স্তন ক্যানসার জয়ের পর সুস্থ জীবন: পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও সম্মিলিত পুনর্বাসন

স্তন ক্যানসার জয়ের পর সুস্থ জীবন: পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও সম্মিলিত পুনর্বাসন
৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৭:২৫  

[হাইলাইটস]

  • ক্যানসার জয় কেবল বেঁচে থাকা নয়, মানসম্মত জীবনযাপন: বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৩,০০০ নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন; চিকিৎসার পর দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ দূর করতে সুষম খাবার ও নিয়মিত সক্রিয়তা অপরিহার্য।

  • স্থানীয় সাশ্রয়ী পুষ্টি ও অবৈজ্ঞানিক ট্যাবু বর্জন: দামি সাপ্লিমেন্ট নয়, স্থানীয় ডাল, ডিম, ছোট মাছ ও শাকসবজি থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত সম্ভব; চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভেষজ বা চরম ডায়েট পরিহার করা আবশ্যক।

  • পারিবারিক সহায়তা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন: গৃহস্থালির দৈনন্দিন কাজ ব্যায়ামের বিকল্প নয়; প্রতি সপ্তাহে ১৫০–৩০০ মিনিট হাঁটা এবং নারীদের পুনর্বাসনে পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব ভাগাভাগি ও মানসিক সমর্থন দেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশে একজন নারীর জন্য স্তন ক্যানসারের চিকিৎসাপর্ব শেষ হওয়া নিঃসন্দেহে এক গভীর স্বস্তির মুহূর্ত। দীর্ঘ কয়েক মাসের নিবিড় হাসপাতাল পরিদর্শন, অস্ত্রোপচার (সার্জারি), কেমোথেরাপি কিংবা রেডিওথেরাপির শারীরিক ও মানসিক ধকল সামলে প্রাত্যহিক স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা এক বিরাট বিজয়। তবে চিকিৎসার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পর এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর ঠিক কী ঘটে? আমাদের মায়েরা, বোনেরা বা ক্যানসার জয়ী নারীরা কি দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি, শারীরিক সক্রিয়তা ও মানসিক সহায়তা পাচ্ছেন?

ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (IARC)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১৩,০০০ নারী নতুন করে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন—যা আমাদের দেশে নারীদের মধ্যে শনাক্ত হওয়া ক্যানসারগুলোর মধ্যে শীর্ষে। তবে প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও সরাসরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে জনসচেতনতা কিছুটা বাড়লেও, ক্যানসার জয়ীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য, পুনর্বাসন ও জীবনমানের (Quality of Life) বিষয়টি এখনো অনেকটাই উপেক্ষিত থেকে যায়।

স্তন ক্যানসার জয় করার অর্থ কেবল দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা নয়; বরং আত্মমর্যাদা ও পূর্ণ সুস্থতা নিয়ে মানসম্মত জীবনযাপন করা। চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও অনেক নারী দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি (Persistent Fatigue), ওজনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন, শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক অবসাদ এবং স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার পথে নানা জটিলতার মুখোমুখি হন। এই সময়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা সুস্থ হয়ে ওঠার দুটি অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি।

স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই ব্যয়বহুল নয়

আমাদের দেশে খাদ্যাভ্যাস পারিবারিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক বাজেটের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। ভাত, মাছ, ডাল, শাকসবজি ও দেশীয় মৌসুমী ফল আমাদের প্রাত্যহিক খাবারের মূল উপাদান। সঠিক পরিমাপে ও সুষম সমন্বয়ে গ্রহণ করা গেলে এই স্থানীয় খাবারগুলো থেকেই সর্বোত্তম পুষ্টি নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত শর্করা, তেলে ভাজা খাবার এবং অপরিমিত চর্বি গ্রহণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত শাকসবজি ও প্রোটিনের ঘাটতি খাদ্যের গুণগত মান নষ্ট করে।

