নতুন লাইসেন্স কাঠামোয় বড় পরিবর্তন
আইআইজি-আইসিএক্স বিলুপ্তির পথে, বদলাচ্ছে টেলিকম খাত
- নতুন নীতিতে আইএসপি
- আইআইজি ও আইসিএক্সের পৃথক লাইসেন্স থাকবে না
- মোবাইল অপারেটরদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে অবকাঠামো ও নেটওয়ার্ক শেয়ারিং
- আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ, টাওয়ার ও ফাইবার ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের আভাস
বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে লাইসেন্সিং কাঠামো, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সরবরাহ, নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর মালিকানা এবং সেবার পরিচালন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। বিদ্যমান বহুস্তরবিশিষ্ট লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ভেঙে আন্তর্জাতিক সংযোগ, টাওয়ার ও ট্রান্সমিশন অবকাঠামো, মোবাইল ও ইন্টারনেট অ্যাকসেস এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগকে কেন্দ্র করে নতুন কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি), ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ), ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) এবং ন্যাশনাল ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জের (এনআইএক্স) পৃথক লাইসেন্সব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে মোবাইল অপারেটরদের জন্য সক্রিয় নেটওয়ার্ক, স্পেকট্রাম ও ফাইবার শেয়ারিংয়ের সুযোগ, আইএসপিদের জন্য দেশব্যাপী সেবা দেওয়ার উন্মুক্ত লাইসেন্স এবং নতুন আন্তর্জাতিক সংযোগ ব্যবসার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে এসব পরিবর্তন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। বিটিআরসি প্রণীত Telecommunication Network and Licensing Policy 2026 শীর্ষক সংশোধিত খসড়াটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ২ নভেম্বর মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খসড়াটি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গেজেট প্রকাশের আগে প্রস্তাবিত বিধানগুলো পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আইআইজি বন্ধ হলে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ আসবে যেভাবে
নতুন নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো আইআইজি লাইসেন্সের অবসান। তবে এর অর্থ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং আন্তর্জাতিক সংযোগের ব্যবসা নতুন করে সাজানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়ার ৯ নম্বর ধারা এবং সংযুক্ত লাইসেন্স মাইগ্রেশন তালিকা অনুযায়ী, আইআইজি লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন করা হবে না। তবে বিদ্যমান আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কাঠামোর আওতায় যোগ্যতা পূরণ করে নতুন লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে। স্থানীয় বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগেও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে নতুন ইন্টারন্যাশনাল কানেকটিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার (ICSP) লাইসেন্স গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই লাইসেন্সের আওতায় দুটি ব্যবসায়িক মডেল রাখা হয়েছে:
- ফ্যাসিলিটি-বেইজড ICSP: সাবমেরিন কেবল, স্থলভিত্তিক আন্তর্জাতিক কেবলসহ নিজস্ব সংযোগ অবকাঠামো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান।
