পানি সংরক্ষণ কৌশলে খুলতে পারে কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনাময় বাজার; নবায়ন যোগ্য জ্বালানীতে আসছে প্রাণ
পানি সংরক্ষণ কৌশল মিথেন গ্যাস নির্গমন হ্রাসে সহায়তা করতে পারে এবং কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশের পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে ১২ জুলাই শনিবার অনুষ্ঠিত সাসটেইনাবিলিটি সামিটে কী নোট উপস্থাপনায় এমনটাই জানিয়েছেন লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেডের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর শেহজাদ মুনিম। অপরদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিকাশে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল বড় বিনিয়োগ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী।
বিদ্যুতের নতুন ব্যবসায়িক মডেল বা মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা মৌলভীবাজারে নবায়নযোগ্য সোলার এনার্জির প্রকল্প করছি। এটা হয়তো দেশের সবচেয়ে বড় নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প হবে। ওপরে সোলার প্যানেল হবে, নিচে মাছ চাষ হবে। আমরা সরকারকে মার্চেন্ট পলিসি দিয়েছি। মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাংলাদেশে ছিল না। তবে আমরা পিছু হটিনি। আমরা বলিনি যে আমরা কানাডায় গিয়ে মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি করবো। আমরা বলবো পৃথিবীর সব জায়গায়, থাইল্যান্ডে বা ভিয়েতনামে মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি থাকে, বাংলাদেশেও এটি থাকতে হবে।’
মূল প্রবন্ধে শেহজাদ মুনিম বলেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন এখন কেবল একটি বিকল্প নয়—এটি টিকে থাকার শর্ত। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এবং আন্তঃখাত সহযোগিতা প্রয়োজন। পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন (ইএসজি) কোনো দাতব্য কাজ নয়—এটি ব্যবসা ও শাসন ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত, যদি আমরা সত্যিই ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রাগুলো পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকি। অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য, কিন্তু পরিবেশগত সূচকগুলো বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে।
উদাহরণস্বরূপ, পানি সংরক্ষণ কৌশল মিথেন গ্যাস নির্গমন হ্রাসে সহায়তা করতে পারে এবং কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশের পথ খুলে দিতে পারে। রাজশাহীর মতো শহর দেখিয়েছে, কীভাবে স্থানীয় পরিকল্পনা ও নাগরিক সম্পৃক্ততা মিলিয়ে পরিবেশগত স্বাস্থ্য উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা যায়। তাই এখনই সময় এসডিজি বাস্তবায়নকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারপত্রের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে যুক্ত করার, যেন দীর্ঘমেয়াদি নীতি নির্ধারণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসেবে টেকসই চর্চার প্রসার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে টেকসইতার মুখ্য ভূমিকা নিয়ে সংলাপগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। এছাড়া বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় উৎপাদন খাতে ইএসজির বাস্তবায়নে তথ্য ও উপাত্তের ব্যবহার, টেকসই জাতি গঠনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা এবং সবুজ বাংলাদেশ বিনির্মাণে রূপান্তর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার মতো বিষয়গুলো।
আলোচনায় অংশ নেন গ্রিন স্কিলস অ্যান্ড ক্লাইমেট অ্যাকশনস ইউনেসকো চেয়ার (এডুকেশন ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নুরুন্নবী, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’র প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের সিনিয়র স্ট্র্যাটেজি অ্যাডভাইজর রজার লেভারমোর প্রমুখ।
তিনটি কি নোট সেশন, তিনটি প্যানেল আলোচনা, দুটি ইনসাইট সেশন ও একটি কেস স্টাডির সমন্বয়ে সাজানো এই আয়োজনে প্রাধান্য পায় দেশের অভ্যন্তরে পরিচালিত ব্র্যান্ড ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে যথাযথ পরিকল্পনা ও নীতিগত কৌশলের অবলম্বন করে জাতিসংঘের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় তার রূপরেখা প্রণয়নে।
আকিজ বশির গ্রুপের পরিবেশনায় ও এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই সামিটের দ্বিতীয় সংস্করণে উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের গ্রুপ সিইও ও নির্বাহী সম্পাদক সাজিদ মাহবুব বলেন, টেকসইতা এখন আর কোনো বিকল্প নয়—এটাই ভবিষ্যতমুখী ব্যবসার ভিত্তি। সাসটেইনাবিলিটি সামিটের এই দ্বিতীয় আসরের মাধ্যমে আমরা এমন একটি শক্তিশালী সংলাপ তৈরি করতে চাই, যা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একত্রিত করে কার্যকর উদ্যোগে অনুপ্রাণিত করবে, উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনে সম্মিলিত যাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে। এখনই আমাদের সচেতন ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।
‘সাসটেইনেবল সামিট ২০২৫’ এর প্রথম সেশনে প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউল্যাব উপাচার্য অধ্যাপক ইমরান রহমান। আলোচকরা বিনিয়োগকারীদের টেকসই ও নৈতিক বিনিয়োগ পদ্ধতি বা ইসএসজি বাস্তবায়নে সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।রিটেইল চেইন সুপারশপ স্বপ্নের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির, সোশ্যাল মার্কেটিং এন্টারপ্রাইজের এমডি সায়েফ নাসের ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
বিভিন্ন সেশনে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- দেবাশীষ রায়, ডিরেক্টর-অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড পার্টনারশিপ, বাংলাদেশ ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট এক্সচেঞ্জ (আইআইএক্স); তাসনীম তায়েব, হেড অব এনভায়রনমেন্টাল কমপ্লায়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি, সাউথ এশিয়া, কোটস; দীপেশ নাগ, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেড; সুনীল আইজ্যাক, কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইডটকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড; ড. এ. কে. এনামুল হক, ডিরেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)সহ আরও বিশেষজ্ঞ পেশাজীবীরা।
সামিটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী একটি সেশনে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ এক প্যানেল আলোচনা। সাসটেইনেবল ব্র্যান্ড ইনিশিয়েটিভ-এর প্রজেক্ট লিড জান্নাতুল ফেরদৌসীর সঞ্চালনায় এই তরুণরা টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নিয়ে নিজেদের ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।
সাসটেইনাবিলিটি সামিট ২০২৫ আকিজ বশির গ্রুপের পরিবেশনা এবং এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের সঞ্চালনায় আয়োজিত হয়েছে। আয়োজনটির স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার- ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভার্টাইজিং অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ, এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশন ও মার্কেটিং সোসাইটি অব বাংলাদেশ। হসপিটালিটি পার্টনার- র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেল ঢাকা; পিআর পার্টনার- ব্যাকপেজ পিআর এবং অফিসিয়াল ক্যারিয়ার পার্টনার- টার্কিশ এয়ারলাইন্স। সামিটিটির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম ও সাসটেইনেবল ব্র্যান্ড ইনিশিয়েটিভ। সাসটেইনাবিলিটি সামিট ২০২৫ বাংলাদেশ ইনোভেশন কনক্লেভের একটি উদ্যোগ।





