শেষ দৃশ্যের পরও ফ্রেমে রয়ে গেলেন তিনি
পাপেটম্যান থেকে ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলার
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে এমন মানুষ খুব কমই আছেন, যাদের পরিচয় একটি শব্দে বেঁধে ফেলা যায় না। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন তেমনই এক বহুমাত্রিক স্রষ্টা। তিনি ছিলেন চিত্রশিল্পী, টেলিভিশন নির্মাতা, শিক্ষক, পাপেট নির্মাতা, উপস্থাপক, শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং সর্বোপরি একজন অসাধারণ ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলার। ক্যানভাসের রঙতুলি থেকে শুরু করে টেলিভিশনের ক্যামেরা, স্টুডিওর আলো, কাঠের পুতুল, মঞ্চসজ্জা—সবকিছুকেই তিনি গল্প বলার ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন।
সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই শিল্পগুরু। দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া, ফুসফুসের সংক্রমণ ও বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বনানী কবরস্থানে চিরঘুমে শায়িত হবেন তিনি। কিন্তু শিল্প, প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমকে একসূত্রে গাঁথার যে উত্তরাধিকার তিনি রেখে গেলেন, তা বহুদিন বাংলাদেশের সৃজনশীল জগতকে পথ দেখাবে।
শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প
১৯৩৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার মাগুরা (বর্তমান জেলা) মহকুমার শ্রীপুর থানার অন্তর্গত নাকোল গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার পৈত্রিক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার মনোহরপুর গ্রামে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি ও ইসলামী ভাবধারার সাহিত্যিক। তিনি ছিলেন একজন আলোকচিত্রী আর বইয়ের চিত্রকরও। মাতা জামিলা খাতুন ছিলেন একজন গৃহিণী। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার সবার ছোট। মেজ ভাই মুস্তাফা আজিজ আঁকতেন ছবি। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোটজনের শিল্পে আকর্ষণ তৈরি হয় ঘরের ভেতর থেকেই।
নন্দিত কবি গোলাম মোস্তফার সাহিত্যিক উত্তরাধিকার বহন করলেও তিনি নিজের প্রকাশের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন দৃশ্যশিল্পকে। পরিবারে মন্টু নামে বিশেষ পরিচিত এই শিল্পীকে অনেকেই 'বাংলাদেশের পাপেটম্যান' বলে অভিহিত করতেন।
কেননা, শব্দের বদলে রেখা, রং, আলো ও চলমান ছবিতে তিনি মানুষের গল্প বলতে চেয়েছেন। এক অর্থে, বাবা যেমন কবিতায় মানুষের অনুভূতি এঁকেছেন, তেমনি ছেলে সেই অনুভূতিকেই ক্যানভাস, ক্যামেরা ও পাপেটের মাধ্যমে দৃশ্যমান করে তুলেছেন। শিল্পের প্রতি তার আগ্রহ খুব ছোটবেলা থেকেই। দেশভাগের পর পরিবার ঢাকায় চলে আসে। ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) প্রথম দিকের শিক্ষার্থীদের একজন ছিলেন তিনি। পরে কলকাতা গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে ১৯৫৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
দেশে ফিরে তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পী হিসেবেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শিক্ষকতা করেছেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান নির্মাণে যুক্ত হয়েছেন, চারুকলা শিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন এবং শিশুদের সাংস্কৃতিক বিকাশে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননায় ভূষিত হন।
