বাংলাদেশের এআই ভবিষ্যৎ?
অর্থবহ এআই সার্বভৌমত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন কম্পিউটিং সক্ষমতার পাশাপাশি
স্বাধীন গণমাধ্যম, জনসম্পৃক্ততা, বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী জবাবদিহি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুতই অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন অবকাঠামো হয়ে উঠছে। দেশগুলো প্রতিযোগিতা করছে সেমিকন্ডাক্টর, ক্লাউড, ডেটা সেন্টার, উন্নত কম্পিউটিং এবং দক্ষ মানবসম্পদের জন্য। একই সঙ্গে সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভাবছে, শক্তিশালী এআই ব্যবস্থাকে কীভাবে নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক রাখা যায়।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি।
আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে কম্পিউটিং সক্ষমতা, ডেটা শাসন, বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই, সাইবার নিরাপত্তা, মানবসম্পদ এবং বৈশ্বিক এআই শাসনে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে। কিন্তু এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়: গণমাধ্যমের ভূমিকা কী হবে?
এআই শাসন শুধু প্রযুক্তিবিদ, মন্ত্রণালয় বা কূটনীতিকদের বিষয় হতে পারে না। নাগরিকদের জানতে হবে, এআই তাদের চাকরি, শিক্ষা, কৃষি, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, নির্বাচন, তথ্যপ্রবাহ ও দৈনন্দিন জীবনকে কীভাবে বদলে দিচ্ছে।
তাই গণমাধ্যমকে এআই পরিবর্তনের শুধু দর্শক নয়, এআই শাসনের গণতান্ত্রিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
সার্বভৌমত্ব শুধু GPU নয়
এআই সার্বভৌমত্বের আলোচনায় সাধারণত প্রশ্ন ওঠে: চিপ কার হাতে, ডেটা সেন্টার কোথায়, ক্লাউড কে দিচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো পর্যাপ্ত কম্পিউটিং ক্ষমতা পাচ্ছে কি না।
এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সার্বভৌমত্বকে শুধু GPU, সার্ভার ও মেগাওয়াটে মাপা যায় না।
বাংলাদেশ যদি প্রযুক্তি ব্যবহার করে, কিন্তু সেই প্রযুক্তি কী করছে, কার স্বার্থে কাজ করছে, কী তথ্য ব্যবহার করছে এবং ভুল হলে দায় কার, তা স্বাধীনভাবে বোঝা ও প্রশ্ন করার সক্ষমতা না থাকে, তাহলে সেই সার্বভৌমত্ব অসম্পূর্ণ।
এখানেই সাংবাদিকতার ভূমিকা।
গণমাধ্যমকে প্রশ্ন করতে হবে: সরকারি সংস্থা যে এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, তার মালিক কে? সরকারি ডেটা কোথায় রাখা হচ্ছে? সংবেদনশীল তথ্য দেশের বাইরে যাচ্ছে কি? অ্যালগরিদম কে পরীক্ষা করছে? স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তে কোনো নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিকার কোথায়?
এসব কেবল প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়। এগুলো ক্ষমতা, অধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্ন।
প্রযুক্তির শব্দগুলোকে মানুষের ভাষায় রূপান্তর করতে হবে
সাধারণ মানুষ ‘কম্পিউট সার্বভৌমত্ব’, ‘ফাউন্ডেশন মডেল’, ‘অ্যালগরিদমিক জবাবদিহি’ বা ‘ডেটা গভর্ন্যান্স’ বুঝতে পারে না। ‘কম্পিউট সার্বভৌমত্ব’, ‘ফাউন্ডেশন মডেল’, ‘অ্যালগরিদমিক জবাবদিহি’ এবং ‘ডেটা গভর্ন্যান্স’ সাধারণ মানুষের কাছে দূরবর্তী।
গণমাধ্যম তথ্যগুলোকে মানুষের জীবনের প্রশ্নে রূপান্তর করে।
এআই কীভাবে পোশাকশ্রমিকের কাজ বদলাবে?
কৃষক বাজার ও আবহাওয়ার সঠিক তথ্য পাবে?
সরকারি সেবা সহজ হবে?
নজরদারি বাড়বে?