- নন-ফ্যাসিলিটি-বেইজড ICSP: নিজস্ব সাবমেরিন বা স্থলভিত্তিক কেবল অবকাঠামো ছাড়াই আন্তর্জাতিক আইপি ট্রানজিট, ক্যারিয়ার চুক্তি, ভয়েস কল ও এসএমএস টার্মিনেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংযোগসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
অর্থাৎ, নতুন কাঠামোয় আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবসা শুধু কেবল অবকাঠামোর মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অবকাঠামো ছাড়াও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ও আইপি ট্রানজিট ব্যবসায় প্রবেশের সুযোগ থাকবে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যমান আইআইজি লাইসেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে ICSP লাইসেন্সে রূপান্তরিত হবে—এমন কোনো বিধান খসড়ায় নেই। কোন প্রতিষ্ঠান কোন ধরনের ICSP লাইসেন্স পাবে, তা নির্ধারিত হবে নতুন লাইসেন্সিং গাইডলাইন, যোগ্যতা ও অনুমোদনের ভিত্তিতে।
CSP প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক লিজড সার্কিটের পাশাপাশি IP Transit, আন্তর্জাতিক ভয়েস ও এসএমএস রাউটিং, ক্যারিয়ার ইন্টারকানেকশন এবং আন্তর্জাতিক পিয়ারিং সেবা দিতে পারবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ মালিকানার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সরকার বিশেষ ক্ষেত্রে এই সীমা পর্যালোচনা করতে পারবে।
আইআইজি খাতের জন্য এর তাৎপর্য: বর্তমান আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসা চালিয়ে যেতে নতুন কাঠামোয় নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। কারও জন্য নন-ফ্যাসিলিটি ICSP, আবার কেবল বা আন্তর্জাতিক অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সক্ষমতা থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য ফ্যাসিলিটি-বেইজড ICSP সম্ভাব্য পথ হতে পারে। তবে চূড়ান্ত যোগ্যতা নির্ধারণ করবে বিটিআরসির লাইসেন্সিং গাইডলাইন।
কোন কোন লাইসেন্স থাকবে, কোনগুলো বাদ যাবে
নতুন নীতিমালায় বিদ্যমান বহুস্তরবিশিষ্ট লাইসেন্সিং কাঠামোকে পাঁচটি প্রধান লাইসেন্স ও একটি তালিকাভুক্তি কাঠামোয় সাজানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
-
নতুন লাইসেন্স
কাজ ও সেবার পরিধি
ICSP
আন্তর্জাতিক সংযোগ, ব্যান্ডউইথ, IP Transit, ক্যারিয়ার সেবা
TCSP
টাওয়ার, ফাইবার, ট্রান্সমিশন ও অবকাঠামো শেয়ারিং
CMSP
মোবাইল নেটওয়ার্ক, ভয়েস, এসএমএস ও ডেটা
ISP
ফিক্সড, ফাইবার ও ওয়্যারলেস ইন্টারনেট
NTNSP
স্যাটেলাইট, VSAT, NTN ও হাই-অল্টিটিউড প্ল্যাটফর্ম
TESP
টেলিকম-সক্ষম সেবার তালিকাভুক্তি
এখানে ICSP, TCSP, CMSP, ISP ও NTNSP হবে লাইসেন্স ক্যাটাগরি। অন্যদিকে Telecom Enabled Service Provider (TESP) হবে তালিকাভুক্তি বা এনলিস্টমেন্ট ক্যাটাগরি।
যেসব লাইসেন্সের অবসান ঘটবে
খসড়ায় বিদ্যমান লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিম্নোক্ত কাঠামোগুলো বন্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে:
-
বিদ্যমান লাইসেন্স
প্রস্তাবিত ব্যবস্থা
IIG
মেয়াদ শেষে বন্ধ
IGW
মেয়াদ শেষে বন্ধ
ICX
মেয়াদ শেষে বন্ধ
NIX
মেয়াদ শেষে লাইসেন্স বিলুপ্ত
MNP
বর্তমান মেয়াদ পর্যন্ত বহাল
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আইআইজি, আইজিডব্লিউ ও আইসিএক্সের ক্ষেত্রে নতুন লাইসেন্স কাঠামোয় আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এনআইএক্স লাইসেন্সও মেয়াদ শেষে বন্ধ হবে; তবে দেশীয় ইন্টারনেট পিয়ারিং বন্ধ হবে না। বরং সব অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক অপারেটরকে একই বা সমমানের কার্যকর দেশীয় পিয়ারিং ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে।
