চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষায় ধরা

যন্ত্রাংশের আড়ালে খণ্ডিত বিএমডব্লিউ আমদানি

  • চালানে বিএমডব্লিউ স্পোর্টস কারের খণ্ডিত অংশ পাওয়া গেছে
  • মিলেছে বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের সামনের অংশ ও পাঁচ ইসুজু ট্রাক
  • শুল্ক-কর ফাঁকি ও আমদানি নীতিমালা লঙ্ঘন তদন্ত করছে কাস্টমস

যন্ত্রাংশের আড়ালে খণ্ডিত বিএমডব্লিউ আমদানি
৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:১৬  

গাড়ির সাধারণ ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা একটি চালানে মিলেছে খণ্ডিত বিলাসবহুল ও বাণিজ্যিক যানবাহনের অংশ। কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষায় একটি দুই আসনের বিএমডব্লিউ স্পোর্টস বা রেসিং কার, একটি বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের সামনের অংশ এবং পাঁচটি খণ্ডিত ইসুজু ট্রাক শনাক্ত হয়েছে। ঘোষিত পণ্য ও বাস্তবে পাওয়া পণ্যের এই বড় অসামঞ্জস্যকে সম্ভাব্য শুল্ক-কর ফাঁকি, আমদানি ঘোষণায় কারচুপি এবং খণ্ডিত অংশ জোড়া দিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরির সম্ভাব্য কৌশলের দিক থেকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর (সিআইআইডি)।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) চট্টগ্রাম বন্দরে সন্দেহভাজন চালানটির কায়িক পরীক্ষা করে এসব অসঙ্গতি শনাক্ত করা হয়। বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল আমিন শেখ এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানান।

যন্ত্রাংশের নামে গাড়ি

কাস্টমস গোয়েন্দা জানায়, চালানটির আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আয়াজ অটো ইন্টারন্যাশনাল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরব জাপান ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস কোম্পানি এলএলসি থেকে চালানটি রপ্তানি করা হয়েছে।

চালানটিতে ব্যবহৃত গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় ঘোষিত পণ্যের ধরন ও অবস্থার সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের বড় ধরনের পার্থক্য ধরা পড়ে।

পরীক্ষার সময় প্রথমে খণ্ডিত অবস্থায় একটি দুই আসনের বিএমডব্লিউ স্পোর্টস বা রেসিং কার পাওয়া যায়। কাস্টমসের প্রাথমিক ধারণা, গাড়িটির মডেল ‘এস ড্রাইভ ২৩আই’। এর ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৫০০ সিসি এবং এটি ২০০৯ সালের মডেল হতে পারে বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে গাড়িটির সঠিক মডেল, উৎপাদন সাল, চেসিস নম্বর, ভিআইএন এবং বাংলাদেশে আমদানির বৈধতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও কারিগরি যাচাই শেষে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হবে।

মিলেছে বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের সামনের অংশ

চালানটিতে একটি বিএমডব্লিউ ৭৪০আই গাড়ির খণ্ডিত সামনের অংশও পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটি ২০১৬ সালের মডেল এবং এর ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার সিসি।

তবে গাড়িটির বাকি অংশের অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। চালানটিতে শুধু সামনের অর্ধাংশ পাওয়া গেছে। বাকি অংশ আগে অন্য কোনো চালানে দেশে আনা হয়েছে কি না, অথবা পরবর্তী কোনো চালানে আনার চেষ্টা চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দা।

কর্মকর্তারা মনে করছেন, খণ্ডিত গাড়ির বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদা চালানে এনে পরে সেগুলো পুনঃসংযোজনের কোনো কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পাঁচটি খণ্ডিত ইসুজু ট্রাক

বিএমডব্লিউর পাশাপাশি চালানটিতে পাঁচটি খণ্ডিত ইসুজু ট্রাকও পাওয়া গেছে। এসব ট্রাকের কেবিনের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের গাড়ির যন্ত্রাংশ প্যাক করে রাখা হয়েছিল।

চালানটিতে আরও বিভিন্ন ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে। ফলে শুধু ঘোষণার অসঙ্গতিই নয়, পণ্য আমদানির প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এসব পণ্যের প্রকৃত মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কাস্টমস গোয়েন্দা উদ্ধার হওয়া সব পণ্যের বিস্তারিত তালিকা তৈরি করছে। প্রতিটি গাড়ি বা গাড়ির অংশের চেসিস নম্বর, ভিআইএন, ইঞ্জিনের তথ্য এবং প্রকৃত মূল্যও যাচাই করা হচ্ছে।

শুল্ক-কর ফাঁকির আশঙ্কা

ঘোষিত পণ্য এবং কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া পণ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় বিষয়টি তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইআইডি।

তদন্তে ঘোষণায় কারচুপি, প্রকৃত পণ্যের তুলনায় কম মূল্য দেখিয়ে শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা এবং খণ্ডিত গাড়ির অংশ আলাদা চালানে এনে পরে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাব্য পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে বিএমডব্লিউ ৭৪০আইয়ের বাকি অর্ধাংশের অবস্থান জানতে সংশ্লিষ্ট অন্য চালানের তথ্যও যাচাই করা হবে। একই আমদানিকারক বা রপ্তানিকারকের মাধ্যমে এর আগে বা পরে একই ধরনের কোনো চালান এসেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নথিপত্র ও প্রকৃত মূল্য যাচাই

উদ্ধার হওয়া পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমদানি করা গাড়ি বা গাড়ির অংশের মূল্য কম দেখানো হলে তা শুল্ক-কর নির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে প্রতিটি গাড়ির মডেল, উৎপাদন সাল, ইঞ্জিন ক্ষমতা, চেসিস নম্বর ও ভিআইএন যাচাই করা হবে। পাশাপাশি আমদানি নথি, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব এন্ট্রি এবং অন্যান্য কাগজপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছে।

আমদানি করা পণ্যগুলো দেশের প্রচলিত আমদানি নীতি এবং শুল্ক-কর কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তাও যাচাই করা হবে।

আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে

তদন্তে ঘোষণায় কারচুপি, শুল্ক-কর ফাঁকি কিংবা আমদানি নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।

এ ক্ষেত্রে কাস্টমস আইন, ২০২৩ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য বিধিবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ বা এ ধরনের সাধারণ পণ্যের ঘোষণার আড়ালে গাড়ি কিংবা গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমদানির চেষ্টা ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।

কর্মকর্তারা বলছেন, একটি চালান পরীক্ষা করেই তদন্ত শেষ করা হচ্ছে না। একই ধরনের পণ্যের অতীত ও পরবর্তী চালানও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে খণ্ডিত গাড়ির অংশ আলাদা চালানে এনে দেশে সম্পূর্ণ গাড়ি তৈরি বা পুনঃসংযোজনের কোনো কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

//ডিবিটেক/বিটিআর/এসএমই/এমএসআই//