ছয় মাসে ডিজিটাল ব্যাংক, সঙ্গে ন্যানো-ঋণ ও সর্বত্র পেমেন্টের পরিকল্পনা
মুক্ত পে ঘিরে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নতুন স্বপ্ন
- আগামী ছয় মাসের মধ্যে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর লক্ষ্যে কাজ করছে ভিওন
- তিন মাস মুক্তপেতে লেনদেনে থাকছে না কোনো সার্ভিস চার্জ
- স্টারলিংক সংযোগ ও ব্যাটারি ব্যাকআপে নিরবচ্ছিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার পরিকল্পনা
বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবার বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে যাচ্ছে ভিওন গ্রুপের ফিনটেক উদ্যোগ ‘মুক্তপে’। শুধু মোবাইল ফোনে টাকা লেনদেন নয়, বরং ডিজিটাল ব্যাংকিং, ক্ষুদ্রঋণ, সর্বত্র পেমেন্ট সুবিধা এবং বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের মধ্যেও নিরবচ্ছিন্ন আর্থিক লেনদেন নিশ্চিত করার বৃহত্তর পরিকল্পনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে প্ল্যাটফর্মটি। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর লক্ষ্য ঘোষণা করেছে ভিওন। একই সঙ্গে স্টারলিংক স্যাটেলাইট সংযোগের উপযোগী করে অ্যাপ্লিকেশন তৈরি এবং প্রতিটি পেমেন্ট টার্মিনাল ও মোবাইল ফোনে মুক্তপেকে যুক্ত করার পরিকল্পনাও তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ নেতৃত্ব।
৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার রাজধানীর ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্ট বাই আইএইচজি হোটেলে ভিওন গ্রুপের প্রথম বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভা উপলক্ষে আয়োজিত ‘ভিওন বোর্ড প্রেস মিট’-এ এসব পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানের সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তপে চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে আগামী তিন মাস মুক্ত পে-তে লেনদেনে কোনো সার্ভিস চার্জ কাটা হবে না বলেও জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভিওনের প্রতিষ্ঠাতা ও বোর্ড চেয়ারম্যান অগি কে ফাবেলা, ভিওন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও বোর্ড সদস্য কান তেরজিও গ্লো এবং বাংলালিংকের সিইও ইওহান বুসে। এ ছাড়া ভিওনের বোর্ড সদস্য আন্দ্রেই গুসেভ, স্যার ব্র্যান্ডন লুইস, ডানকান পেরি ও মিশেল সোয়েটিং উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সঞ্চালনা করেন বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান।
ছয় মাসে ডিজিটাল ব্যাংকের লক্ষ্য
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভিওন গ্রুপের সিইও ও বোর্ড সদস্য কান তেরজিওগ্লো মুক্ত পের সঙ্গে বিদ্যমান পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর পার্থক্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সহজ ব্যবহার, সাবলীল লেনদেন এবং সাশ্রয়ী খরচ হবে মুক্তপের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
তিনি বলেন, “মুক্ত পে এবং বিদ্যমান অন্যান্য পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মধ্যে পার্থক্য কী? এক নম্বর: এটি সহজ, সাবলীল এবং অনেক বেশি সাশ্রয়ী।”
তেরজিও গ্লোর মতে, সমাজের মানুষের সুপ্ত সম্ভাবনা উন্মোচনে সাশ্রয়ী আর্থিক লেনদেনের সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে লেনদেনের খরচ ও বিদ্যমান আর্থিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা অনেক মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির পথে বাধা হয়ে রয়েছে।
মুক্তপের পরবর্তী বড় লক্ষ্য ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দুই নম্বর: ডিজিটাল ব্যাংক। আমরা আগামী ছয় মাসের মধ্যে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর লক্ষ্যে কাজ করছি। বর্তমানে বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক প্রায় নেই বললেই চলে।”
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব দেশেও আট-নয় বছর আগে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বর্তমান বিস্তার ছিল না। ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রাহক তাৎক্ষণিক লেনদেন করতে পারবেন, কম খরচে ব্যাংকিং সেবা পাবেন এবং তাঁর মোবাইল ফোনই কার্যত ব্যাংক হিসেবে কাজ করবে। এতে প্রচলিত ব্যাংক শাখার ওপর নির্ভরতা কমবে।
রিকশাচালকের জন্যও ন্যানো-ঋণ
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ বা ন্যানো-লোনের কথা তুলে ধরেন ভিওন সিইও। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে ভিওনের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মতো বাংলাদেশেও প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্রঋণ সাধারণ মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজন রিকশাচালক সকালে রিকশার দৈনিক জমা দেওয়ার জন্য অল্প পরিমাণ ঋণ নিতে পারেন। সারাদিন রিকশা চালিয়ে উপার্জনের পর দিনশেষেই সেই ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন।
তেরজিওগ্লোর মতে, এ ধরনের আর্থিক সেবা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের জন্য এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, “ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ মানুষের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই এবং তারা সুযোগবঞ্চিত। পুরো বিষয়টাই কিন্তু সুযোগ তৈরির।”
