প্রোটোটাইপ বাণিজ্যিকীকরণে প্রয়োজন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও শিল্প সংযোগ
ইউসিটিসি’র মেডিবোটিক্স’ থেকে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এ জাতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক পাঁচটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন প্রদর্শন করেছে ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি চিটাগং (ইউসিটিসি)
- স্বাস্থ্যসেবা, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জ্বালানি, সামুদ্রিক তেল অপসারণ, কৃষি আইওটি ও মাইক্রো-পেল্টন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্ভাবনী সক্ষমতা তুলে ধরেন মেকানিক্যাল বিভাগের শিক্ষার্থীরা
- ডুয়েট ও কুয়েটের শীর্ষ অধ্যাপ
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণাগারে উদ্ভাবিত চমৎকার সব বৈজ্ঞানিক প্রোটোটাইপ কি কেবল মেলা প্রাঙ্গণ বা প্রদর্শনী হলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দেশের শিল্প ও মানুষের কল্যাণে পৌঁছাবে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘ইনোভেশন টু মার্কেট’ (উদ্ভাবন থেকে বাজারে) প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সম্প্রতি সমাপ্ত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এ এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সংগতি রেখে এই মেলায় অংশ নিয়ে প্রযুক্তি অঙ্গনের গভীর মনোযোগ কেড়েছে বন্দরনগরীর ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি চিটাগং (ইউসিটিসি)-এর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।
মেলায় ইউসিটিসির তরুণ উদ্ভাবক দল পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী উদ্ভাবন উপস্থাপন করে। প্রদর্শনী ও ডেলিগেশন সেশনটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিভাগের সমন্বয়ক মো. আবু বক্কর সিকদার, যা পরিদর্শনে আসা শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও বিচারকমণ্ডলীর সঙ্গে প্রযুক্তিগত আদান-প্রদানকে গতিশীল করে। ইউসিটিসির উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে—
মেডিবোটিক্স (Medibotix): স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা রোবোটিক্সে যুগান্তকারী এ প্রকল্পটির নেতৃত্বে ছিলেন শাফাত হাবিব জনি ও ইমরান মোহাম্মদ তাহসিন। এটি চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদের জন্য সহায়ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমৃদ্ধ রিমোট মনিটরিং ও হেলথ ডাটা অ্যানালাইটিক্স ব্যবস্থা।
প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন: পরিবেশ সুরক্ষায় ব্যবহৃত বর্জ্য প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের টেকসই মডেল। এ প্রকল্পের নেতৃত্বে ছিলেন মো. হানিফ হোসেন ও মোহাম্মদ আলী।
ডিস্ক স্কিমার অয়েল স্পিল রিকভারি: কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগরের বাস্তবতায় সামুদ্রিক জলজ পরিবেশ রক্ষায় তেল ছড়িয়ে পড়া রোধ ও তা দ্রুত অপসারণের কার্যকর যান্ত্রিক ব্যবস্থা, যা প্রস্তুত করেছেন অন্বয় দাস ও খালেদ রেজা।
আইওটি স্মার্ট এগ্রিকালচারাল রোবট: ডেটা প্রেডিকশনের মাধ্যমে জলবায়ু ও মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে ফসলের রোগবালাই শনাক্তকারী স্বয়ংক্রিয় কৃষি রোবট। দলনেতা হিসেবে কাজ করেছেন জিল্লুর রহমান ও সৈয়দ মো. খায়রুল ইসলাম।
স্মার্ট মাইক্রো-পেল্টন হুইল হাইড্রো স্টেশন: অফ-গ্রিড দুর্গম পাহাড় ও পাহাড়ি ছড়ার পানির প্রবাহ কাজে লাগিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জ্বালানি চাহিদা মেটানোর ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এর নেতৃত্বে ছিলেন মহিব উল্লাহ ও মোহাম্মদ খোরশেদ আলম।
প্রদর্শনীর দিনগুলোতে মেগা প্রকল্পগুলোর কারিগরি নিখুঁততার স্বীকৃতি হিসেবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকরা ইউসিটিসির শিক্ষার্থীদের সরাসরি তাদের অধীনে মাস্টার্স ও পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন।
তবে অ্যাকাডেমিক এমন ভূয়সী প্রশংসা ও স্বীকৃতির পরও মেলাটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের আরঅ্যান্ডডি (R&D) ব্যবস্থার এক দীর্ঘস্থায়ী সীমাবদ্ধতা ও প্যারাডক্স উন্মোচন করেছে। শিক্ষার্থীরা অসাধারণ প্রকৌশল মেধা দিয়ে ল্যাবে ‘প্রুফ-অব-কনসেপ্ট’ দাঁড় করালেও তা প্রায়শই তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক স্বীকৃতি বা বাজারে প্রবেশের বিনিয়োগ পেতে ব্যর্থ হয়। এর মূল বাধা কিন্তু মেধার ঘাটতি নয়; বরং ল্যাবরেটরি প্রোটোটাইপ থেকে স্ট্যান্ডার্ডাইজড শিল্পপণ্যে রূপান্তরের মধ্যে যে বিশাল কাঠামোগত দূরত্ব (Structural Chasm) রয়েছে, তা অতিক্রম করার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অভাব। একটি কার্যকর মডেলকে বাজারে আনতে হলে আধুনিক ম্যানুফ্যাকচারিং টুলস, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (আইপি) বা পেটেন্ট সুরক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি মূলধন এবং মাঠপর্যায়ের কঠোর পরীক্ষার প্রয়োজন হয়—যা এককভাবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে জোগান দেওয়া অসম্ভব।
আলাপকালে জানাযায়, ইউসিটিসির গবেষক দল এখন প্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রযুক্তিগুলোর ডিজাইন অপটিমাইজেশন, পেটেন্ট আবেদন এবং বাণিজ্যিক রূপরেখা তৈরির দিকে নজর দিচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ইনোভেশন ইকোসিস্টেমকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে হলে শুধু শিক্ষার্থীদের কৃতিত্বের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; প্রয়োজন সমন্বিত সরকারি ইনকিউবেশন অনুদান, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডের সহজলভ্যতা এবং দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সরাসরি আরঅ্যান্ডডি পার্টনারশিপ। বিশ্ববিদ্যালয় ও করপোরেট শিল্পের মধ্যে এই কার্যকর সেতুবন্ধন রচিত না হলে দেশীয় মেধাবীদের উজ্জ্বল সব উদ্ভাবন প্রদর্শনী হলের স্মারক স্মারক হয়েই থেকে যাবে।
//ডিবিটেক/ এনএপি/এসএমই/বিপিও//