অন্যদিকে MNP লাইসেন্সের বিষয়ে খসড়ার মূল ধারায় মেয়াদ শেষে বিলুপ্তির কথা থাকলেও মাইগ্রেশন তালিকায় বিদ্যমান লাইসেন্সের মেয়াদ পর্যন্ত তা চালু রাখার কথা বলা হয়েছে। নতুন CMSP অপারেটরদের জন্য নম্বর পোর্টেবিলিটি বাধ্যতামূলক থাকবে। বিটিআরসি চাইলে তৃতীয় পক্ষ বা অপারেটরদের কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে MNP পরিচালনার অনুমতি দিতে পারবে।
লাইসেন্স ছাড়াই যেসব সেবা দেওয়া যাবে
কল সেন্টার, টেলিকম ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (TVAS) এবং ভেহিকল ট্র্যাকিং সার্ভিসের (VTS) পৃথক লাইসেন্স বা নিবন্ধন ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এসব সেবা আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে ANSP বা অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক অপারেটরের সঙ্গে স্বচ্ছ সহযোগিতার ভিত্তিতে দিতে হবে। ANSP-কে এসব সেবার মৌলিক নিয়ন্ত্রক পরিপালন ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া এনআইএক্স লাইসেন্সও বিলুপ্ত হবে। তবে এনআইএক্সের মাধ্যমে পরিচালিত দেশীয় ইন্টারনেট পিয়ারিং ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে। ভিএসএটি ও সংশ্লিষ্ট সেবার জন্য পৃথক সরলীকৃত গাইডলাইন করা হবে।
মোবাইল অপারেটরদের জন্য বড় সুযোগ: নেটওয়ার্ক ও স্পেকট্রাম শেয়ারিং
নতুন নীতিমালায় মোবাইল অপারেটরদের জন্য অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো অ্যাকটিভ ও প্যাসিভ অবকাঠামো শেয়ারিংয়ের সুযোগ। বিদ্যমান ব্যবস্থায় মূলত টাওয়ার ও ফাইবারের মতো প্যাসিভ অবকাঠামো ভাগাভাগি করা হলেও নতুন প্রস্তাবে কোর নেটওয়ার্ক, রেডিও নেটওয়ার্ক, স্পেকট্রাম এবং লাস্ট-মাইল ফাইবারসহ বিভিন্ন সক্রিয় অবকাঠামো শেয়ারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এর ফলে অপারেটররা প্রয়োজন অনুযায়ী নেটওয়ার্ক সক্ষমতা ভাগাভাগি করে বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয় কমাতে পারবে। তবে স্পেকট্রাম শেয়ারিংয়ের জন্য বিটিআরসির পূর্বানুমোদন নিতে হবে।
মোবাইল অপারেটরদের আরও যেসব সুবিধা দেওয়া হচ্ছে:
নিজস্ব প্রযুক্তি অনুযায়ী যেকোনো সেলুলার প্রযুক্তিতে ভয়েস, এসএমএস, ডেটা ও ভ্যালু অ্যাডেড সেবা দেওয়ার সুযোগ।
মাইক্রো, পিকো, ফেমটো ও ম্যাসিভ MIMO সেল স্থাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাইক্রোওয়েভ লিংক ব্যবহারের অনুমতি।
ছোট সেল ও নতুন রেডিও প্রযুক্তি ব্যবহারে নমনীয়তা।
প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলে মোবাইল সেবার আওতায় বিভিন্ন ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস চালু।
মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটর (MVNO) চালুর সুযোগ।
স্পেকট্রাম যথাযথ ব্যবহার ও স্মার্টফোনভিত্তিক ডেটা ব্যবহারের প্রসার ঘটাতে পারলে স্পেকট্রাম ফিতে ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা।
খসড়ায় মোবাইল অপারেটরদের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক লাইসেন্সের সীমিত কাঠামো রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন মোবাইল অপারেটর লাইসেন্স উন্মুক্তভাবে দেওয়া হবে না; বিটিআরসি স্পেকট্রামের প্রাপ্যতা, বাজার প্রতিযোগিতা ও ভোক্তাস্বার্থ বিবেচনা করে লাইসেন্সের সংখ্যা নির্ধারণ করবে।
এমভিএনও আসছে, বাড়তে পারে প্রতিযোগিতা
মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটর বা MVNO চালুর মাধ্যমে নতুন ধরনের মোবাইল সেবা ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ রেডিও অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক ছাড়াই বিদ্যমান মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্রাহকদের সেবা দিতে পারে।
খসড়ায় MVNO-র জন্য পৃথক গাইডলাইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। এতে যোগ্যতা, ইন্টারকানেকশন, বিরোধ নিষ্পত্তি ও পরিচালন পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে। তবে এটি তাৎক্ষণিকভাবে চালু হচ্ছে না; পৃথক নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ও গাইডলাইন প্রয়োজন হবে।
টাওয়ার ও ফাইবার ব্যবসায় নতুন কাঠামো
বর্তমান ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (NTTN) এবং টাওয়ার শেয়ারিং লাইসেন্স একীভূত করে Tower and Connectivity Service Provider (TCSP) লাইসেন্স চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
TCSP প্রতিষ্ঠানগুলো দেশব্যাপী অপটিক্যাল ফাইবার, টাওয়ার, মাস্ট, পোল, ডাক্ট, ব্যাকহল ও ট্রান্সমিশন অবকাঠামো নির্মাণ, পরিচালনা এবং অন্য লাইসেন্সধারীদের কাছে ভাড়া দিতে পারবে। ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণের দায়িত্বও থাকবে।
এ ছাড়া ডার্ক ফাইবার ও ক্যাপাসিটি লিজ দেওয়ার সুযোগ থাকবে। বিটিআরসির অনুমোদন সাপেক্ষে উচ্চক্ষমতার ব্যাকহল সংযোগে ওয়্যারলেস প্রযুক্তিও ব্যবহার করা যাবে। TCSP লাইসেন্স হবে উন্মুক্ত ক্যাটাগরির। অর্থাৎ নির্ধারিত যোগ্যতা ও বিনিয়োগ সক্ষমতা থাকলে নতুন প্রতিষ্ঠানও এ খাতে প্রবেশ করতে পারবে।
তবে নতুন কাঠামোয় ICSP ও ANSP প্রতিষ্ঠান সাধারণভাবে TCSP লাইসেন্স নিতে পারবে না। একইভাবে TCSP ও ICSP প্রতিষ্ঠান ANSP লাইসেন্সও নিতে পারবে না। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংযোগ, অবকাঠামো এবং গ্রাহকসেবা স্তরে ব্যবসার পৃথকীকরণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে।
আইএসপিদের জন্য দেশব্যাপী ব্যবসার সুযোগ
নতুন কাঠামোয় ISP লাইসেন্স হবে উন্মুক্ত। দেশব্যাপী ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার পাশাপাশি ফাইবার, তারযুক্ত ও ফিক্সড ওয়্যারলেস প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভয়েস, ডেটা এবং অন্যান্য ভ্যালু অ্যাডেড সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
বিদ্যমান ন্যাশনওয়াইড ও ডিভিশনাল আইএসপি লাইসেন্সধারীদের নতুন ISP লাইসেন্সে মাইগ্রেশনের সুযোগ দেওয়া হবে। PSTN অপারেটরদেরও ISP লাইসেন্সে স্থানান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে। IPTSP লাইসেন্স সংশ্লিষ্ট ISP লাইসেন্সের সঙ্গে একীভূত হবে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আইএসপিদের জন্য District ISP লাইসেন্সের ব্যবস্থা থাকবে। এতে স্থানীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে (SME) উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে।
স্যাটেলাইট ও নতুন প্রযুক্তির জন্য পৃথক লাইসেন্স
স্যাটেলাইট ইন্টারনেট, VSAT, জিওস্টেশনারি ও নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট, আর্থ স্টেশন, বিমান ও জাহাজে স্যাটেলাইট সংযোগ এবং উচ্চতায় স্থাপিত যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মকে একীভূত করে Non-Terrestrial Networks and Service Provider (NTNSP) লাইসেন্স চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
