ডেটাসুরক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্যানেল আলোচনা
ডেটা ব্যবস্থাপনায় একক প্ল্যাটফর্ম নয়, ফেডারেটেড কাঠামোতেই নাগরিক তথ্যের সুরক্ষা দেবে সরকার: আইসিটি সচিব
- তথ্যের অতি-সংগ্রহ বন্ধে জোর; আইসিটি বিভাগ ও বিটিআরসি প্রস্তুত করছে এসওপি ও খাতভিত্তিক সাইবার ড্রিল নির্দেশিকা
- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে গঠিত হচ্ছে ন্যাশনাল ডেটা প্রটেকশন অথরিটি ও ডেটা গভর্ন্যান্স বোর্ড
- সম্মতি ব্যবস্থাপনা ও রোল-বেসড অ্যাক্সেস ছাড়া তথ্যে প্রবেশাধিকার নয়: রবি সিইও জিয়াদ সাতারা
নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ও ডেটা নিরাপত্তা নিশ্চিতে সব তথ্য কোনো একটি একক প্ল্যাটফর্মে কেন্দ্রীভূত না করে ‘ফেডারেটেড’ কাঠামো এবং ইন্টারঅপারেবিলিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডেটা সুরক্ষার রূপরেখা বাস্তবায়ন করছে সরকার। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ডেটা সংগ্রহ বন্ধ করা এবং তথ্যের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরি করা হচ্ছে।
৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রবি আজিয়াটা পিএলসির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত ‘প্রাইভেসি অ্যাভেঞ্জার্স ২০২৬’ ফ্ল্যাগশিপ প্রতিযোগিতার সমাপনী ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়। শীর্ষ ১০টি প্রতিযোগী দলকে স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি 'ন্যাভিগেটিং এআই, প্রাইভেসি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন দ্য ডিলিপি এরা' শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের পলিসি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কমিশনার (সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন এবং আজিয়াটা গ্রুপের গ্রুপ চিফ রিস্ক অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স অফিসার আবিদ আব্দুল আদম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রবি আজিয়াটা পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জিয়াদ সাতারা।
একক প্ল্যাটফর্ম নয়, ফেডারেটেড কাঠামোর ইন্টারঅপারেবিলিটি: আইসিটি সচিব
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভুঁইয়া বলেন, "ডিজিটাল ব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু সেই তথ্যের সুরক্ষা আমরা কতটা দিচ্ছি এবং সরকারের ওপর নাগরিকদের বিশ্বাস বজায় থাকছে কি না—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় বিবেচ্য। শুধু ইউরোপের জিডিপিআরের মতো আইন থাকা যথেষ্ট নয়, ডেটা প্রাইভেসিকে একটি জাতীয় সংস্কৃতিতে রূপান্তর করতে হবে।"
তিনি স্পষ্ট করে জানান, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সরকার তিনটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছে—পার্সোনাল ডেটা প্রটেকশন অ্যাক্ট, সাইবার সিকিউরিটি অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট এবং ন্যাশনাল ডেটা গভর্ন্যান্স অ্যাক্ট। এসব আইনের আওতায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে 'ন্যাশনাল ডেটা প্রটেকশন অথরিটি' এবং প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে একটি শক্তিশালী 'ডেটা গভর্ন্যান্স বোর্ড' গঠিত হবে। এই স্থায়ী কর্তৃপক্ষ কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত আইসিটি বিভাগ অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব হিসেবে বিধিমালা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা তৈরির কাজ পরিচালনা করছে।
সিঙ্গেল প্ল্যাটফর্ম বিতর্ক প্রসঙ্গে সচিব বলেন, "অনেকে প্রশ্ন করেন আমরা সব ডেটা একটি প্ল্যাটফর্মে আনছি কি না। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডেটা ভাণ্ডার রয়েছে। আমরা সব ডেটা এক জায়গায় এনে 'সিঙ্গেল পয়েন্ট অব ফেইলিউর' বা কেন্দ্রীয় ঝুঁকি তৈরি করব না। আমাদের কাঠামো হবে ফেডারেটেড। ইন্টারঅপারেবিলিটি কাঠামোর মাধ্যমে ডেটা যেখানে আছে সেখানেই থাকবে, কেবল প্রয়োজনের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে তথ্য আদান-প্রদান করা হবে।"
অপ্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের প্রবণতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সচিব যোগ করেন, "অনেক সময় আমাদের সার্ভারে হয়তো কেবল দুটি ফিল্ডের তথ্য প্রয়োজন, কিন্তু আমরা ১০টি ফিল্ডের তথ্য সংগ্রহ করছি। এই চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ডেটা ব্রিচ হলে কেবল আইন দেখে বসে থাকলে চলবে না; জরুরি মুহূর্তে কী করতে হবে তার সুস্পষ্ট এসওপি থাকতে হবে।" একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের তরুণদের উদ্ভাবনী সাইবার ও প্রাইভেসি প্রকল্পগুলোকে বাজারে আনতে আইসিটি বিভাগ থেকে সরাসরি ফান্ডিং ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
টেলিকমে কঠোর ডেটা অডিট ও নিজস্ব ডেটা সেন্টারের তাগিদ: বিটিআরসি কমিশনার
