মেলনে জাতীয় নেতৃত্ব, হিসাববিদ ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কৌশলগত সংলাপ এবং জ্ঞানভিত্তিক আলোচনাতে অংশ নেন আফগানিস্তান, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকে আগত প্রতিনিধিরা। সম্মেলনে তিনটি টেকনিক্যাল সেশন ও একটি সমাপনী সেশনে- বক্তব্য ভবিষ্যৎ পেশা, এআই ও টেকসই প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এ এইচ এম আহসান এবং বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। আয়োজকদের মতে, তাদের উপস্থিতি হিসাব ও আর্থিক খাতে পেশাগত উৎকর্ষ, নৈতিক মান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে সরকারের দৃঢ় সমর্থনের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা, আস্থা ও সহযোগিতামূলক সমাধান প্রচারে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেকসই রিপোর্টিংয়ের সমন্বয় ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বিশ্বব্যাপী পেশাকে রূপান্তরিত করছে। একইসঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থার ওপর বৈশ্বিক গুরুত্ব বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জন্য প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়নের সমন্বয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং বৈশ্বিক সংহতি জোরদার করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেশাদারদের শুধু প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ হওয়া নয়, বরং নৈতিকভাবে দৃঢ় ও দায়বদ্ধ থাকা প্রয়োজন।
আইসিএবির সভাপতি এন কে এ মোবিন এফসিএ স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন কমিটির চেয়ারম্যান ও আইসিএবির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেন এফসিএ-ও বক্তব্য রাখেন।
অতিথি বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাফার উপদেষ্টা আশফাক ইউসুফ তোলা।
আইসিএবির সভাপতি এন কে এ মোবিন বলেন, এটি পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযাত্রা। নৈতিক এআই ও টেকসই প্রতিবেদনের পথে এগিয়ে যেতে সততা, নিরপেক্ষতা ও জনসেবার চিরন্তন মূল্যবোধই আমাদের পথ দেখাবে। বিশ্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি নৈতিক, দক্ষ ও দূরদর্শী হিসাববিদের প্রয়োজন অনুভব করছে। আইসিএবি বৈশ্বিক সর্বোৎকৃষ্ট মান বঝায় রাখতে বিভিন্ন পেশাগত পরিকল্পনা ও কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
টেকনিক্যাল অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক উল্লেখ করেন, আধুনিক টেকসই প্রতিবেদন এখন মূলধন বণ্টন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে, কারণ জলবায়ু ও সুশাসন সংক্রান্ত বিষয়গুলো মূল আর্থিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। হিসাব পেশার পরিসর এখন আর কেবল হিসাবরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঝুঁকি মডেলিং, মূল্যায়ন, নিরীক্ষা, অনুসন্ধান এবং নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এআই স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বিশ্লেষণ জোরদার করতে পারে, কিন্তু এর কোনো নৈতিক দায় বা ফিডিউশিয়ারি দায়িত্ব নেই। এই দায় সর্বদাই মানুষের ওপর বর্তায়, তাই নৈতিক অনুশাসন অপরিহার্য।
আদীব হোসেন খান জলবায়ু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, সরবরাহ শৃঙ্খলে কার্বন নিরূপণ এবং রিয়েল-টাইম ইএসজি কর্মদক্ষতা পর্যবেক্ষণের মতো উদীয়মান এআই প্রয়োগের কথা উল্লেখ করেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতার অভাব, বিচ্ছিন্ন ইএসজি তথ্য এবং পক্ষপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় যথাযথ নৈতিক কাঠামো না থাকলে জনআস্থা ক্ষুন্ন করতে পারে।
তিনি বলেন, নৈতিক এআইয়ের কাজ কেবল প্রতিবেদন স্বয়ংক্রিয় করা নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান উন্নত করা। উন্নত প্রযুক্তি দায়িত্ব কমায় না, বরং তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিরীক্ষা, জনস্বার্থ তদারকি ও মানদণ্ড অনুসরণে দীর্ঘদিনের ভূমিকার কারণে পেশাদার হিসাববিদরাই এই পরিবর্তনকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
এ এইচ এম আহসান বলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একইসঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। এআই-চালিত সিস্টেম দক্ষতা বৃদ্ধি ও কমপ্লায়েন্স জোরদার করতে পারে। তবে, শক্তিশালী নৈতিক সুরক্ষা ছাড়া এগুলো অ্যালগরিদমিক যোগসাজশ, অস্বচ্ছতা এবং বর্জনমূলক চর্চার মতো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ডিবিটেক/বিএসকে/ইকে