ক্যানসার জয়ী নারীদের জন্য স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং সুষম খাবার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সারভাইভারশিপ নির্দেশিকা অনুযায়ী, খাদ্যতালিকায় নানা রঙের শাকসবজি, ফলমূল, লাল চাল বা আটার মতো হোল গ্রেইন ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন রাখা উচিত; আর প্রক্রিয়াজাত বা লাল মাংস (রেড মিট), চিনিযুক্ত পানীয় ও অস্বাস্থ্যকর ফাস্টফুড বর্জন করা আবশ্যক। সুস্থ খাদ্যাভ্যাসের জন্য কোনো দামি বিদেশি পণ্য বা বিশেষ সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন নেই; স্থানীয় ডাল, ডিম, ছোট মাছ, দেশি শাক ও মৌসুমি ফল থেকেই মিলবে প্রয়োজনীয় পুষ্টি।

একই সাথে খাবার ও ক্যানসার নিয়ে তৈরি হওয়া নানা ভুল ধারণা বা ট্যাবু ভাঙা দরকার। অবৈজ্ঞানিক তথ্যে বিভ্রান্ত হয়ে অনেকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেন। মনে রাখা জরুরি, কোনো একক ‘জাদুকরী খাবার’ বা কঠোর ডায়েট ক্যানসার পুনরায় ফিরে না আসার নিশ্চয়তা দেয় না। বিশেষ করে চিকিৎসকের (অনকোলজিস্ট বা সার্জন) পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ভেষজ ওষুধ বা বাণিজ্যিক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়, কারণ এগুলো চলমান ওষুধের সাথে ক্ষতিকর মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে পারে।

শারীরিক সক্রিয়তা: আরোগ্যলাভের উপেক্ষিত অংশ

পরিমিত পুষ্টির পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা স্তন ক্যানসার পরবর্তী পুনর্বাসনে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম ক্যানসারজনিত দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি দূর করে, পেশির শক্তি বাড়ায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মানসিক আত্মবিশ্বাস ফেরায়। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, ক্যানসার শনাক্তের পর শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা সার্বিক সুস্থতায় বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর পরামর্শ অনুযায়ী, ক্যানসার জয়ীদের ক্ষেত্রে শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম (যেমন দ্রুত হাঁটা) এবং সপ্তাহে দুই বা ততোধিক দিন পেশি শক্তিশালী করার মতো সাধারণ ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম করা উচিত। এর জন্য জিমে যাওয়ার বা আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই। বাড়ির আশপাশে বা পার্কে দ্রুত হাঁটা, হালকা স্ট্রেচিং, সাঁতার কিংবা ঘরের ভেতর সাধারণ ব্যায়ামই যথেষ্ট।

তবে মনে রাখতে হবে, প্রাত্যহিক গৃহস্থালি কাজকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিমিত ব্যায়াম হিসেবে গণ্য করা যায় না। রান্না করা, ঘর মোছা বা পরিবারের সেবাযত্নে নারীরা হয়তো ব্যস্ত থাকেন, কিন্তু তা নিয়মিত কার্ডিওভাসকুলার বা পেশির শক্তি বাড়াতে সবসময় পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, তীব্র দুর্বলতা বা বাহুতে ফোলাভাব (লিম্ফিডিমা) রয়েছে, তাঁদের অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যায়াম শুরু করতে হবে।

পারিবারিক ও সামাজিক সমর্থনের অপরিহার্যতা

আমাদের পরিবারগুলোতে নারীরাই সবার রান্না ও সেবাযত্ন করেন। ক্যানসারের মতো কঠিন চিকিৎসা পেরিয়ে আসার পরও অনেক নারী নিজের বিশ্রামের চেয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের চাহিদাকেই আগে স্থান দেন। ফলে নিজের জন্য একটু সময় বের করে হাঁটা, সুষম খাবার তৈরি বা নিয়মমাফিক চেকআপে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এখানে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বড় পথপ্রদর্শক হতে পারে। স্বামী, সন্তান ও নিকটাত্মীয়রা যদি গৃহস্থালির কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেন, একসঙ্গে হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলেন এবং মানসিকভাবে সাহস জোগান, তবে ক্যানসার জয়ী নারীর পুনর্বাসন অনেক সহজ হয়ে যায়। একা একজন নারীর ওপর চাপ না দিয়ে পুরো পরিবার মিলে একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গ্রহণ করাই সবচেয়ে সুন্দর সমাধান। এছাড়া বড় শহরগুলোর বাইরে মফস্বল ও গ্রামে অনকোলজি ফলোআপ, পুষ্টিবিদ ও ফিজিওথেরাপিস্টের অভাব রয়েছে। তাই জীবনযাত্রার প্রতিটি পরামর্শ হতে হবে স্থানীয় বাস্তবতার সাথে মানানসই ও সাশ্রয়ী।