আইসিটি সচিবের বক্তব্যের সূত্র ধরে বিটিআরসির কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মহিউদ্দিন বলেন, ডেটা সুরক্ষায় কোনো একক প্ল্যাটফর্মের ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। জাতীয় ডেটা ম্যানেজমেন্ট অথরিটি সার্বিক জাতীয় গাইডলাইন দেবে এবং বিটিআরসির মতো খাতভিত্তিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নিজস্ব কার্যপরিধি অনুযায়ী বিধি প্রণয়ন করবে।
তিনি বলেন, "টেলিকম খাত রাষ্ট্রের অন্যতম ক্রিটিক্যাল অবকাঠামো। একটি টেলিকম অপারেটর কেবল ভয়েস বা ডেটা সংযোগ দেয় না; বরং গ্রাহকের সিম রেজিস্ট্রেশন, কল মেটাডেটা, লোকেশন, বায়োমেট্রিক ও আর্থিক লেনদেনের ব্যাপক তথ্য প্রক্রিয়া করে। এআই সংযুক্তির ফলে ডেটা অপব্যবহার, অননুমোদিত অ্যাক্সেস, অ্যালগরিদমিক বায়াস এবং ডিপফেকের মতো ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ছে।"
টেলিকম অপারেটরদের জন্য আট দফা দিকনির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে ডেটা ইনভেনটরি ও ডেটা লিনিয়েজ ফ্রেমওয়ার্ক প্রস্তুত করতে হবে—কোথায় ডেটা জমা হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং কতদিন থাকবে তা নথিভুক্ত থাকতে হবে। এছাড়া এআই মডেলে 'প্রাইভেসি ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট', জিরো-ট্রাস্ট আর্কিটেকচার, টোকেনাইজেশন এবং এনক্রিপশন বাধ্যতামূলক করতে হবে। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, দেশে এখনও বহু নাগরিক স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না; ফলে কেবল মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সম্মতি নয়, বরং বাংলা ইন্টারফেস ও ইউএসএসডি (USSD) চ্যানেলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ডেটা অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশে ‘ন্যাশনাল এআই ডেটা সেন্টার’ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ডেটা ব্রিচ কোনো সম্ভাবনা নয়, এক অনিবার্য বাস্তবতা: আজিয়াটা গ্রুপ সিআরসিও
প্যানেলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সাইবার ঝুঁকির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন আজিয়াটা গ্রুপের গ্রুপ চিফ রিস্ক অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স অফিসার আবিদ আব্দুল আদম। তিনি বলেন, "ডেটা ব্রিচ কোনো ‘যদি’র বিষয় নয়, এটি ‘কখন ঘটবে’—সেই অনিবার্য বাস্তবতা। কোনো সংস্থায় যখন সাইবার হামলা বা ডেটা ব্রিচ ঘটে, প্রথম কয়েক ঘণ্টা ও দিন চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। সিস্টেম ডাউন করলে কোয়ালিটি অব সার্ভিস নষ্ট হয়, আবার র্যানসমওয়্যার দিলে মুক্তিপণ দেওয়াও বৈশ্বিক নিরাপত্তার পরিপন্থী।"
তিনি জানান, আজিয়াটা গ্রুপ ২০১৭-১৮ সাল থেকেই নন-নেগোশিয়েবল মিনিমাম বেসলাইন সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ডস (NBSS) কার্যকর করেছে। তিনি বোর্ড ও ম্যানেজমেন্ট পর্যায়ে নিয়মিত 'সাইবার ক্রাইসিস সিমুলেশন' বা মহড়া পরিচালনার আহ্বান জানান, যাতে বাস্তব সংকটের মুহূর্তে প্যানিক না করে পেশাদারভাবে এসওপি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়। এছাড়া গ্রাহক পর্যায়ে জটিল শত শত সম্মতি না চাপিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কনসেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেন তিনি।
গ্রাহকের সম্মতি ও রোল-বেসড সিকিউরিটিতে রবির রূপরেখা: রবি সিইও
আলোচনার সমাপ্তি টেনে রবি আজিয়াটা পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াদ সাতারা বলেন, "ডিজিটাল অর্থনীতিতে ডেটা সুরক্ষা কোনো রুটিন কমপ্লায়েন্স নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল আস্থার ভিত্তি। রবি ইতোমধ্যে এমন একটি সর্বাধুনিক কনসেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে বিনিয়োগ করছে, যার মাধ্যমে গ্রাহকেরা সরাসরি তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, অনুমতি প্রদান বা প্রত্যাহার করতে পারবেন।"
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে রবি প্রধান বলেন, "আমরা কঠোর 'রোল-বেসড ডেটা অ্যাক্সেস' কাঠামো কার্যকর করছি। প্রতিটি ডেটা ক্লাসিফিকেশন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে কে কোন তথ্যে প্রবেশ করতে পারবেন। যার কাজের জন্য নির্দিষ্ট তথ্য প্রয়োজন নেই, তার সিস্টেমে সেই তথ্য পৌঁছাবে না। এছাড়া প্রতিটি ডেটা অ্যাক্সেসের স্বয়ংক্রিয় লগ রাখা হচ্ছে। নিজস্ব কর্মীদের পাশাপাশি ক্লাউড ও থার্ড-পার্টি ভেন্ডরদেরও আইনগত দায়বদ্ধতার আওতায় এনে এগ্রিমেন্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।"
প্রসঙ্গত, রবি সপ্তাহব্যাপী ‘প্রাইভেসি ফার্স্ট’ কর্মসূচির অধীনে কর্মী, ডিস্ট্রিবিউটর ও কল সেন্টার কর্মীদের জন্য সচেতনতামূলক সেশন পরিচালনা করে। শীর্ষ ১০ দলের পুরস্কার বিতরণের মাধ্যমে শেষ হওয়া এই জমকালো আয়োজনে সরকারের আইসিটি বিভাগ, বিটিআরসি এবং শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞরা একযোগে একটি নিরাপদ সাইবার ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমপি/এমআইএসটি//





