এআই ব্যবহারে প্রতিযোগিতামূলক হবে আর্থিক খাত, সমন্বিত নীতিমালার তাগিদ
বাংলাদেশের আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, গতি ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে মানব সমাজের জ্ঞান ও এআই-এর বিশ্লেষণক্ষমতার যৌথ প্রয়োগে গুরুত্বারোপ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে- ‘এআই ব্যবহারে আর্থিক খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।’
৮ ডিসেম্বর, সোমবার রাজধানীর ইস্কাটনে বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘দ্য ফিউচার অব প্রফেশনাল এক্সিলেন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শীর্ষক সেমিনারে এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন বক্তারা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্টের (বিআইপিডি) আয়োজনে দিনব্যাপী এই সেমিনারে শতািধিক শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা অংশ নেন।
তিনটি সেশনে তারা এআই (অও) নির্ভর রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, ডেটা ড্রিভেন সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশি আর্থিক বাজারে প্রযুক্তির সম্ভাবনার ওরপ আলোকপাত করে এআই-চালিত আর্থিক পরিবর্তনের নতুন দিকনির্দেশনা দেন।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে এখনই এআই সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণে সেমিনারে ঐক্যমত পোষণ করেন অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি, গবেষণায় বিনিয়োগ, ডেটা-প্রযুক্তি অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রযুক্তির ব্যবহার- এসবই হবে ভবিষ্যতের আর্থিক ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।
বিআইপিডির চেয়ারম্যান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন এবং গ্লোবাল ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান সভাপতি সাঈদ আহমেদ। সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখবেন বিআইপিডির মহাপরিচালক কাজী মো. মোরতুজা আলী। সমাপনী বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বিআইপিডির একাডেমিক কাউন্সিল-এর চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ।
সেমিনারে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আলোচনায় অংশ নেন।
সভাপতির বক্তব্যে ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এআই-নির্ভর রূপান্তরের যে বৈপ্লবিক যুগ শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের খাত-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত। তিনি আরেও বলেন, এআই এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এটি আর্থিক খাতের কার্যক্রমে বাস্তবসম্মত প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে মানবসম্পদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স পিএলসির চেয়ারম্যান সাঈদ আহমেদ বলেন, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, গতি ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে মানব সমাজের জ্ঞান ও এআই-এর বিশ্লেষণ ক্ষমতার যৌথ প্রয়োগ অপরিহার্য। বিশেষ করে বিমা খাতে দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে পারলে সেবার মান অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রাহক আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
বিআইপিডির মহাপরিচালক কাজী মো. মোরতুজা আলী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রফেশনাল দক্ষতা মানেই প্রযুক্তির সঙ্গে অভিযোজিত হওয়ার ক্ষমতা। এআই মানুষের বিকল্প নয়; বরং এটি দক্ষ পেশাজীবীর সম্ভাবনাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে। তিনি বলেন, যথাযথ পর্যায়ে গবেষণা ও বাস্তবমুখী জ্ঞান না থাকলে ভবিষ্যৎ আর্থিক খাতে প্রতিযোগিতা টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ বাংলাদেশের বিমা খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনও মানসম্মত আর্থিক সেবার বাইরে রয়েছে, অথচ তাদের প্রত্যাশা সীমিত ও সহজ-সরল। প্রযুক্তিনির্ভর বিমা সেবা দুর্গম অঞ্চলেও পৌঁছে দিতে পারলে এই জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তার চিত্র পালটে যেতে পারে।
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের বিমা খাত এখনো প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক পিছিয়ে; গবেষণা, উদ্ভাবন এবং এআই-ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার না দিলে এই খাত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।
সেমিনারের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থিক পরিবেশে সাইবার নিরাপত্তা, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং কাঠামোর নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা। বক্তারা মনে করেন, প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক সেবায় নিরাপত্তাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আর এ খাতে এআই-চালিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি আর্থিক বাজারে তথ্য-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উন্নত রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের ক্ষেত্রেও এআই হবে সবচেয়ে সক্ষম হাতিয়ার।
দিনব্যাপী আলোচনার পর উপস্থিত আগ্রহী পেশাজীবীরা জানান, এআই-চালিত পরিবর্তন শুধু খাতের দক্ষতা বাড়াবে না, বরং আর্থিক খাতকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রাখবে। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে উচ্চতর মানে উন্নীত করা সম্ভব- এমনই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সেমিনারটি শেষ হয়।
জীবন বীমা ও সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ড. মোহাম্মদ সোহরাব উদ্দিন, বাংলাদেশ জেনারেল ইনস্যুরেন্স কম্পানির উপদেষ্টা এ. কে. আজিজুল হক চৌধুরী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের ডিরেক্টর জেনারেল এস. এম. আব্দুল হাকিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ প্রমুখ সেমিনারে বক্তব্য রাখেন।
সেমিনারের প্রথম সেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভুঁইয়া, রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্সের হেড অব রিইনস্যুরেন্স মো. আব্দুল কাদির, অগ্রণী ব্যাংকের শারমিন তাজরিয়া অনন্যা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সেক্রেটারী অব স্টেটের চীফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি অফিসার আলতাফ উদ্দিন।
দ্বিতীয় সেশনটি সঞ্চালনা করেন সোনালী ব্যাংক পিএলসি’র সিআইটিও মো. রেজওয়ান আল বখতিয়ার। এই সেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সোনালী ব্যাংকের ড. জাহিদুজ্জামান জাহিদ, অগ্রণী ব্যাংকের এ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার খন্দকার শহীদ হায়দার, এনআরবি ব্যাংকের সাবেক চীফ ডিজিটাল অফিসার আবু সাইদ মো. আশরাফুজ্জামান, এবং বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ফয়সাল আহমেদ। এই সেশনে জালিয়াতি শনাক্তকরণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং নিরাপদ ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।
সেমিনারের তৃতীয় সেশন মডারেট করেন প্রগতি লাইফ ইনস্যুরেন্সের এমডি এন্ড সিইও মো. জালালুল আজিম। এই সেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাইক্রোইনস্যুরেন্স বিশেষজ্ঞ ও চার্টার্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সের সাবেক সিইও এস. এম জিয়াউল হক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের এভিপি মো. সাইফুল আলম তালুকদার এবং নেটকম লার্নিং এর হেড অব ট্রেইনিং এন্ড সলিউশন মো. ইমদাদুল ইসলাম
এই সেশনে এআই নির্ভর রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, ডেটা ড্রিভেন সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশি আর্থিক বাজারে প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
ডিবিটেক/কেকে/ইকে