এই বক্তব্যে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের লক্ষ্য শুধু বিদ্যমান ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য বিকল্প সেবা তৈরি করা নয়, বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার বিষয়টিও উঠে আসে।
লেনদেনের স্বচ্ছতায় কর আদায়ের সম্ভাবনা
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাবের আরেকটি দিক হিসেবে দেশের কর আদায় ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন তেরজিওগ্লো। তাঁর মতে, বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার কম।
তিনি বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং এ সমস্যার সমাধান সহজ করতে পারে। কারণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় প্রতিটি লেনদেন শনাক্তযোগ্য বা ট্রেসেবল হবে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে, যা আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে নগদ অর্থের ব্যবহার অনেক কমে এসেছে। অধিকাংশ মানুষ কার্ড কিংবা মোবাইল ফোন ট্যাপ করে লেনদেন করেন।
ডিজিটাল লেনদেনের আরও দুটি সুবিধার কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রথমত, নগদ টাকা ছাপানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যয় কমানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, নগদ অর্থ সঙ্গে বহন করার তুলনায় ডিজিটাল লেনদেন অধিক নিরাপদ হতে পারে।
তবে তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষকে সমাজে আরও উৎপাদনশীল ও স্বাবলম্বী করে তোলাকেই তিনি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন।
স্টারলিংক উপযোগী হবে মুক্ত পে
মুক্তপের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শুধু ডিজিটাল ব্যাংকিং নয়, নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দুর্যোগ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অ্যাপ্লিকেশনটিকে স্টারলিংক স্যাটেলাইট সংযোগের উপযোগী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন কান তেরজিওগ্লো।
তিনি বলেন, “মুক্ত পে অ্যাপ্লিকেশনটিকে স্টারলিংক স্যাটেলাইটের সঙ্গে কাজ করার উপযোগী হতে হবে। অ্যাপ্লিকেশনটিকে এমনভাবে অপ্টিমাইজ বা প্রস্তুত করতে হবে, যাতে এটি দেশের যেকোনো জায়গা থেকে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারে। আর এভাবেই আমরা ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলব।”
এর জবাবে বাংলালিংকের সিইও ইওহান বুসে বলেন, “এটিই হুবহু আমাদের পরিকল্পনা। হোমওয়ার্ক দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!”
তিনি আরও বলেন, মুক্তপেকে প্রতিটি পেমেন্ট টার্মিনাল এবং প্রতিটি মোবাইল ফোনের সঙ্গে যুক্ত থাকা উচিত। কারণ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে কোনো বিক্রেতা বা মার্চেন্ট লেনদেন করতে না পারলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এ ধরনের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলালিংকের হোম ওয়াইফাই সেবার উদাহরণ দেন বুসে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির হোম ওয়াইফাই সেবায় ব্যাটারি ব্যাকআপ থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলেও অনেক ব্যবসায়ী তাঁদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেন। মার্চেন্টদের কাছ থেকে এমন অভিজ্ঞতার কথা শোনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যে মুক্তপের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসে—শুধু অ্যাপভিত্তিক পেমেন্ট সেবা নয়, বরং বিদ্যুৎ ও সংযোগের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ব্যবসায়িক লেনদেন সচল রাখার সক্ষমতা তৈরি করা।
টেলিকম অপারেটর থেকে ডিজিটাল অপারেটর
অনুষ্ঠানে ভিওনের প্রতিষ্ঠাতা ও বোর্ড চেয়ারম্যান অগি কে ফাবেলা এবং গ্রুপ সিইও কান তেরজিওগ্লো তাঁদের বক্তব্যে টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান থেকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবাদাতা হিসেবে ভিওনের রূপান্তরের কৌশল তুলে ধরেন।
বাংলালিংকের সিইও ইওহান বুসে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা এবং বিনোদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল আর্থিক সেবায় সম্প্রসারণ নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেন।
ভিওন সিইও বলেন, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি হলেও গ্রাহক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নেটওয়ার্কের ওপর নির্মিত ডিজিটাল সেবাগুলোই তাদের আলাদা পরিচয় তৈরি করছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইউক্রেন ও কাজাখস্তানসহ যেসব দেশে ভিওন কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেখানে টেলিযোগাযোগের পাশাপাশি আর্থিক সেবা, বিনোদন, মার্কেটপ্লেস, ডেলিভারি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ক্লাউড ও এআই সেবায় বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব ডিজিটাল সেবা বর্তমানে ভিওনের মোট ব্যবসার প্রায় ৩০ শতাংশ। প্রতিবছর এই অংশ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে তা ৫০ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি ভিওনের ৩৫ বছরের বিবর্তনের কথাও তুলে ধরেন। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা ছিল টেলিফোন কলের মিনিট বিক্রি। পরে এসএমএস, থ্রিজি ইন্টারনেট, মেগাবাইট ও গিগাবাইটভিত্তিক সেবার বিস্তার ঘটে। কিন্তু এখন শুধু মিনিট, এসএমএস কিংবা ডেটা বিক্রি নয়, বরং গ্রাহকের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