এতে স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড, ব্যাকহল, সরাসরি ডিভাইসে সংযোগসহ নতুন ধরনের নন-টেরেস্ট্রিয়াল যোগাযোগসেবা অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। এ লাইসেন্সের জন্য ল্যান্ডিং রাইটস, স্পেকট্রাম বরাদ্দ ও আইনসম্মত নজরদারি ব্যবস্থার পৃথক বিধান থাকবে।
এ ছাড়া Private 5G/6G, IoT, Network Slicing, Edge Computing, Fog Computing, Massive MIMO, LPWAN, M2M, Quantum Computing Infrastructure এবং Network-as-a-Service-এর মতো প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স, নিবন্ধন অথবা সহজতর অনুমোদনব্যবস্থা চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগে মালিকানার সীমা
খসড়ায় নতুন লাইসেন্সগুলোর জন্য বিদেশি মালিকানার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
-
লাইসেন্স
সর্বোচ্চ বিদেশি মালিকানা
CMSP
৯০%
ICSP
৮০%
TCSP
৮০%
ISP
৮০%
NTNSP
১০০%
- মোবাইল অপারেটরের ক্ষেত্রে অন্তত ১০ শতাংশ এবং আইএসপির ক্ষেত্রে অন্তত ২০ শতাংশ দেশীয় মালিকানা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। TCSP-তেও নির্দিষ্ট শর্তে ২০ শতাংশ দেশীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তবে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য এসব লাইসেন্সে শতভাগ স্থানীয় মালিকানার সুযোগ রয়েছে।
কবে থেকে কার্যকর হবে, তিন ধাপে লাইসেন্স পরিবর্তন
নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে তিন ধাপের মাইগ্রেশন পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
-
ধাপ
সময় ও কার্যক্রম
প্রথম ধাপ
সরকার নীতিমালা অনুমোদন করলে কার্যক্রম শুরু; পুরোনো গাইডলাইন সংশোধন ও নতুন গাইডলাইন তৈরি
দ্বিতীয় ধাপ
নতুন লাইসেন্স চালু; পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন ক্যাটাগরিতে আবেদন ও স্থানান্তরের সুযোগ
তৃতীয় ধাপ
৩০ জুন ২০২৭-এর মধ্যে চূড়ান্ত মাইগ্রেশন পর্যায় শুরু; পুরোনো ও নতুন লাইসেন্সের সাময়িক সমান্তরাল কার্যক্রম
দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলে নতুন লাইসেন্সের সব আবেদন নতুন কাঠামোয় বিবেচিত হবে। বিদ্যমান লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রেও নতুন ক্যাটাগরি অনুসরণ করতে হবে। বিটিআরসি প্রয়োজনে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের (M&A) গাইডলাইন করতে পারবে।
তবে ৩০ জুন ২০২৭-কে চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক লাইসেন্স বন্ধের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। এটি তৃতীয় ধাপ শুরুর সর্বশেষ প্রস্তাবিত সময়সীমা বা সফট কাট-অফ। প্রতিটি লাইসেন্স ক্যাটাগরির জন্য পৃথক চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।
আগেভাগে নতুন লাইসেন্সে স্থানান্তরিত হলে পুরোনো লাইসেন্সের অবশিষ্ট মেয়াদ নতুন লাইসেন্সের মেয়াদের সঙ্গে যুক্ত হবে। তবে মাইগ্রেশনের জন্য সরকার কোনো আর্থিক প্রণোদনা, ভর্তুকি বা ফি মওকুফ দেবে না। নতুন লাইসেন্স পেতে নতুন নীতিমালার শর্ত অনুযায়ী বিনিয়োগ করতে হবে। আগের বিনিয়োগের মূল হিসাবমূল্যের ২০ শতাংশের বেশি অবচয় না হলে নতুন লাইসেন্স বরাদ্দে বিবেচনার সুযোগ থাকতে পারে।
নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে অপারেটরদের নতুন বাধ্যবাধকতা
লাইসেন্সিং সুবিধার পাশাপাশি নতুন নীতিমালায় মোবাইল অপারেটর ও অন্যান্য লাইসেন্সধারীদের জন্য কঠোর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং সেবার মানসংক্রান্ত শর্ত রাখা হয়েছে।
মোবাইল টাওয়ারের ৫০ শতাংশে দেড় বছরের মধ্যে এবং ৮০ শতাংশে তিন বছরের মধ্যে ফাইবার সংযোগ দিতে হবে।
ব্যাকবোন ফাইবার ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করতে হবে।
