এবার আইপিওর আবেদন করল চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই

এবার আইপিওর আবেদন করল চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই
৯ জুন, ২০২৬ ১৬:৫৬  

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জয়জয়কারের মধ্যে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সূচনা হতে যাচ্ছে। বহুল আলোচিত চ্যাটজিপিটি-এর মূল প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই মার্কিন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং বা আইপিওর প্রাথমিক খসড়া আবেদন জমা দিয়েছে। গত সোমবার (৮ জুন) খোদ কোম্পানিটি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। 

এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ‘ক্লড’ চ্যাটবটের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-ও মার্কিন বাজারে আইপিও-র আবেদন করেছিল। দুই এআই জায়ান্টের এই পাবলিক মার্কেটে যাওয়ার প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।  

ওপেনএআই তাদের আইপিও-র আকার, শেয়ারের দাম বা নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো প্রকাশ করেনি। এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি জানিয়েছে, "চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারণে কিছুটা সময় লাগতে পারে, কারণ বেশ কিছু কৌশলগত কাজ রয়েছে যা একটি প্রাইভেট কোম্পানি হিসেবে সম্পন্ন করা তুলনামূলক সহজ।" 

তবে রয়টার্সের বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, ওপেনএআই এই আইপিও-র মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলার বাজার মূল্যায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই শেয়ার বাজারে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

ট্রিলিয়ন ডলারের ত্রিমুখী লড়াই ও স্পেসএক্স-এর রেকর্ড
চলতি ২০২৬ সালে মার্কিন পুঁজিবাজার এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছে, যেখানে একই সাথে তিনটি বিশালাকৃতির কোম্পানি ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করার লক্ষ্য নিয়ে বাজারে নামছে। গত ১০ বছরের মধ্যে উচ্চ-প্রবৃদ্ধি সম্পন্ন প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে এটি।

স্পেসএক্স: ইলন মাস্কের রকেট ও স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স ইতিমধ্যেই আইপিওর দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। চলতি সপ্তাহেই (১২ জুন) কোম্পানিটি নাসডাকে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে। এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের বৃহত্তম আইপিও, যেখানে ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যায়নে কোম্পানিটি বাজার থেকে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

অ্যানথ্রোপিক: গত ১ জুন অ্যানথ্রোপিক আইপিওর গোপন আবেদন ফাইল করে। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে তারা ৬৫ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল ফান্ডিং রাউন্ড সম্পন্ন করে, যা কোম্পানিটির মূল্যায়নকে ৯৬৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যায়। তাদের কোডিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘ক্লড কোড’ এবং সাইবার সিকিউরিটি মডেল ‘মিথোস’-এর বিপুল চাহিদার কারণে তারা জুনের এই কোয়ার্টারেই প্রথম লাভের মুখ দেখতে যাচ্ছে।  

ওপেনএআই: অ্যানথ্রোপিক মূল্যায়নের দিক থেকে সামান্য এগিয়ে যাওয়ায় ওপেনএআই-ও আর দেরি না করে বাজারে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে সফটব্যাংক, অ্যামাজন এবং এনভিডিয়ার মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৮৪০ বিলিয়ন ডলার মূল্যায়নে ১১০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছিল ওপেনএআই।  

আয়ের ব্যাপক প্রবৃদ্ধি কিন্তু মুনাফা ২০৩০ সালে!
আর্থিক খতিয়ানের দিক থেকে ওপেনএআই অবিশ্বাস্য গতিতে এগোচ্ছে। গত মার্চ মাসে কোম্পানিটি জানায় যে, তাদের মাসিক রাজস্ব বা রেভিনিউ ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারে পৌঁছেছে, যা ইন্টারনেট ও মোবাইল যুগের শুরুর দিকের গুগল (অ্যালফাবেট) বা মেটার চেয়েও প্রায় চার গুণ দ্রুত গতিতে বাড়ছে। অথচ ২০২৪ সালের শেষেও তাদের ত্রৈমাসিক (কোয়ার্টারলি) আয় ছিল মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার। 

বর্তমানে চ্যাটজিপিটির প্রতি সপ্তাহে সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯০ কোটিরও বেশি এবং এর পেইড কনজিউমার সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৫ কোটি ছাড়িয়েছে।  তবে বিপুল আয়ের এই জোয়ার সত্ত্বেও, জেনারেটিভ এআই মডেল ও ডেটা সেন্টারের আকাশচুম্বী খরচের কারণে ওপেনএআই আগামী ২০৩০ সালের আগে লাভের মুখ দেখবে না বলে বিনিয়োগকারীদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।

ইলন মাস্কের আইনি বাধা দূর
ওপেনএআই-এর এই আইপিওর পেছনে অন্যতম বড় একটি আইনি জট সম্প্রতি খুলে গেছে। ২০১৫ সালে একটি অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওপেনএআই যাত্রা শুরু করলেও ২০১৯ সালে বাণিজ্যিক তহবিল সংগ্রহের জন্য এর একটি লাভজনক শাখা খোলা হয়। এই কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে প্রথম দিকের অন্যতম উদ্যোক্তা ও বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক ওপেনএআই এবং এর সিইও স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। 

মাস্কের অভিযোগ ছিল, মানবতার কল্যাণের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তিগত মুনাফার হাতিয়ার বানানো হচ্ছে। তবে গত মে মাসে মার্কিন জুরি সর্বসম্মতিক্রমে ইলন মাস্কের সেই মামলাটি খারিজ করে দেয়, যা ওপেনএআই-এর আইপিওর পথ একদম পরিষ্কার করে দিয়েছে।

পুঁজিবাজারের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্পেসএক্স, অ্যানথ্রোপিক এবং ওপেনএআই-এর মতো ব্লকবাস্টার আইপিওগুলো মার্কিন শেয়ার বাজারে এক নতুন জোয়ার আনবে। তবে ডেল্টা ও ডেভিডসনের মতো ফাইন্যান্সিয়াল ফার্মের বিশ্লেষকদের মতে, এই বড় বড় কোম্পানিগুলো বাজার থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার মূলধন শুষে নিলে মাঝারি ও ছোট আকারের অন্য কোম্পানিগুলোর আইপিও-র ক্ষেত্রে মূলধনের কিছুটা সংকট তৈরি হতে পারে।

ডিবিটেক/বিএমটি    ।    সূত্র: টেকক্রাঞ্চ