১৯৬৫ সালে তিনি চট্টলার মেয়ে মেরীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলে সাদাত মনোয়ার বাংলাদেশ বিমানের পাইলট, আর মেয়ে নন্দিনী মনোয়ার চাকুরীজীবী। অবশ্য তার ভ্রাতুষ্পুত্র নাফিস বিন জাফর পরে অস্কারজয়ী অ্যানিমেটর হিসেবে পরিচিতি পান। এভাবেই কবিতা থেকে চিত্রকলা, চিত্রকলা থেকে পাপেট, পাপেট থেকে অ্যানিমেশন—একই পরিবারের ভেতর দিয়ে শিল্পের মাধ্যম বদলে গেছে প্রজন্মান্তরে, সুরটা থেকে গেছে অভিন্ন।
যে শিল্পী ক্যানভাস ছেড়ে ক্যামেরাকে বেছে নিয়েছিলেন
মুস্তাফা মনোয়ার খুব দ্রুত বুঝেছিলেন, একটি ছবি হয়তো একটি গ্যালারিতে সীমাবদ্ধ থাকবে; কিন্তু টেলিভিশনের একটি ফ্রেম পৌঁছে যেতে পারে লাখো মানুষের ঘরে। সেই উপলব্ধিই তাকে নিয়ে যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্টুডিওতে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে তিনি শুধু অনুষ্ঠান পরিচালনা করেননি; ক্যামেরার ভাষাকেও শিল্পের ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন। ফ্রেম কম্পোজিশন, আলো-ছায়ার ব্যবহার, সেট ডিজাইন, রঙের মনস্তত্ত্ব—সবকিছুতেই ছিল একজন চিত্রশিল্পীর সূক্ষ্ম দৃষ্টি। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশাত্মবোধক অনুষ্ঠান নির্মাণ থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর শিশু-কিশোরদের অনুষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই তিনি টেলিভিশনের ভিজ্যুয়াল ভাষাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন।
লেদ মেশিনে জন্ম নিত পাপেটের মুখ
মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে অনন্য পরিচয় সম্ভবত এখানেই।
আজকের মতো থ্রিডি প্রিন্টার, সিএনসি কাটিং কিংবা ডিজিটাল মডেলিং তখন ছিল না। তিনি নিজেই কাঠ সংগ্রহ করতেন, লেদ মেশিনে দাঁড়িয়ে কাঠ ঘষে ঘষে তৈরি করতেন পাপেটের মাথা। তারপর হাতে আঁকতেন মুখ, বসাতেন চোখ, তৈরি করতেন হাত-পা, সুতো আর যান্ত্রিক সংযোগ।
প্রতিটি চরিত্রের মুখের অভিব্যক্তি, চোখের নড়াচড়া, ঠোঁটের খোলা-বন্ধ হওয়া কিংবা হাতের ভঙ্গি—সবকিছুর প্রকৌশলগত নকশাও তিনি নিজেই করতেন। শিল্প আর প্রকৌশল—এই দুই জগতকে তিনি এমনভাবে মিলিয়েছিলেন, যা সে সময়ের বাংলাদেশে ছিল একেবারেই নতুন।
পাপেট ছিল অ্যানালগ যুগের অ্যানিমেশন
আজকের শিশুরা কম্পিউটার অ্যানিমেশন, থ্রিডি গ্রাফিক্স কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চরিত্র দেখে বড় হচ্ছে। কিন্তু ষাট ও সত্তরের দশকে সেই প্রযুক্তি ছাড়াই মুস্তাফা মনোয়ার কাঠ, সুতো, কাপড় আর আলো ব্যবহার করে তৈরি করেছিলেন এমন সব চরিত্র, যারা কথা বলত, হাসত, অভিনয় করত।
এক অর্থে তার পাপেটগুলো ছিল বাংলাদেশের অ্যানালগ যুগের অ্যানিমেশন প্রযুক্তির সূচনা।
ক্যামেরার জন্য আঁকা ছবি
চিত্রকলা আর টেলিভিশনের পার্থক্য তিনি গভীরভাবে বুঝতেন। ক্যানভাসে যে রঙ সুন্দর দেখায়, ক্যামেরায় তা একইভাবে ধরা পড়ে না। তাই স্টুডিও সেট, পোশাক, আলো, ব্যাকড্রপ—সবকিছু তিনি ক্যামেরার ভাষা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করতেন।