দুর্যোগপ্রবণ এলাকার ২৫ শতাংশ টাওয়ারে ডিজেল জেনারেটর রাখতে হবে।
নতুন ও নবায়নকারী লাইসেন্সধারীদের IPv4 থেকে IPv6-এ স্থানান্তর সম্পন্ন করতে হবে।
নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বাধ্যবাধকতা লাইসেন্স পাওয়ার দুই বছরের মধ্যে এবং নির্ধারিত KPI এক বছরের মধ্যে পূরণ করতে হবে।
2G/3G বন্ধ, VoLTE, VoWiFi, 5G, VoNR, Wi-Fi 6 ও Wi-Fi 7 নিয়ে প্রযুক্তিগত বিবর্তন পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে।
শর্ত পূরণ না হলে আর্থিক জরিমানা, স্পেকট্রাম ফিরিয়ে নেওয়া, লাইসেন্স স্থগিত অথবা বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
অন্যদিকে অনগ্রসর অঞ্চল, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে পারফরম্যান্সভিত্তিক স্পেকট্রাম ফি বা লাইসেন্স ফি ছাড়, সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড থেকে অর্থায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির অনুদান দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য ঠেকাতে নতুন নজরদারি
নতুন নীতিমালায় Significant Market Power (SMP) নিয়ন্ত্রণের জন্য পৃথক ইউনিট গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারে প্রভাব খাটিয়ে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করলে বিটিআরসি তার ওপর মূল্য নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো শেয়ারিং, পাইকারি মূল্য নির্ধারণ, হিসাবের স্বচ্ছতা এবং ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার নির্দেশ দিতে পারবে।
এমনকি টাওয়ার, ফাইবার, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ও ডেটা সেন্টারের মতো বিভিন্ন স্তরেও এ নজরদারি প্রযোজ্য হবে।
বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা ও ভোক্তাস্বার্থে নতুন সমীকরণ
সামগ্রিকভাবে নতুন নীতিমালার লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক সংযোগ থেকে গ্রাহক পর্যায়ের ইন্টারনেট সেবা পর্যন্ত টেলিকম খাতের প্রতিটি স্তরকে নতুন করে বিন্যস্ত করা। আইআইজি, আইজিডব্লিউ ও আইসিএক্সের মতো পৃথক মধ্যবর্তী স্তর বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সংযোগ, অবকাঠামো এবং গ্রাহকসেবাকে পৃথক লাইসেন্স কাঠামোয় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
মোবাইল অপারেটরদের জন্য নেটওয়ার্ক ও স্পেকট্রাম শেয়ারিংয়ের সুযোগ, আইএসপিদের জন্য উন্মুক্ত লাইসেন্স, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবসায় নতুন প্রবেশের সুযোগ এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের জন্য পৃথক কাঠামো—সব মিলিয়ে এটি টেলিযোগাযোগ খাতের ব্যবসায়িক মডেল পরিবর্তনের একটি বড় প্রস্তাব।
তবে নতুন কাঠামোর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে চূড়ান্ত লাইসেন্সিং গাইডলাইন, মাইগ্রেশনের শর্ত, আন্তঃসংযোগ ও পিয়ারিংয়ের মূল্য নির্ধারণ, স্পেকট্রাম শেয়ারিংয়ের অনুমোদন এবং বাজার প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর। বিশেষ করে আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের পাইকারি বাজারে প্রতিযোগিতা কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নির্ধারণে বিটিআরসির পরবর্তী গাইডলাইন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সূত্রমতে, আগামী ৫ নভেম্বরের পর এই খসড়া গাইডলাইনটি চূড়ান্ত হতে পারে। তবে এর আগে গাইডলাইন নিয়ে ব্যবসায়ী অংশীদারদের সঙ্গে আলাপ করার ওপর তাগিদ রয়েছেন ব্যাবসয়ীদের।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই/এমআইএসটি//





