৪,৩০০ চাকরিচ্যুত কর্মীর ৩৩,১৪৭ কোটি টাকার সুদের পাওনা আটকে রাখার অভিযোগ

পাওনা ও রাজস্ব আদায়ের দাবিতে এনবিআরের সামনে গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীদের বিক্ষোভ

  • গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ১০-১২ সালের ডব্লিউপিপিএফ (WPPF) সুদের পাওনা আটকে রাখার অভিযোগ
  • ১৬ বছরের বকেয়া পাওনা আদায়ের দাবিতে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি
  • পাওনা পরিশোধে সরকারের ১৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা

পাওনা ও রাজস্ব আদায়ের দাবিতে এনবিআরের সামনে গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীদের বিক্ষোভ
৩ আগষ্ট, ২০২৬ ১৪:২৮  

৩ আগস্ট, সোমবার: পাওনা আটকে রাখার অভিযোগে বহুজাতিক টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন লিমিটেডের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন জোরদার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চাকরিচ্যুত সাবেক কর্মীরা। সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘গ্রামীণফোন ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদের’ ব্যানারে এক প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

ঝিরঝিরে বৃষ্টি উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীরা ছাতা মাথায় বিভিন্ন প্রতিবাদী ফেস্টুন ও ব্যানার নিয়ে এনবিআর ভবনের সামনের ফুটপাথে সমবেত হন এবং বকেয়া পাওনা আদায়ের দাবিতে নানা স্লোগান দেন। সমাবেশ শেষে সংগঠনের একটি প্রতিনিধিদল এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। তাদের ভাষ্যমতে, গ্রামীণফোন তাদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করলে কর বাবদ সরকার প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করতে পারবে।

সমাবেশে বক্তাদের অভিযোগ, ২০১০ থেকে ২০১২ অর্থবছরের ‘ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড’ (WPPF) এবং ‘ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ড’ (WWF)-সংক্রান্ত ৫ শতাংশ বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ দীর্ঘ ১৬ বছরেও পরিশোধ করেনি গ্রামীণফোন। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী এই অর্থ পরিশোধযোগ্য হলেও, আইনি জটিলতা তৈরি করে রিট আবেদনের মাধ্যমে বছরের পর বছর শ্রমিকদের প্রাপ্য অর্থ আটকে রাখা হয়েছে।

সংগঠনের আহ্বায়ক আবু সাদাত মো. শোয়েব বলেন, দীর্ঘদিন পাওনা আটকে থাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪,৩০০ সাবেক কর্মী পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মামলা-মোকদ্দমার দীর্ঘসূত্রতা একদিকে যেমন শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, তেমনি অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব আহরণকেও ব্যাহত করেছে।

সমাবেশে মোহাম্মদ তানভীর আহমেদ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমাদের ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালের লভ্যাংশের টাকা সময়মতো না দিয়ে রিটের মাধ্যমে কালক্ষেপণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে আইনি চাপে পড়ে মূল টাকা দেওয়া হলেও বিলম্বের জন্য প্রযোজ্য সুদের টাকা বাদ দেওয়া হয়।” তিনি আরও যুক্ত করেন, “শ্রম আইনের চক্রবৃদ্ধি সুদের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে ৪,৩০০ জন সাবেক কর্মীর মোট পাওনা দাঁড়ায় প্রায় ৩৩,১৪৭ কোটি টাকা। তবে আমরা একটি নমনীয় সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছি। মূল হিসাবের মাত্র ০.০৩% বা জনপ্রতি ১০ কোটি টাকা পেলেই আমরা গ্রামীণফোনের সঙ্গে এই দীর্ঘদিনের বিরোধ মিটিয়ে নিতে রাজি।”

স্মারকলিপিতে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী, ঐক্য পরিষদের সমঝোতার প্রস্তাব মেনে কর পরিশোধের পর প্রতি সুবিধাভোগীকে ১০ কোটি টাকা করে দেওয়া হলে, সরকার সরাসরি আয়কর রাজস্ব হিসেবে ন্যূনতম ১৩ হাজার কোটি টাকা লাভ করবে।

এ লক্ষ্যে স্মারকলিপিতে এনবিআরের প্রতি চারটি সুস্পষ্ট আহ্বান জানানো হয়:

  • ১. জনস্বার্থ ও বিপুল সম্ভাব্য রাজস্ব আহরণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা;
  • ২. প্রয়োজনবোধে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টির আইনি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া;
  • ৩. আইন অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করে সরকারের প্রাপ্য কর নির্ধারণ ও আদায় নিশ্চিত করা; এবং
  • ৪. শ্রমিক বিরোধের একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায্য ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা।

সংগঠনের প্রচার সম্পাদক আদিবা জেরিন বলেন, গ্রামীণফোনের শ্রমিকদের ১৬ বছরের আইনগত পাওনা অবিলম্বে পরিশোধ, অর্জিত অধিকার সংরক্ষণ এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের দাবিতে আজকের এই কর্মসূচি। ঝড়, বৃষ্টি, রোদ সবকিছু উপেক্ষা করে টানা ১৯ মাস ধরে রাজপথে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার আন্দোলন চলছে। ন্যায্য পাওনার দাবি জানাতে গিয়ে ম্যানেজমেন্টের দায়ের করা মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হলেও কোনো কিছুই শ্রমিকদের ন্যায়বিচারের দাবি থেকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। প্রাপ্য সম্পূর্ণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

প্রসঙ্গত, একই দাবির ধারাবাহিকতায় আন্দোলনকারীরা এর আগে গত ২৯ জুলাই এনবিআর ভবনের পাশে অবস্থিত বিটিআরসি কার্যালয়ের সামনেও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিলেন। এরপর ১ আগস্ট প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন তারা। 

//ডিবিটেক/ এমএজে/ এসআইএম//