১,০৯৫ দিনে বদলে যাক বাংলাদেশের অর্থনীতি
তিন বছরের সুযোগ, সংস্কারের ঐতিহাসিক পরীক্ষা
|
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে অতিরিক্ত তিন বছরকে নিছক সময় বাড়ানোর ঘটনা হিসেবে দেখলে বড় ধরনের ভুল হবে। বরং এটিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই তিন বছরে আমরা কী করতে চাই? শুধু আন্তর্জাতিক সুবিধাগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করব, নাকি এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলব, যা বিশেষ কোনো বাণিজ্যিক সুবিধা ছাড়াই বিশ্ববাজারে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে?
এই সময়সীমাকে শুধু তিন বছর হিসেবে দেখলে চলবে না; আমাদের হিসাব করতে হবে দিন ধরে। তিন বছরের সময়কালকে ১,০৯৫ দিনের পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ২০২৮ সাল অধিবর্ষ হওয়ায় ২৪ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত প্রকৃত ব্যবধান ১,০৯৬ দিন। তাই সব পরিকল্পনা, সংস্কার ও বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে প্রতিটি দিনকে কাজে লাগানোর মানসিকতা নিয়ে।
দিন হিসেবে হিসাব করলে প্রতিটি কাজের সময়ের গুরুত্ব এবং জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ তৈরি হবে। ফলে তিন বছর সময় আছে—এমন আত্মতুষ্টি নয়, বরং প্রতিটি দিনকে কাজে লাগানোর মানসিকতা গড়ে উঠবে।
কারণ, অর্থনৈতিক সংস্কার কোনো ঘোষণার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় না। এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট লক্ষ্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা, পরিমাপযোগ্য ফলাফল এবং নিয়মিত জবাবদিহি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে জাতীয় প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড
এই কর্মপরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি জাতীয় এলডিসি প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড প্রতিষ্ঠা।
বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা নিজ নিজ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু একটি সংস্কার কার্যক্রমের সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক, নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন হচ্ছে কি না এবং সামগ্রিকভাবে জাতীয় লক্ষ্যের কতটুকু অর্জিত হচ্ছে—তা এক জায়গা থেকে পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
এ জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড চালু করা যেতে পারে। সেখানে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্দিষ্ট কর্মসম্পাদন সূচক, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা, দৈনিক ও মাসিক অগ্রগতি এবং বাস্তব অর্জনের তথ্য থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা এক নজরে দেখতে পারবেন, কোন মন্ত্রণালয় নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে, কোনটি পিছিয়ে আছে এবং কোন সংস্কার কার্যক্রমে প্রশাসনিক বা নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
তবে শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট ফলাফলের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সরকারি কর্মসম্পাদন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা অনুসরণ করা যেতে পারে। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা এবং ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব, যেখানে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সরাসরি সংযোগ থাকবে।
যে ১০টি খাতে জরুরি সংস্কার অপরিহার্য
এলডিসি উত্তরণ মূলত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি পরীক্ষা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কসুবিধা কমে যাওয়া, রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি কতটা শক্তিশালী, সেটিই নির্ধারণ করবে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সাফল্য।
আমার বিবেচনায় অন্তত ১০টি খাতে অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার প্রয়োজন।
১. রপ্তানি বহুমুখীকরণ: তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় একটি অংশ তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি এবং এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কসুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে এখনই রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এ লক্ষ্যে ওষুধশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), সফটওয়্যার সেবা, সীমান্তপারের ই-কমার্স, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া আউটসোর্সিং (বিপিও), কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং হালকা প্রকৌশলশিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
এসব খাতে উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, দেশীয় অর্থায়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে ডিজিটাল সেবা, সফটওয়্যার, বিপিও ও সীমান্তপারের ই-কমার্সের মাধ্যমে প্রচলিত পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি সেবা রপ্তানি থেকেও উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