এই রূপান্তরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে টফি, রাইজসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা চালু করা হচ্ছে।
স্যাটেলাইট সংযোগে নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা কাটানোর উদ্যোগ
ভিওন সিইও তাঁর বক্তব্যে স্যাটেলাইট সংযোগের গুরুত্বও তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে স্যাটেলাইট সংযোগ এবং প্রচলিত স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্ককে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কিছু এলাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকৌশলীদের পক্ষে নেটওয়ার্ক স্থাপনা বা মেরামতের কাজ করা সম্ভব হয় না। কোথাও স্থলমাইন থাকার কারণে প্রচলিত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো পরিচালনা করাও কঠিন। কাজাখস্তানের বিশাল ভৌগোলিক আয়তন এবং প্রত্যন্ত মরু অঞ্চলেও স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বন্যা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইট সংযোগ বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তার দাবি, বিশ্বজুড়ে ডিরেক্ট-টু-ডিভাইস (ডিটুডি) স্যাটেলাইট কভারেজের ৬০ শতাংশ এখন ভিওনের আওতায়। এ সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের সরকারের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। দুর্যোগকবলিত এলাকায় অন্তত একটি এসএমএসের মাধ্যমে কেউ নিজের নিরাপত্তার খবর জানাতে পারলেও সেটি মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ভিওন সিইও বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলাদেশের মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে। তিনি একটি শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো এবং সাশ্রয়ী এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
টফি, রাইজ ও নতুন ডিজিটাল সেবা
অনুষ্ঠানে বাংলালিংকের বিদ্যমান ও নতুন ডিজিটাল সেবাগুলোর বিভিন্ন তথ্যও তুলে ধরা হয়। প্রতিষ্ঠানটির বিনোদনভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম টফির মাসিক ব্যবহারকারীসংখ্যা ৭০ লাখ বলে জানানো হয়।
প্রায় পাঁচ কোটি তরুণকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এআইনির্ভর লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘রাইজ’ চালু করেছে বাংলালিংক। পাশাপাশি স্মার্টফোনকে আরও সাশ্রয়ী করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির ডিভাইস ব্র্যান্ড ‘টেকভ্যান’ কাজ করছে।
গত দুই মাসে চারটি বিশেষ সেবা চালুর মাধ্যমে টেলিকম অপারেটর থেকে ডিজিটাল সেবাদাতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলালিংক। এসব সেবার মধ্যে রয়েছে টফি, রাইজ, সর্টারলিংক ও মুক্ত অ্যাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন ফিনটেক উদ্যোগ মুক্তপে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম অপারেটর হিসেবে স্টারলিংক-চালিত ডিরেক্ট-টু-সেল সেবা চালুর কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।
বাংলালিংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই দশকে প্রতিষ্ঠানটি দেশের বাজারে নতুন প্রতিযোগী থেকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অপারেটরে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে দেশজুড়ে চার কোটি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশে ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এবং ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার কর প্রদানের পাশাপাশি ১০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরির তথ্যও তুলে ধরা হয়।
সরকারের ‘ডিজিটাল ফর অল’ উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশজুড়ে সংযোগ ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েও এগোচ্ছে বাংলালিংক।
প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র আর্থিক অন্তর্ভুক্তি
মুক্তপের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলালিংকের সামনে এখন শুধু টেলিযোগাযোগ কিংবা বিনোদন সেবার প্রতিযোগিতা নয়, আর্থিক প্রযুক্তির বাজারেও নতুন অবস্থান তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম থেকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংকে রূপান্তর, ন্যানো-ঋণ চালু এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন লেনদেন নিশ্চিত করার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নই হবে পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
বিশেষ করে ছয় মাসের মধ্যে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর লক্ষ্য, তিন মাসের বিনা সার্ভিস চার্জের ঘোষণা এবং স্টারলিংক-উপযোগী পেমেন্ট অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা মুক্তপেকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যেই এই প্লাটফর্মে যুক্ত হয়েছে ১১টি ব্যাংক। বেশ কিছু ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট সুবিধা।
প্রযুক্তির এই উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবার বাজারে মুক্তপের প্রকৃত অবস্থান।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই/এমআইএসটি//





