প্রযুক্তির মেলায় উদ্ভাবনের স্পন্দন

বিটিআরসি মেলায় জীবনের নতুন ভাষা

বিটিআরসি মেলায় জীবনের নতুন ভাষা
১৯ মে, ২০২৬ ১০:৪৭  
১৯ মে, ২০২৬ ১৪:০৬  

সপ্তাহের শুরুর দুই কর্মব্যস্ত দিনে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিটিআরসি মিলনায়তন যেন পরিণত হয়েছিল প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের এক ক্ষুদ্র প্রতিরূপে। ১৭ মে, বিশ্ব টেলিকম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী মেলায় অংশ নেয় ৩০টি প্রতিষ্ঠান। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, মোবাইল অপারেটর, প্রযুক্তি উদ্ভাবক, ডেটা সেন্টার, নেটওয়ার্ক সল্যুশন কোম্পানি থেকে শুরু করে তরুণ গবেষকদের স্টল—সব মিলিয়ে প্রযুক্তি, সংযোগ ও উদ্ভাবনের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় রূপ নেয় পুরো আয়োজন।

১৮ মে, সোমবার বিকেল পর্যন্ত চলা এই মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ নতুন প্রযুক্তি দেখেছেন, কেউ সরাসরি সেবা নিয়েছেন, আবার কেউ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছেন প্রদর্শকদের সঙ্গে। স্টলজুড়ে চলেছে পণ্য বিক্রি, সেবা গ্রহণ, অভিযোগ শুনানি ও ডিজিটাল জীবনধারা নিয়ে সচেতনতামূলক উপস্থাপনা।

তবে পুরো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে দুটি উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান—‘রোবোলাইফ টেকনোলজিস’ এবং ‘নরসিংদী সায়েন্স অ্যান্ড রোবোটিক্স ল্যাব (এনএসআরএল)’। প্রযুক্তিকে মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত করে তারা দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরে এক ভিন্ন বাস্তবতা।

কৃত্রিম হাত, কিন্তু বাস্তব জীবনের আশার স্পর্শ

রোবোলাইফ টেকনোলজিসের স্টলে ছিল পাঁচ ধরনের রোবোটিক হাত। শুধু প্রদর্শনী নয়, এগুলো ছিল জীবন বদলে দেওয়ার গল্প। যাদের হাত নেই, কিন্তু মাংসপেশি ও নার্ভ এখনও সক্রিয়—তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ রোবোটিক হ্যান্ড। এমনকি যাদের হাতে নার্ভ সিগন্যাল পাওয়া যায় না, তাদের জন্যও তৈরি হয়েছে সেন্সর-ট্রান্সমিটারযুক্ত বিশেষ স্যান্ডেল, যার মাধ্যমে কৃত্রিম হাত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক জয় বড়ুয়া লাভলু জানান, বিশ্বের পাঁচটি দেশে তারা তাদের তৈরি রোবোটিক হাত রপ্তানি করেছেন। খুব শিগগিরই ভারতে একটি শাখা চালুর প্রস্তুতিও চলছে। বর্তমানে তারা রোবোটিক পা নিয়েও কাজ করছেন।

রোবোলাইফের চিফ ম্যানেজমেন্ট অফিসার সোহেল রানা সৌরভ বলেন, “প্রযুক্তি শুধু যন্ত্র নয়, এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার একটি সুযোগ। আমাদের তৈরি কৃত্রিম হাত এখন পর্যন্ত দেশের ১২০ জন ব্যবহার করছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন জুলাই যোদ্ধাও রয়েছেন।”

স্টলে প্রদর্শিত প্রস্থেটিক সিলিকন গ্লাভসযুক্ত হাতগুলো এতটাই বাস্তবসম্মত ছিল যে অনেক দর্শনার্থী কাছে গিয়ে স্পর্শ না করলে বুঝতেই পারছিলেন না সেটি কৃত্রিম।

দেশীয় ড্রোনে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ

মেলার আরেক আকর্ষণ ছিল ৩০ নম্বর স্টলে থাকা ‘নরসিংদী সায়েন্স অ্যান্ড রোবোটিক্স ল্যাব’-এর তিন ধরনের ড্রোন। এর মধ্যে একটি ড্রোন ব্যবহার করা যাবে বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি ওষুধ, রক্তের ব্যাগ, শুকনো খাবার কিংবা লাইফ জ্যাকেট পৌঁছে দিতে। আরেকটি সার্ভিলেন্স ড্রোন সীমান্ত নজরদারি ও উপকূলীয় এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে ব্যবহার উপযোগী।

