জাতিসংঘের ইউএনজিএ ৮১ অধিবেশনের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৃতীয় টাউনহল; গ্লোবাল সাউথের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতে ১৮ মাসের কূটনৈতিক রোডম্যাপ ঘোষণা

এআই বৈশ্বিক নীতিতে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ

এআই বৈশ্বিক নীতিতে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ
১২ আগষ্ট, ২০২৬ ১৯:১৮  
  • ​আগামী সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের (ইউএনজিএ ৮১) সভাপতিত্ব গ্রহণের পূর্বে সর্বশেষ জাতীয় পরামর্শ সভা হিসেবে এই টাউনহল আয়োজন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
  • ​বৈশ্বিক প্রযুক্তি কাঠামোতে গ্লোবাল সাউথের ‘কম্পিউট সার্বভৌমত্ব’ ও ‘সভরেইন এআই’ নিশ্চিত করতে ১৮ মাসের একটি কূটনৈতিক রোডম্যাপ গ্রহণ করা হয়েছে।
  • ​যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্যাক্স সিলিকা’ এবং চীনের ‘ওয়াইকো’—উভয় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গেই ভারসাম্য বজায় রেখে সম্পৃক্ত হবে বাংলাদেশ।
  • ​বাংলাদেশ এআই অবজারভেটরির এখতিয়ার বাড়িয়ে জাতীয় গণনাক্ষমতা পরিমাপ ও অ্যালগরিদম নিরীক্ষায় ‘গ্লোবাল কম্পিউট ও ডিপেন্ডেন্সি মনিটর’ যুক্ত করার অনুমোদন।
  • ​জেন্ডার ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে প্রযুক্তি নীতির একটি মৌলিক কাঠামো হিসেবে নির্ধারণ এবং সভরেইন এআই অর্থায়নে বিশেষ বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম গঠনের সিদ্ধান্ত।

ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২৬: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গভর্ন্যান্স ও উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম জুমে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি (আইটিআইটি) অনুবিভাগের “এআই গভর্ন্যান্স ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি স্থাপত্য” শীর্ষক তৃতীয় জাতীয় টাউনহলে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। আগামী সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের (ইউএনজিএ ৮১) ঐতিহাসিক সভাপতিত্ব গ্রহণের পূর্বে এটিই ছিল বাংলাদেশের সর্বশেষ ও চূড়ান্ত প্রস্তুতিমূলক জাতীয় পরামর্শ সভা।

​“জাতিসংঘ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত সম্পৃক্ততা: গ্লোবাল সাউথের কম্পিউট সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমে দিকনির্দেশনা” প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত এই চ্যাথাম হাউস রুল-ভিত্তিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইটিআইটি ও আইসিটি অনুবিভাগের মহাপরিচালক এবং প্রধান উদ্ভাবন কর্মকর্তা ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন। অধিবেশনে বাংলাদেশ, আর্মেনিয়া, ইথিওপিয়া, নরওয়ে, যুক্তরাজ্য এবং আফ্রিকা মহাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতিক, জাতিসংঘ সংস্থার প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক থিঙ্ক ট্যাংক, শিক্ষাবিদ এবং ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দসহ ৬টি দেশের ১৯ জন বক্তা অংশ নেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন, "বৈশ্বিক এআই গভর্ন্যান্স এখন আর কেবল নৈতিক ঘোষণাপত্রে সীমাবদ্ধ নেই; তা সেমিকন্ডাক্টর, বিদ্যুৎ গ্রিড ও গণনাক্ষমতার মতো বাস্তব ভৌত উপাদানের দিকে সরে এসেছে। আপনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিনে নিতে পারবেন না। হয়তো কম্পিউট কেনা যায়, কিন্তু এআই কেনা যায় না। এআইকে প্রশিক্ষণ দিতে হয়, নিজের এআই নিজেকেই গড়ে তুলতে হয়।"

​অধিবেশনে বৈশ্বিক প্রযুক্তি কাঠামোর ৪টি প্রধান ভৌত ভার্টিক্যাল—এআই মডেল ও কম্পিউট; সেমিকন্ডাক্টর; বিদ্যুৎ গ্রিড; এবং মহাকাশ ও স্যাটেলাইট অবকাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মুক্ত আলোচনায় এর সঙ্গে সক্ষমতা উন্নয়ন, পানি ব্যবহার ও ই-বর্জ্যের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়। সভায় বর্তমান বিশ্বের দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি জোট—যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্যাক্স সিলিকা’ (২৪টি দেশ) এবং চীনের ‘ওয়াইকো’ (২৯টি দেশ)—এর মূল্যায়ন করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, বাংলাদেশ কোনো একক ব্লকের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে হার্ডওয়্যার ও জ্বালানির জন্য প্যাক্স সিলিকা এবং ওপেন সোর্স মডেল ও অবকাঠামো অর্থায়নের জন্য ওয়াইকো—উভয় ইকোসিস্টেমের সঙ্গেই কৌশলগতভাবে সম্পৃক্ত হবে। এছাড়া সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞাকে শুধু কম্পিউটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অবকাঠামো, ডেটা, জ্ঞান ও বিচারবোধের স্তরভিত্তিক সক্ষমতা হিসেবে পুনর্সংজ্ঞায়িত করা হয়।

​তিন ধাপের এই জাতীয় প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত অধিবেশনে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর তিনটি বড় সম্প্রসারণ অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ এআই অবজারভেটরির অধীনে একটি ‘গ্লোবাল কম্পিউট ও ডিপেন্ডেন্সি মনিটর’ স্থাপন, খসড়া জাতীয় এআই নীতি ২০২৬-২০৩০ বাস্তবায়নে ‘সভরেইন এআই বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম’ গঠন এবং থিম্যাটিক ওয়ার্কিং গ্রুপগুলোকে জাতিসংঘের গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্টের মানদণ্ড প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সাথে জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গিকে কারিগরি নীতিমালার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার সুপারিশ গৃহীত হয়।

​ইউএনজিএ ৮১ সভাপতিত্বকালকে কেন্দ্র করে সভায় ১৮ মাসের একটি সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক রোডম্যাপ এবং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল দলিল (কূটনৈতিক অবস্থানপত্র, অবজারভেটরির সম্প্রসারিত সনদ এবং বহুপাক্ষিক বিনিয়োগ কাঠামো) আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছে।

রোডম্যাপ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কম্পিউট সার্বভৌমত্ব বিষয়ে গ্লোবাল সাউথের দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করবে, নভেম্বর ২০২৬-এ জাতিসংঘে ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেবে, ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এ উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী পর্যায়ের প্যানেল আয়োজন করবে এবং সেপ্টেম্বর ২০২৭-এ (ইউএনজিএ ৮২) ‘সভরেইন কম্পিউট ও ডিজিটাল স্বায়ত্তশাসন বিষয়ক গ্লোবাল সাউথ সনদ’ উপস্থাপন করবে। জি-৭৭ ও আফ্রিকান গ্রুপের মতো জোটগুলোকে সাথে নিয়ে নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অভিন্ন সম্পদ হিসেবে এই দলিলগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হবে। এই তিন টাউনহলের কারিগরি ফলাফল একত্র করে চলতি আগস্ট ২০২৬-এর শেষভাগে একটি চূড়ান্ত জাতীয় এআই পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হবে।

​//ডিবিটেক/আইএইচ/এমআরআই//