সরকারকে প্রতিটি অগ্রাধিকার খাতের জন্য আলাদা রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য, সময়সীমা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের বাধা দূর করা, নতুন বাণিজ্য চুক্তি, পণ্য ও সেবার আন্তর্জাতিক সনদ এবং রপ্তানিকারকদের জন্য সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—বাংলাদেশকে শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নয়, বরং বহুমুখী পণ্য ও সেবা রপ্তানিকারক অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
২. বাণিজ্যনীতি: নতুন বাজার ও বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তুতি
এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে বিদ্যমান শুল্কসুবিধা ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তাই এখন থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।
শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি বাজারে বাংলাদেশের কোন পণ্যের সম্ভাবনা রয়েছে, কোন খাতে শুল্কঝুঁকি বেশি এবং কী ধরনের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে, তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো সংশ্লিষ্ট দেশে নতুন বাজার অনুসন্ধান, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সংযোগ (B2B) তৈরি, বাণিজ্যিক সুযোগ চিহ্নিত করা এবং দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতিকে আরও সক্রিয়, তথ্যনির্ভর এবং ফলাফলকেন্দ্রিক করতে হবে।
৩. ব্যাংকিং খাত: অর্থনীতির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা
একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়তে হলে শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য।
খেলাপি ঋণ, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় অনিয়ম এবং আর্থিক খাতে আস্থার সংকট বিনিয়োগের পথে বড় বাধা।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে ঋণ অনুমোদন ও আদায় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, দুর্বল ব্যাংকের কার্যকর পুনর্গঠন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, প্রযুক্তি উদ্যোগ এবং রপ্তানিমুখী নতুন শিল্পের জন্য সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. রাজস্ব সংস্কার: করের আওতা বাড়াতে হবে, ব্যবসার ওপর অযৌক্তিক চাপ নয়
বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সরকারের নিজস্ব রাজস্ব সক্ষমতা শক্তিশালী করতে হবে।
এ জন্য কর প্রশাসন আধুনিকায়ন, করদাতার তথ্যের ডিজিটাল সমন্বয় এবং রাজস্ব গোয়েন্দা বিশ্লেষণব্যবস্থার মাধ্যমে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, বকেয়া রাজস্ব, রাজস্ব ফাঁকি ও নতুন রাজস্ব আহরণের সুযোগ চিহ্নিত করতে হবে। ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থাভিত্তিক কর সংস্কারের মাধ্যমে করের আওতা ও আদায়ের পরিধিও বাড়াতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কারের মাধ্যমে কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন করের বোঝা তৈরি করা নয়, বরং বিদ্যমান অর্থনীতির বৃহত্তর অংশকে ন্যায্য ও স্বচ্ছ কর ব্যবস্থার আওতায় আনা।
মনে রাখতে হবে, শুধু ওয়েবসাইটের মাধ্যমে করের তথ্য প্রদান বা কর পরিশোধের ব্যবস্থা চালু করলেই প্রকৃত স্বয়ংক্রিয়করণ নিশ্চিত হয় না। প্রকৃত স্বয়ংক্রিয়করণ তখনই সম্ভব, যখন দেশের সব পর্যায়ের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের ক্যাশ মেশিনের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা যাবে। এর মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজস্ব ব্যবস্থায় যুক্ত হবে এবং কর ফাঁকি কমিয়ে রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়ানো সম্ভব হবে।
৫. বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থা: রপ্তানি প্রতিযোগিতার বাস্তব ভিত্তি
বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, কাস্টমস এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি।
আন্তর্জাতিক বাজারে একটি পণ্য শুধু উৎপাদন খরচের কারণে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে না। পণ্য কত দ্রুত, কত কম খরচে এবং কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের কার্যকর অগ্রগতি, কাস্টমস ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণ এবং জাতীয় একক বাণিজ্যসেবা ব্যবস্থা বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সিঙ্গাপুরের মতো দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বন্দর পরিচালনা, পণ্য খালাসের সময় এবং সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় কমাতে হবে।
৬. জ্বালানি নিরাপত্তা: শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ
শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তিসেবা এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অপরিহার্য। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে কোনো বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে আগ্রহী হবেন না।
