১০ কোটি টাকার সেতুতে
সেতুর ফুটপাতের ঢালাইয়ে বাঁশ, প্রকৌশলী সাময়িক বরখাস্ত
- বাসাইলে নির্মাণাধীন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ
- মামলায় সাব-ঠিকাদার শাহ আলম গ্রেফতার; প্রধান আসামিকে গ্রেফতারে অভিযান
- এক প্রকৌশলী সাময়িক বরখাস্ত, দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ
টাঙ্গাইলের বাসাইলে প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগে মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) এক উপসহকারী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত এবং দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
২২ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাসাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর কবির গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে দুপুরে বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া সেতুর কাছ থেকে শাহ আলমকে গ্রেফতার করা হয়। ৪৪ বছর বয়সী শাহ আলম রংপুরের পীরগাছা উপজেলার বালাপাড়া এলাকার মৃত নবুর উদ্দিনের ছেলে।
বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বাদী হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। মামলার প্রধান আসামি ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর আলম এবং অপর আসামি সাব-ঠিকাদার শাহ আলম। ওসি আলমগীর কবির জানান, শাহ আলম গ্রেফতার হলেও প্রধান আসামি এসএম জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের স্বাক্ষরিত পৃথক অফিস আদেশ ও চিঠিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন এবং বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে আহ্বায়ক এবং বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেনকে সদস্য করা হয়েছে। কমিটিকে এক দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সেতুতে অন্য কোনো নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট কাজের ত্রুটি নিরসন ও দায়িত্বে গাফিলতির বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকেও কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে এলজিইডির ঢাকা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল মনজুর মুহাম্মদ ছাদেক সেতুটি পরিদর্শন করেন।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর ৯০ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। বাসাইল জিসি-কাউলজানী ইউপি ভায়া মাইজখাড়া জিপিএস সড়কের অংশ হিসেবে নির্মিত সেতুটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা। মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে কাজটি করছে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরির সময় রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন। স্থানীয়রা বাধা দিলে কাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা মোবাইল ফোনে এর ভিডিও ধারণ করেন। স্থানীয়রা চলে যাওয়ার পর আবার রাতে ঢালাইয়ের কাজ শুরু করে শেষ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
পরে স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সেতুটি পরিদর্শন ও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান বলেন, “ঠিকাদার এসএম জাহাঙ্গীর এবং সহকারী ঠিকাদার শাহ আলম তাদের অনুপস্থিতিতে রাতে কাউকে না জানিয়ে ওয়াকওয়ে ও ফুটপাতের ঢালাইয়ের কাজ করেন। বিষয়টিকে ত্রুটিপূর্ণ ও নিয়মবহির্ভূত। বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে। ঢাকা অঞ্চল ও টাঙ্গাইল এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ল্যাব টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ ঘটনায় সেতুর নির্মাণকাজে ব্যবহৃত অন্যান্য উপকরণও পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং ল্যাব পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
//ডিবিটেক/ বিটিওটিসি/ এসএমই/বিপিও//