বাংলাভাষী মানুষ ইংরেজিভাষীর সমমানের এআই সেবা পাবে?
কোন কাজ হারাবে?
কোন নতুন কাজ তৈরি হবে?
এই প্রশ্নগুলো প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা সবার জন্য সমান করে।
উচ্ছ্বাস না, আতঙ্কও না।
এআই নিয়ে সংবাদে দুই রকমের প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে মানুষ এআই নিয়ে উচ্ছ্বাস করে, যেন এআই এলে উন্নতি নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে মানুষ এআই নিয়ে ভয় করে, যেন এআই এলে চাকরি, সাংবাদিকতা, মানুষের সিদ্ধান্ত শেষ হবে।
এখানে ব্যবহারকারীর তথ্য আছে: দুটিই ভুল।
এআইয়ের ফল নির্ভর করে এআই কীভাবে তৈরি, কীভাবে ব্যবহার এবং কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তার ওপর।
যদি কোনো সরকারি সংস্থা এআই ব্যবহার করে দক্ষতা বাড়ার দাবি করে, গণমাধ্যমকে জিজ্ঞেস করতে হবে, প্রমাণ কী? যদি কোনো কোম্পানি অ্যালগরিদম পক্ষপাতহীন বলে, তাহলে জানাতে হবে কোম্পানি কীভাবে অ্যালগরিদম পরীক্ষা করেছে।
ব্যবহারকারীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এই অংশে আছে। সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশ্ন এই অংশেও একই।
ক্ষমতা কার কাছে, এবং ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হয়?
ব্যবহারকারীর তথ্য এখানে দেওয়া আছে:
ডিপফেকের সময়ে মূল সক্ষমতা পরীক্ষা করা হবে।
জেনারেটিভ এআই এখন বাস্তবের মতো ভুয়া ছবি, ভুয়া কণ্ঠ, ভুয়া ভিডিও এবং ভুয়া লেখা সৃষ্টি করে। নির্বাচন, রাজনৈতিক উত্তেজনা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত বা দুর্যোগের সময় জেনারেটিভ এআই দ্বারা সৃষ্ট প্রভাব ভয়ানক হতে পারে।
নকল অডিও জনমত পরিবর্তন করতে পারে।
ভুয়া ছবি সহিংসতা উস্কে দিতে পারে।
ডিপফেক নারী সাংবাদিক বা মানবাধিকার কর্মীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
ব্যবহারকারীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য এখানে দেওয়া হল:
তাই তথ্য যাচাই শুধু ফ্যাক্ট-চেকারদের কাজ না। সব সংবাদকক্ষকে তথ্য যাচাইকে মৌলিক কাজ হিসেবে নিতে হবে।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ডিজিটাল তদন্তের জ্ঞান, সূত্র যাচাই, এআই নির্মিত কন্টেন্ট চেনা এবং প্রকাশে স্বচ্ছ নীতি চায়।
এআই যুগে গতি বাড়বে। যাচাইয়ের মূল্যও বাড়বে।
ঢাকার বাইরে এআই আলোচনা নিতে হবে
বাংলাদেশে এআই আলোচনা যদি ঢাকায় বেশি হয়, ইংরেজি ভাষায় হয় এবং প্রযুক্তিবিদদের উপর নির্ভর করে, তাহলে দেশের বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে।
প্রযুক্তি-সুবিধাপ্রাপ্ত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং ডিপফেকের নতুন ঝুঁকি নারীদের জন্য বাড়ছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী কৃষি এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে উপকার পেতে পারে, তবে ইন্টারনেট সংযোগ, উচ্চ খরচ এবং ভাষা বড় বাধা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সহায়ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে বড় সুবিধা পেতে পারে, শর্ত হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে।
কমিউনিটি মিডিয়া ও স্থানীয় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিটি মিডিয়া ও স্থানীয় গণমাধ্যম এআইকে সহজ বাংলায় ব্যাখ্যা করে, স্থানীয় অভিজ্ঞতা জাতীয় নীতিতে আনে, এবং মানুষে উদ্বেগ ও প্রত্যাশা তুলে ধরে।
এআইকে গণতান্ত্রিক করা মানে হল, যাদের জীবনে প্রযুক্তি পরিবর্তন হবে, সেসব মানুষকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা।
বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই জনস্বার্থের প্রশ্ন
অনেক এআই ব্যবস্থা এখনো ইংরেজিতে ভাল কাজ করে, বাংলায় কম। এআই ব্যবস্থার পার্থক্য যদি দীর্ঘ সময় থাকে, নতুন ডিজিটাল বৈষম্য দেখা দিতে পারে।
সরকারি চ্যাটবট ইংরেজিতে সঠিক, বাংলায় দুর্বল হলে, সরকারি চ্যাটবটের সমস্যা প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, সমান অধিকার ও প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন।
গণমাধ্যমকে জানতে হবে: বাংলা ডেটা কে তৈরি করছে? বাংলা ডেটায় আঞ্চলিক ভাষা ও উচ্চারণ আছে কি? বাংলা ডেটার মালিকানা কার? বাংলাদেশের গবেষকরা প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সক্ষমতা পায় কি?