তাই জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৭. বিদেশি বিনিয়োগ: শুধু বিনিয়োগ আহ্বান নয়, বিনিয়োগ বাস্তবায়ন
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকলেও ব্যবসা শুরু, অনুমোদন, জমি, কর, অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। সেখানে বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্নত অবকাঠামো, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ, কর সুবিধা ও ওয়ান-স্টপ সেবা নিশ্চিত করতে হবে, যেন একজন বিনিয়োগকারীকে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে না হয়। বিনিয়োগ অনুমোদন ও সেবা প্রদানের প্রক্রিয়াও সহজ করতে হবে।
এ ছাড়া বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবে বিনিয়োগকৃত অর্থের মধ্যে পার্থক্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ শুধু অর্থের উৎস নয়; এর মাধ্যমে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, আন্তর্জাতিক বাজার এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিনিয়োগকারীরা যেন তাঁদের বিনিয়োগকৃত অর্থ ও মুনাফা আইনসম্মতভাবে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে পারেন, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট আইনি নিশ্চয়তা, অধিকার ও সরকারি প্রতিশ্রুতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৮. শিক্ষা ও দক্ষতা: ভবিষ্যতের অর্থনীতির জন্য নতুন প্রজন্ম প্রস্তুত করা
বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল সেবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করতে না পারলে জনসংখ্যাগত সুবিধা একসময় অর্থনৈতিক চাপে পরিণত হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়, মন্ত্রণালয়, সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিত করে একটি জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এর লক্ষ্য হবে ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা রপ্তানি বৃদ্ধি।
বিশ্বব্যাংক ও ইউএনডিপির সহযোগিতা, দক্ষতা উন্নয়ন, সরকারি সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, স্টার্টআপ উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণার প্রতিটি উদ্যোগে এই টাস্কফোর্সের সমন্বয়, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে যেসব প্রচলিত কাজ পরিবর্তিত হতে পারে, সেসব পেশার কর্মীদের পুনরায় দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা এখনই শুরু করা জরুরি।
৯. পণ্যের মান ও আন্তর্জাতিক শর্ত পূরণ
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু কম দামে পণ্য উৎপাদন যথেষ্ট নয়। পণ্যের মান, শ্রমিক অধিকার, পরিবেশগত মানদণ্ড, নিরাপত্তা এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে পরিবেশ ও উৎপাদনসংক্রান্ত শর্ত ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক মান সনদ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নে সহায়তা দিতে হবে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য মান পরীক্ষার সুযোগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা সহজলভ্য করতে হবে।
১০. সুশাসন ও বিচারব্যবস্থা: অর্থনৈতিক আস্থার ভিত্তি
কোনো দেশ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করে উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি।
ব্যবসায়িক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি, চুক্তির বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিনিয়োগকারীকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তিনি জানবেন তাঁর বিনিয়োগ, সম্পদ ও ব্যবসায়িক অধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত।
অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা
বাংলাদেশের সামনে এই তিন বছরে নতুন করে সবকিছু আবিষ্কারের প্রয়োজন নেই। যেসব দেশ সফলভাবে অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটিয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা এবং কর্মসম্পাদন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই জাতীয় লক্ষ্যের অধীনে আনা সম্ভব।
ভুটান তাদের এলডিসি উত্তরণ প্রস্তুতিকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ উত্তরণকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
মালদ্বীপ পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। বাংলাদেশেরও নিজস্ব সম্ভাবনা অনুযায়ী পর্যটন, ডিজিটাল সেবা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি করা উচিত।
তবে কোনো দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করলেই হবে না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, জনসংখ্যা, শিল্প সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনা করে উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
প্রথম ১০০ দিন: ঘোষণা নয়, দৃশ্যমান বাস্তবায়ন
১,০৯৫ দিনের পরিকল্পনাকে কার্যকর করতে হলে প্রথম ১০০ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই সময়ে অন্তত পাঁচটি কাজ সম্পন্ন করা উচিত।
