যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক প্রযুক্তিতে ১৪০টি জিনের মিউটেশন শনাক্ত; খরচ মাত্র ১২ থেকে ৬৫ হাজার টাকা
বারডেমে এক-তৃতীয়াংশ খরচে আধুনিক জিন বিশ্লেষণ: ক্যানসারের নির্ভুল লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত
- মার্কিন ইলুমিনার নেক্সটসিক ৫৫০ ও মাইসিক সিকোয়েন্সার প্রযুক্তিতে ডিএনএ-আরএনএ বিশ্লেষণ
- বিদেশে দেড় লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের পরীক্ষা দেশে মিলছে নামমাত্র খরচে; সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা
- নিজস্ব ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণে জমি খুঁজছে বাডাস; ল্যাবে নেওয়া হচ্ছে আইএসও ১৫১৮৯ ২০২২ সনদ
ক্যানসার শনাক্তকরণ, ঝুঁকি নিরূপণ এবং রোগীর ব্যক্তিগত জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে সঠিক ওষুধ ও লক্ষ্যভিত্তিক থেরাপি (Targeted Therapy) নির্ধারণে বিশ্বমানের জিন বিশ্লেষণ পরীক্ষা এখন দেশেই সম্ভব হচ্ছে। বিদেশে যেখানে এই পরীক্ষা করাতে দেড় লাখ টাকার বেশি খরচ হয়, সেখানে রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালে একই ধরনের আধুনিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা যাচ্ছে মাত্র ১২ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকায়। ফলে পরীক্ষাভেদে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খরচে নির্ভুল চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রোগীদের বিপুল অর্থ, সময় এবং বিদেশে যাওয়ার ভোগান্তি সাশ্রয় হচ্ছে।
১ নভেম্বর, রবিবার বারডেমের অণু-পরীক্ষা গবেষণাগার পরিদর্শন শেষে হাসপাতালের প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহরাব আলম এবং বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন এই স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিগত অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক সিকোয়েন্সার প্রযুক্তির ব্যবহার
বারডেমের উচ্চপ্রযুক্তির অণু-পরীক্ষা ল্যাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত জিনোমিক্স প্রতিষ্ঠান ইলুমিনার (Illumina) অত্যাধুনিক ‘নেক্সটসিক ৫৫০’ (NextSeq 550) ও ‘মাইসিক’ (MiSeq) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে। এই নেক্সট-জেনারেশন সিকোয়েন্সিং (NGS) প্রযুক্তির মাধ্যমে একসঙ্গেই বহু জিনের মিউটেশন বা কাঠামোগত পরিবর্তন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে ল্যাবটিতে মোট ১৪০টি ক্যানসারসংশ্লিষ্ট জিন পরীক্ষার পরিকাঠামো রয়েছে; যার মধ্যে ১১১টি জিনের ডিএনএ (DNA) এবং ২৯টি জিনের আরএনএ (RNA) বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহরাব আলম জানান, মানবদেহের কোষে ডিএনএ মিউটেশনের ফলেই মূলত ক্যানসারের উৎপত্তি ঘটে। সনাতন পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট জিন পরীক্ষা করা গেলেও বারডেমের মাল্টি-জিন প্যানেলের মাধ্যমে একসঙ্গে স্তন, ডিম্বাশয়, ফুসফুস, পাকস্থলী, খাদ্যনালি, কোলন, অগ্ন্যাশয়, যকৃৎ, ত্বক ও মস্তিষ্কের ক্যানসারের জিনগত রূপান্তর চিহ্নিত করা যায়।
এর মধ্যে স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে বিআরসিএ-১, বিআরসিএ-২, পিআইকেথ্রিআইসিএ (PIK3CA), টিপি৫৩ (TP53); ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আরএডি৫১সি ও বিআরআইপি-১; এবং ফুসফুসের ক্যানসারে ইজিএফআর (EGFR), বিআরএএফ (BRAF), কেআরএএস (KRAS), এমইটি (MET), এএলকে (ALK), আরওএস-১ (ROS-1) ও আরইটি (RET) জিনের পরিবর্তন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া বংশগত ক্যানসার এবং ডিএনএ ক্ষতি মেরামতকারী (HRR) সংক্রান্ত ২৭টি জিনের ত্রুটিও শনাক্ত করা হচ্ছে এখানে।
ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা ও ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স পর্যবেক্ষণ
একই অঙ্গে ক্যানসার হলেও রোগীদের জিনগত ভিন্নতার কারণে সব ওষুধ সবার ক্ষেত্রে কাজ করে না। এই জিন বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিকিৎসকেরা সরাসরি জানতে পারছেন কোন নির্দিষ্ট ওষুধে ক্যানসার কোষ ধ্বংস হবে এবং কোন ওষুধের বিরুদ্ধে কোষগুলো প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। রোগীর টিস্যুর নমুনা কিংবা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এসব তথ্য পাওয়া যায়। টিস্যু প্রক্রিয়াকরণে বারডেমের নিজস্ব প্যাথলজি বিভাগ থেকে কোনো বাড়তি ফি নেওয়া হয় না। পরীক্ষার ফলাফল দেশের ল্যাবেই দ্রুত সম্পন্ন হওয়ায় বিদেশে নমুনা পাঠানোর দীর্ঘ ১৫ থেকে ৩০ দিনের অপেক্ষারও অবসান ঘটেছে। আন্তর্জাতিক মান ও গ্রহণযোগ্যতা সুদৃঢ় করতে গবেষণাগারটির জন্য আন্তর্জাতিক মান সনদ 'আইএসও ১৫১৮৯:২০২২' (ISO 15189:2022) অর্জনের কাজ চলছে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন বলেন, দেশে এমন নির্ভুল বায়োটেকনোলজিক্যাল পরীক্ষার অপ্রতুলতার কারণে ক্যানসার রোগীদের একটি বড় অংশ চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেতেন। দেশে কম খরচে জিন সিকোয়েন্সিংয়ের সুযোগ রোগীর বিদেশমুখিতা কমানোর পাশাপাশি জাতীয় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে। তিনি আরও জানান, ক্যানসার রোগীদের সমন্বিত সেবা দিতে বারডেমের নিজস্ব ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য হাসপাতালের সন্নিকটে দুই একর জমি অনুসন্ধান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ।
//ডিবিটেক/এএসআর/এসএমই/এমভিএনও//