সবচেয়ে আলোচনায় ছিল তাদের ক্যামেরা ড্রোন, যা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাফি হোসেন সরাসরি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ডিজেআই-কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।

তিনি বলেন, “আমাদের তৈরি ড্রোন ৫৮ মিনিটের বেশি আকাশে উড়তে পারে, যা একই শ্রেণির ডিজেআই ড্রোনের চেয়েও বেশি সময়। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে—এটির ক্যামেরা মডিউল প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়।”

রাফি হোসেন জানান, ড্রোনের বডি থেকে শুরু করে অধিকাংশ যন্ত্রাংশই দেশেই তৈরি করা হয়েছে। কার্বন ফাইবার দিয়ে নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি এসব ড্রোনের গবেষণা ও উন্নয়ন চলছে পুরোপুরি নিজস্ব অর্থায়নে। গত ছয় মাসে তারা আটটি এগ্রিকালচার ড্রোন বিক্রি করেছেন বলেও জানান তিনি।

প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতার সংযোগ

মেলার এক কোণজুড়ে ছিল জুলাই যোদ্ধা আবু সাঈদ ও মুগ্ধদের স্মরণে বিশেষ প্রদর্শনী। উদীয়মান প্রযুক্তি ও আত্মত্যাগের গল্প যেন একই ফ্রেমে এসে দাঁড়িয়েছিল সেখানে।

অন্যদিকে দেশের শীর্ষ প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের সেবা ও উদ্ভাবন নিয়ে হাজির হয় মেলায়। অংশ নেয় বিজয়, ব্র্যাকনেট, গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন, সিম্ফোনি, সেলেক্সট্রা, বাংলালিংক, রবি, গ্রামীণফোন, টেলিটক, মেট্রোনেট, টায়ার থ্রি ডেটা সেন্টার, ইডটকো এবং আইসিসি কমিউনিকেশনস।

আইসিসি কমিউনিকেশনসের রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ম্যানেজার মো. মেহেদী হাসান মুন জানান, দর্শনার্থীদের মধ্যে তাদের ‘হোম ইন্টারনেট উইথ মোবাইল মিনিটস অ্যান্ড ডাটা’, স্টারলিংক সংযোগ, ক্লাউড হোম এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘আয়না’-কে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে।

স্টারলিংক, স্যাটেলাইট আর ডিজিটাল ভবিষ্যৎ

রবি আজিয়াটার স্টলে ছিল স্টারলিংকের বিশেষ আয়োজন। সেখানে সাজানো ছিল বিভিন্ন ধরনের স্যাটেলাইট ডিশ, ওয়াই-ফাই রাউটার, ট্রাইপড স্ট্যান্ড ও সংযোগ সরঞ্জাম। দর্শনার্থীদের সামনে স্যাটেলাইটভিত্তিক কানেক্টিভিটির সক্ষমতা তুলে ধরছিলেন কর্মকর্তারা।

বিপরীতে বড় ডিজিটাল ডিসপ্লে নিয়ে উপস্থিত ছিল বাংলালিংক। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার রেজাউল ইসলাম জানান, দুই দিনে তারা প্রায় ৩০টি অভিযোগ ও পরামর্শ পেয়েছেন, যেগুলোর নিষ্পত্তি মেলা শেষের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, “কলড্রপ কমাতে এখন আমরা স্যাটেলাইট ইন্টারনেটও ব্যবহার করছি।”

প্রযুক্তি শুধু প্রদর্শনী নয়, সেবা

মেলায় নিজেদের ভেন্যুতেই ছয়টি সেবা বুথ চালু করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। বিশেষ করে হিসাব বিভাগের বুথে ছিল সবচেয়ে বেশি ভিড়। সংস্থাটির হিসাবরক্ষক তাসলিমা আক্তার জানান, দুই দিনে অর্ধশতাধিক সেবা দেওয়া হয়েছে। সেখানে তথ্য প্রদান, ডকুমেন্ট গ্রহণ ও সরাসরি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের মতামত ও নিবন্ধনের জন্য কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবস্থাও রাখা হয়।

প্রযুক্তির মেলায় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

এই মেলা শুধু প্রযুক্তিপণ্যের প্রদর্শনী ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা, উদ্ভাবন ও মানবিক প্রয়োগের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। কৃত্রিম হাত থেকে শুরু করে দেশীয় ড্রোন, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট থেকে ডিজিটাল সেবা—সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, প্রযুক্তি এখন আর কেবল যন্ত্রের গল্প নয়; এটি মানুষের জীবন, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও সম্ভাবনার নতুন ভাষা।