ডিজিটাল পরিসরে নারীর নিরাপত্তা: সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজে নয়, বাস্তবে চাই
- প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার সমান্তরালে সাইবার বুলিং ও ডিপফেকের মাধ্যমে নারীদের লক্ষ্যবস্তু করার হার মারাত্মকভাবে বাড়ছে।
- ইউএনএফপিএর তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি নারী অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি সুরক্ষার বাইরে।
- ফৌজদারি শাস্তির পাশাপাশি দেওয়ানি প্রতিকার এবং প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ (Tech-neutral) আধুনিক আইন প্রণয়ন জরুরি।
- ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে বৃহৎ প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
- ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ, বিশেষায়িত তদন্ত এবং ভুক্তভোগী সুরক্ষায় রুদ্ধদ্বার শুনানির আইনি বাধ্যবাধকতা প্রয়োজন।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে মানুষের বাস্তব জীবন আর ভার্চুয়াল জগতের মধ্যকার সীমারেখা কার্যত মুছে গেছে। তবে প্রযুক্তির এই অভাবনীয় অগ্রযাত্রার সাথে সাথে একটি অন্ধকার দিক ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে—তা হলো ‘প্রযুক্তি-সহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’ বা টেকনোলজি-ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার-বেসড ভায়োলেন্স (TFGBV)। সাইবার বুলিং, সম্মতিবিহীন অন্তরঙ্গ ছবি বা ডিপফেক ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইন স্টকিং থেকে শুরু করে চরিত্রহনন- ডিজিটাল পরিসরে নারী ও কন্যাশিশুরা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন কৌশলে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাস্তব পৃথিবীর মতো ডিজিটাল জগতেও নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক আইন ও বিচারব্যবস্থা এখনো অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA)-এর সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে উদ্বেগজনক চিত্র সামনে আসে। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি নারী এখনো অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি সুরক্ষার বাইরে। বিশ্বের মাত্র ৪০ শতাংশের কম দেশে সাইবার হয়রানি বিরোধী সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে এবং দেওয়ানি প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ দেশে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, আইন যেখানে রয়েছে, সেখানেও তা দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে অপরাধীরা প্রতিনিয়ত দায়মুক্তির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও সনদ—যেমন CEDAW, ICCPR কিংবা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক রেজ্যুলেশন—স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে: "অফলাইনে মানুষের যে অধিকার রয়েছে, তা অনলাইনেও সমানভাবে সুরক্ষিত হতে হবে"। কিন্তু এই নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন একটি আধুনিক, কার্যকর ও মানবাধিকারভিত্তিক আইনি মডেল কাঠামো।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে চারটি মৌলিক নীতিকে ভিত্তি হিসেবে ধরা জরুরি:
- ১. সম্মতি (Consent): আইনের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে ‘সম্মতি’, অপরাধীর তথাকথিত ‘উদ্দেশ্য’ নয়। সম্মতি হতে হবে অবাধ, সুনির্দিষ্ট ও প্রত্যাহারযোগ্য।
- ২. স্বায়ত্তশাসন ও এজেন্সি (Autonomy & Agency): ভুক্তভোগীকে কেবল ‘রক্ষার পাত্র’ হিসেবে না দেখে তার নিজস্ব পরিচয়, তথ্য ও সিদ্ধান্তের ওপর অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- ৩. আন্তঃবিভাগীয়তা (Intersectionality): প্রান্তিক, সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী নারী বা গণমাধ্যমে কাজ করা নারীদের বর্ধিত ঝুঁকি বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
- ৪. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা (Transparency & Accountability): রাষ্ট্র ও বৃহৎ প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম—উভয়কেই জনস্বার্থে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামোর জন্য ফৌজদারি শাস্তির পাশাপাশি দেওয়ানি ও প্রশাসনিক প্রতিকারের সমান গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আইনকে হতে হবে প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ (Tech-neutral), যেন নতুন কোনো এআই বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আসার সাথে সাথে আইনের কার্যকারিতা ফুরিয়ে না যায়। যুক্তরাজ্যের ‘অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট ২০২৩’-এর মতো স্পষ্ট আইন থাকা দরকার, যেখানে সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা কনটেন্ট প্রকাশ সরাসরি অপরাধ; অপরাধীর ক্ষতিকর উদ্দেশ্য প্রমাণের অজুহাতে মামলা ঝুলে থাকার সুযোগ সেখানে নেই।
একই সাথে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপের সময় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘Take It Down Act’ কিংবা জার্মানির ‘NetzDG’-এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে নির্দিষ্ট সময়ের (যেমন ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা) মধ্যে ক্ষতিকর বা সম্মতিবিহীন কনটেন্ট অপসারণের নোটিশ কার্যকরের বাধ্যবাধকতা থাকা প্রয়োজন; ব্যর্থতায় বড় অঙ্কের জরিমানা ও প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির সুস্পষ্ট বিধান থাকতে হবে।
পাশাপাশি তদন্ত প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার আবশ্যক। সনাতনী পুলিশিং দিয়ে সাইবার অপরাধের ডিজিটাল এভিডেন্স সংগ্রহ ও মেটাডেটা সংরক্ষণ সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত তদন্ত প্রোটোকল, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং সাক্ষ্য আইনে ডিজিটাল প্রমাণের সুস্পষ্ট গ্রহণযোগ্যতা। বিচার প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীর পরিচয় সুরক্ষায় ছদ্মনাম ব্যবহার ও ইন-ক্যামেরা বা রুদ্ধদ্বার শুনানির মতো সংবেদনশীল ব্যবস্থাও রাখা চাই।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মনে রাখা দরকার, সুরক্ষার নামে যেন এমন কোনো বিধিনিষেধ তৈরি না হয় যা নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করে। আবার আইনের কোনো অসতর্ক ফাঁদে পড়ে ভুক্তভোগী নারী নিজেই যেন পুনরায় হেনস্তার শিকার না হন।
ডিজিটাল দুনিয়া কোনো আইনহীন প্রান্ত নয়। নারীর জন্য ডিজিটাল মাধ্যমকে নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক করতে হলে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, সুনির্দিষ্ট বাজেট এবং কঠোর আইনি কাঠামোর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। অনলাইন পরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সমতা ও টেকসই উন্নয়নের যেকোনো প্রতিশ্রুতিই অর্থহীন হয়ে পড়বে।
লেখক || জেন্ডার-বেসড ভায়োলেন্স (GBV) বিশেষজ্ঞ, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA)
এডিটরস নোট || আলোচ্য নিবন্ধে ব্যক্ত মতামত লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও নীতিগত বিশ্লেষণ। ডিজিটাল পরিসরে নারীর মৌলিক মানবাধিকার ও কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদে লেখাটি সম্পাদকীয় প্রমিতকরণসহ প্রকাশ করা হলো।





