প্রথম সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশ স্বপ্নের
টেকসই কৃষি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্ব
- ২০২১–২০২৫ সালের চার বছরের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ
- ৬৮৫টি আউটলেটের মাধ্যমে প্রতিদিন সেবা পেয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি পরিবার
- ৮ হাজার ৫০০ কর্মীর ১৯ শতাংশ নারী
দেশের রিটেইল খাতে টেকসই কৃষি, দায়িত্বশীল পণ্য সংগ্রহ, পরিবেশ সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অগ্রগতি তুলে ধরে প্রথমবারের মতো ‘সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ প্রকাশ করেছে স্বপ্ন। ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত চার বছরের কার্যক্রমের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে কৃষকদের সহায়তা, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগ ও অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে।
‘লিডিং চেঞ্জ, নারচারিং টুমরো’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি রোববার (৮ নভেম্বর) ঢাকার গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী নেতা, কূটনীতিক, টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং স্বপ্নের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সারা দেশে স্বপ্নের আউটলেট ছিল ৬৮৫টি। এসব আউটলেটের মাধ্যমে প্রতিদিন ১ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি পরিবারকে সেবা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ সময়ে স্বপ্নে কর্মরত ছিলেন ৮ হাজার ৫০০ জনের বেশি কর্মী, যাঁদের ১৯ শতাংশ নারী।
অনুষ্ঠানে টেকসই উন্নয়ন নিয়ে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন সিএসআর সেন্টারের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ফারুক সোবহান; বাংলাদেশে জাপান দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন ও মিনিস্টার ইয়োশিদা আয়া; এসিআই পিএলসির গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর ড. আরিফ দৌলা; মিৎসুই অ্যান্ড কোং (এশিয়া প্যাসিফিক) পিটিই লিমিটেডের কান্ট্রি চেয়ারপারসন কেনিচিরো কাওয়ামোতো; গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ফারজানা চৌধুরী এবং সিএসআর সেন্টারের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার শাহামিন এস জামান।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন সিএসআর সেন্টারের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ফারুক সোবহান। প্যানেল আলোচনার মডারেটরের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে টেকসই উন্নয়ন নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্যোগে আশাবাদ প্রকাশ করে তিনি বলেন, নানা চ্যালেঞ্জ ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়েছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ফারুক সোবহান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহার এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে স্বপ্নের উদ্যোগগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশ কেবল নিয়ম মেনে চলার বিষয় নয়; বরং ব্যবসায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।’
ইয়োশিদা আয়া বলেন, ‘রিটেইল খাতে খাদ্য অপচয় রোধ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক পণ্য বিক্রি না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এই অপচয় কমাতে কার্যক্রমের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং উন্নতির সুযোগ খুঁজে বের করা জরুরি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। স্বপ্নের এই উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে আলোচনা ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে, যা আরও টেকসই ব্যবসায়িক কার্যক্রম গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।’
ড. আরিফ দৌলা বলেন, ‘কৃষকদের ন্যায্যতা ও আরও ভালো সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরু থেকেই আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। স্বপ্নের সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে আমরা ক্রমেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়াচ্ছি। এআই আমাদের কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন এনেছে। এর মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রিটেইল খাত গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।’
কেনিচিরো কাওয়ামোতো বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার সফলতার জন্য টেকসই উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি, এসিআই ও স্বপ্ন সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং টেকসই ব্যবসায়িক চর্চা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্বপ্নের প্রথম সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশ এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই অর্জনের জন্য আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানাই।’
ফারজানা চৌধুরী বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে টেকসই উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বিশেষ করে কৃষিবিমা এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করতে শক্তিশালী অংশীদারত্ব এবং স্বচ্ছ সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্টিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
শাহামিন এস জামান বলেন, ‘দেশের রিটেইল খাতের উন্নয়ন, কৃষকদের সহায়তা এবং অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনে স্বপ্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রথম সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট প্রকাশের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে অভিনন্দন জানাই। এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করতে পেরে সিএসআর সেন্টার গর্বিত। তথ্যভিত্তিক এই প্রতিবেদন স্বপ্নের বর্তমান অবস্থান মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়নের অগ্রগতি পরিমাপে সহায়ক হবে।’
এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাব্বির হাসান নাসির বলেন, বাংলাদেশের রিটেইল খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে অতীতের অভিজ্ঞতা ও নতুন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার ওপর। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এমনভাবে এগিয়ে যাওয়া, যাতে আমাদের গ্রাহক, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সম্মিলিত এই অগ্রযাত্রা নিয়ে গর্ব করতে পারে।’
অনুষ্ঠানে ‘ফ্রম সয়েল টু সোল: স্বপ্ন’স সাসটেইনেবিলিটি জার্নি’ শীর্ষক একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। এর আগে বক্তব্য দেন এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) ডিরেক্টর, মার্কেটিং অ্যান্ড গ্রোথ মো. মাহাদি ফয়সাল। ভিডিওতে কৃষক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে স্বপ্নের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হয়।
স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত কৃষক, কর্মী, গ্রাহক ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের অংশগ্রহণে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এতে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কার্যক্রমও তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন, টেকসই কৃষি, শোভন কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ সুরক্ষায় নেওয়া উদ্যোগগুলো।
প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও জোরদার করার পাশাপাশি বাংলাদেশে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রিটেইল খাত গড়ে তুলতে অবদান রাখতে চায় স্বপ্ন।
//ডিবিটেক/এটিএমপি/এসএমই/এমএসআই//