ভাষা এখানে সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি—এই সবের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও।
সংবাদকক্ষেরও নিজস্ব এআই নীতি থাকা দরকার।
গণমাধ্যম অন্যদের এআই ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করবে, তবে গণমাধ্যমকে নিজের দায়িত্ব নিতে হবে।
এআই ট্রান্সক্রিপশন, অনুবাদ, গবেষণা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং নথি পর্যালোচনা সাংবাদিকদের সাহায্য করে। কিন্তু গোপন সূত্রের তথ্য যদি বাণিজ্যিক এআই প্ল্যাটফর্মে চলে যায়? এআই যদি ভুল তথ্য তৈরি করে? পাঠককে কখন জানাবে যে কনটেন্ট তৈরিতে এআই ব্যবহার করা হয়েছে?
প্রতিটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের Responsible AI Policy থাকা দরকার। Responsible AI Policy তে উৎসের গোপনীয়তা, তথ্য যাচাই, কপিরাইট, ডেটা সুরক্ষা, স্বচ্ছতা এবং মানবসম্পাদনার দায়িত্ব স্পষ্ট করা হবে।
নীতি হল: এআই সাংবাদিকতাকে সাহায্য করবে, কিন্তু সাংবাদিকের দায়িত্বের বদলে নয়।
প্রয়োজন হল 'Bangladesh Media and AI Governance Initiative'
Bangladesh Media and AI Governance Initiative গড়ে তোলা সম্ভব। Bangladesh Media and AI Governance Initiative-এ জাতীয় গণমাধ্যম, কমিউনিটি মিডিয়া, সাংবাদিকতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফ্যাক্ট-চেকার, নাগরিক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হতে পারে।
ব্যবহারকারীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এখানে:
সাংবাদিকদের AI literacy বাড়াবে, deepfake verification সক্ষমতা গড়ে তুলবে এবং newsroom AI guideline প্রণয়ন করবে। এরপর বাংলা ভাষায় AI সাংবাদিকতার উপকরণ তৈরি করবে এবং সরকারি AI ক্রয়, অ্যালগরিদম ও আন্তর্জাতিক AI শাসন নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা শক্তিশালী করবে। এভাবে সাংবাদিকতার গুণমান উন্নত হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের এআই ভবিষ্যৎ শুধু ডেটা সেন্টারের সংখ্যা, GPU কেনা বা AI কোম্পানির সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না।
প্রকৃত পরীক্ষা হবে অন্য জায়গায়।
নাগরিকরা কি জানে প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার হয়?
সাংবাদিকরা কি শক্তিশালী এআইকে প্রশ্ন করে?
মানুষ কি স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে?
নারী, তরুণ, গ্রামীণ মানুষ ও প্রান্তিক গোষ্ঠী কি নীতি আলোচনায় অংশ নেয়?
কম্পিউটিং ক্ষমতা দরকার। ডেটা দরকার। অবকাঠামো দরকার। তবে গণতান্ত্রিক নজরদারিও ততটাই দরকার।
এআই যুগে গণমাধ্যমের কাজ কেবল প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ ঘটার পর খবর দেওয়া নয়।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ গড়তে সমাজকে সচেতন করা এবং সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সাহায্য করা এখন সাংবাদিকতার নতুন কাজ।
লেখকঃ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)।