প্রথমত, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় এলডিসি প্রস্তুতি ও রূপান্তর টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, বেসরকারি খাত, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞদের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে জাতীয় প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্দিষ্ট কর্মসম্পাদন সূচক, সময়সীমা এবং সংস্কার বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণ করতে হবে।
চতুর্থত, বেসরকারি খাতকে শুধু পরামর্শ দেওয়ার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অংশীদার করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রতি ১০০ দিন অন্তর অগ্রগতি মূল্যায়ন করে একটি প্রকাশ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। কোন লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং কেন হয়নি, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
বেসরকারি খাতকে বাদ দিয়ে এই রূপান্তর সম্ভব নয়
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি, বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অপরিহার্য।
তাই জাতীয় প্রস্তুতি পরিকল্পনায় ব্যবসায়ী সংগঠন, রপ্তানিকারক, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নতুন উদ্যোগ এবং ডিজিটাল বাণিজ্য খাতের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের কাজ হবে নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামো, দক্ষতা, অর্থায়ন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। আর বেসরকারি খাতকে উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে নেতৃত্ব দিতে হবে।
বিশেষ করে আগামী দিনে সীমান্তপারের ডিজিটাল বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং দেশীয় পণ্যের বৈশ্বিক বিপণন বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
শেষ কথা: ২০২৯ সাল যেন আরেকটি প্রস্তুতির সময়সীমা না হয়
এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য কোনো সমাপ্তি নয়। এটি বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সূচনা।
আমরা যদি আগামী তিন বছর শুধু বিদ্যমান সুবিধা ধরে রাখার চিন্তায় ব্যয় করি, তাহলে ২০২৯ সালের পর নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে ব্যাংকিং, রাজস্ব, বাণিজ্য, শিক্ষা, জ্বালানি, বন্দর, বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বাস্তব সংস্কার করতে পারলে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের সক্ষমতা নির্ধারিত হয় না সে কত দিন বিশেষ সুবিধা পেয়েছে, তার ওপর; বরং নির্ধারিত হয় বিশেষ সুবিধা ছাড়াই সে কতটা প্রতিযোগিতা করতে পারে, তার ওপর।
এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং ফলাফলভিত্তিক নেতৃত্ব।
আমরা যেন ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বরের জন্য অপেক্ষা না করি। বরং প্রতিটি দিনকে একটি জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করি।
এটি শুধু তিন বছরের সময় বৃদ্ধি নয়। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
তাই সঠিকভাবে পরিকল্পনা না করলে কল্পনা কল্পনাই থেকে যাবে, আর পরিকল্পনার পরী পাখা মেলে উড়ে যাবে।
| লেখক || উদ্যোক্তা, আইসিটি নীতি বিশ্লেষক . |
সম্পাদকীয় নোট
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কেবল একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন বা উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সামর্থ্যের বড় পরীক্ষা। আশিক নূন তার নিবন্ধে এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে অতিরিক্ত তিন বছরের সময়কে একটি সময়বদ্ধ অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছেন।
নিবন্ধটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এর বাস্তবায়নকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কর্মসম্পাদন সূচক, ১০টি অগ্রাধিকার খাতে সংস্কার এবং প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনার প্রস্তাবগুলো অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে সমন্বয় ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বিশেষভাবে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা রপ্তানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ওপর লেখকের গুরুত্বারোপ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
নিবন্ধটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলাদেশ কত দ্রুত নিজস্ব উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে পরিকল্পনার চেয়ে বেশি তার বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নিয়মিত জবাবদিহির ওপর।
এটি লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ ও প্রস্তাবনাভিত্তিক মতামতধর্মী নিবন্ধ। এখানে উত্থাপিত নীতিগত সুপারিশগুলোকে বাস্তবায়িত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় আলোচনার জন্য প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।