আজকের ভাষায় যাকে বলা হয় ভিজ্যুয়াল ডিজাইন বা প্রোডাকশন ডিজাইন, বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।
'নতুন কুঁড়ি'—একটি প্রজন্ম তৈরির কারখানা
বাংলাদেশের অসংখ্য শিল্পী, সংগীতশিল্পী, আবৃত্তিকার ও অভিনয়শিল্পীর প্রথম জাতীয় মঞ্চ ছিল 'নতুন কুঁড়ি'। এটি কেবল একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল শিশুদের আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের এক অনন্য বিদ্যালয়।
প্রযুক্তিকে তিনি শিল্পের ভাষা বানিয়েছিলেন
মুস্তাফা মনোয়ারের কাছে প্রযুক্তি কখনও যন্ত্র ছিল না; ছিল প্রকাশের মাধ্যম।
পাপেটের যান্ত্রিক কাঠামো, টেলিভিশনের মাল্টি-ক্যামেরা প্রযোজনা, স্টুডিও লাইটিং, সেট ডিজাইন, ভিজ্যুয়াল কম্পোজিশন—সব ক্ষেত্রেই তিনি এমন সময় কাজ করেছেন, যখন বাংলাদেশে এসব বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাই ছিল সীমিত।
আজকের অ্যানিমেটর, মোশন ডিজাইনার, ইউটিউব নির্মাতা কিংবা ডিজিটাল ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলারদের কাজে যে আন্তঃমাধ্যমিক (cross-media) চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়, তার বীজ মুস্তাফা মনোয়ারের কাজেও খুঁজে পাওয়া যায় সহজেই। তিনি যেন ডিজিটাল যুগের অনেক আগেই বুঝেছিলেন—মানুষ গল্প শুনতে যতটা ভালোবাসে, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে গল্প দেখতে।
শেষ বিদায়ে ভালোবাসার ঢল
তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাবেক শিক্ষার্থীরা স্মৃতিচারণ করেন। অনেকেই তাকে "বাংলাদেশের পাপেটম্যান", "শিশুদের স্বপ্নকারিগর", "চারুকলার আলোকবর্তিকা" এবং "ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলার" হিসেবে স্মরণ করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন শোকবার্তায় তার অসামান্য অবদানের কথা তুলে ধরে। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বাংলাদেশ টেলিভিশন ও চারুকলা অনুষদে তার কর্মজীবনের সহযাত্রীদের উপস্থিতিতে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
যে উত্তরাধিকার রয়ে যাবে
বাংলাদেশে বহু গুণী চিত্রশিল্পী জন্মেছেন, বহু দক্ষ টেলিভিশন নির্মাতাও এসেছেন। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যিনি একই সঙ্গে ক্যানভাস, ক্যামেরা, কাঠ, যন্ত্র, টেলিভিশন, পাপেট এবং শিশুমনের কল্পনাকে এক সৃজনশীল ধারায় প্রবাহিত করতে পেরেছেন।
মুস্তাফা মনোয়ার শুধু ছবি আঁকেননি; ছবিকে চলতে শিখিয়েছেন। শুধু পুতুল বানাননি; কাঠের মুখে প্রাণ দিয়েছেন। শুধু অনুষ্ঠান নির্মাণ করেননি; বাংলাদেশের দৃশ্যভাষার ভিত্তি নির্মাণ করেছেন।
তাই তাকে কেবল একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে মনে রাখলে তার প্রতি অবিচার হবে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম, টেলিভিশন এবং ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতির ইতিহাসে তিনি ছিলেন—এবং থাকবেন—একজন অগ্রদূত, যিনি রঙতুলির সীমা ছাড়িয়ে ক্যামেরার ফ্রেমে একটি জাতির কল্পনাশক্তিকে নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছিলেন।
লেখকঃ গণমাধ্যমকর্মী, নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিবাংলা; সহ-সভাপতি, সাইবারক্রাইম অ্যাওরানেস ফাউন্ডেশন