চিকিৎসা থেকে আজীবন সুস্থতায়

বাংলাদেশে ক্যানসারের চিকিৎসাকে কেবল অপারেশন, কেমো ও রেডিওথেরাপির ভেতর সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পুষ্টিগত মূল্যায়ন, নিয়মিত ব্যায়ামের নির্দেশনা, মানসিক কাউন্সেলিং ও শারীরিক পুনর্বাসনকে ক্যানসার পরবর্তী সরকারি ও বেসরকারি সেবার প্রাতিষ্ঠানিক অংশ করতে হবে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উচিত রোগীদের ওষুধের পাশাপাশি সহজ ভাষায় সুষম খাবার ও সক্রিয় থাকার নির্দেশনা দেওয়া। এছাড়া ক্যানসার জয়ীদের নিয়ে কমিউনিটিভিত্তিক সহায়তা দল (Support Groups) গড়ে তোলা প্রয়োজন।

নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে—ক্যানসার ব্যবস্থাপনায় সাফল্য কেবল প্রারম্ভিক শনাক্তকরণ বা ক্লিনিক্যাল চিকিৎসার মধ্যে শেষ হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনেই এর পূর্ণতা আসে। ক্যানসার জয়ী প্রতিটি নারীর অধিকার রয়েছে নিজের শারীরিক শক্তি ফিরে পাওয়ার, আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার এবং সমাজে মর্যাদার সাথে বাঁচার।

স্তন ক্যানসারকে জয় করার লড়াই কেবল বেঁচে থাকার সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং প্রতিটি নারীকে একটি সক্রিয়, আনন্দময় ও মর্যাদাপূর্ণ সুস্থ জীবন ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। ক্যানসারেই জীবন শেষ হয়ে যায় না—সুষম খাদ্য, নিয়মিত হাঁটাচলা এবং পরিবারের ভালোবাসাই এনে দিতে পারে এক নতুন ও সুন্দর জীবনের শক্তি।

লেখক | ডা. তানিয়া ইসলাম

 মেডিকেল লেকচারার ও এপিডেমিওলজিস্ট, সার্জারি বিভাগ, ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিন, ইউনিভার্সিটি মালয়া, মালয়েশিয়া; কার্যনির্বাহী সদস্য, ইয়ুথ হাব ফাউন্ডেশন বেরহাদ। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে অনকোলজি এপিডেমিওলজি, ক্যানসার প্রতিরোধ এবং নারী স্বাস্থ্য পুনর্বাসন নিয়ে গবেষণায় সক্রিয়।

[সম্পাদকীয় নোট]

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্যানসার ব্যবস্থাপনার আলোচনায় সাধারণত রোগ নির্ণয় এবং হাসপাতালের চিকিৎসার ওপরই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়; কিন্তু চিকিৎসা সমাপ্তির পর বেঁচে ফেরা একজন নারীর প্রাত্যহিক পুনর্বাসন, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জনস্বাস্থ্য গবেষক ডা. তানিয়া ইসলাম অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরেছেন যে, ক্যানসার জয়ের প্রকৃত সার্থকতা কেবল আয়ু বৃদ্ধিতে নয়, বরং গুণগত জীবনমান পুনরুদ্ধারে। আমাদের দেশীয় খাদ্যাভ্যাস, পরিবারের ভূমিকা এবং শারীরিক সক্রিয়তার বৈজ্ঞানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কীভাবে একজন নারী পুনরায় আত্মবিশ্বাসের সাথে সমাজে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন—নিবন্ধটিতে তার এক চমৎকার প্রায়োগিক রূপরেখা রয়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিতে ‘ক্যানসার সারভাইভারশিপ কেয়ার’ বা পরবর্তী পুনর্বাসন সেবা অন্তর্ভুক্ত করার তাগিদে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিবন্ধটি প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় প্রমিতকরণসহ প্রকাশ করা হলো।


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।