জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও সেন্ট্রাল ডেটাবেইজের মাধ্যমে দেশে অবৈধ ও আনঅফিশিয়াল মোবাইল ফোন বন্ধের সরকারি উদ্যোগ ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার’ (NEIR) দীর্ঘ জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। ২০২০ সাল থেকে প্রায় ৫ বছরেরও বেশি সময় দোলাচলের পর গত ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর ছিল না। বিটিআরসি ২০২১ সালে ট্রায়াল রান শুরু করলেও ক্লোন আইএমইআই, উচ্চ শুল্ক কাঠামো এবং আমদানিকারক ও সাধারণ ভোক্তাদের তীব্র বিরোধিতায় প্রকল্পটি আটকে যায়। অফিশিয়াল হ্যান্ডসেটের উচ্চ শুল্ক (প্রায় ৫৭-৬০%) কমানোর দাবিতে মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (MBCB) সহ খুচরা বিক্রেতারা আন্দোলন ও দোকান বন্ধের কর্মসূচি পালন করে।
অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদকরা জানায়, দেশে বার্ষিক তিন কোটি চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ ফোনই অবৈধ চ্যানেলে দেশে আসে, যার বড় অংশই নকল বা রিফার্বিশড। সম্প্রতি বাজেটে আমদানির ওপর শুল্ক ও কর কিছুটা কমানোয় গ্রে-মার্কেট ও অফিশিয়াল সিমেট্রি তৈরির পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার উচ্চ কর ব্যবস্থা শিথিলকরণ, সাধারণ গ্রাহকের জটিলতা নিরসন এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করে চলতি বছরই একটি 'বেসিক এনইআইআর' কার্যকর করার পথে হাঁটছে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, “NEIR-এর মধ্যে ফোনের মালিকানা প্রক্রিয়াটিকে সহজতর করার মানবিক দিকের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে কোনো অন্যায় না ঘটে। NEIR বাস্তবায়নের সময় পরিবার, বন্ধু, পিতামাতা বা ভাইবোনদের ফোন স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা না হয় তা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। NEIR সিস্টেম চালু না হওয়া পর্যন্ত কোনো সক্রিয় হ্যান্ডসেট বন্ধ করা হবে না, তবে চালু হওয়ার পর এটি কাস্টমস ফাঁকি দেওয়া অবৈধ হ্যান্ডসেট যেমন ক্লোন বা নকলগুলো শনাক্ত করবে। বিদেশ থেকে ফোন আনলে ব্যক্তিদের NEIR বিধিমালা মেনে চলতে হবে। বৈধভাবে আমদানি করা ফোনের নিবন্ধন প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করা হবে। নিবন্ধনের পর ফোনের নির্বিঘ্ন নিবন্ধন এবং ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য, যা আন্তর্জাতিক অনুশীলনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”
একই বিষয়ে জানতে চাইলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি): বিটিআরসির ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ আমিনুল হক বলেন, “যে কোনো সময়ে এনইআইআর কার্যকর করতে আমরা প্রস্তুত। যদি কোনো মডিফিকেশন আসে তা করতে খুব অল্প সময় লাগবে।”
মোবাইল ফোন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (MOIB) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, “ভোক্তা পর্যায়ে এনইআইআর-এ রেজিস্ট্রেশন ও ডিরেজিস্ট্রেশন পর্যায়ে বিপুল জটিলতা ছিল। সেগুলোকে বাদ দিয়ে বেসিক এনইআইআর করলে আমরা একটা বড় ধাপ অতিক্রম করতে পারবো। এর পরে পুরো প্রক্রিয়াটি ফাইন টিউন করা যাবে।”
অপরদিকে পরিবেশক ও আমদানিকারক: বাংলাদেশ মোবাইলফোন ডিস্ট্রিবিউটর অ্যাসোসিয়েশনের (BMDA) মহাসচিব আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, “আমরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই ও সমর্থন করি। কেননা, আমরাও এনইআইআরের পক্ষে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। শুরু হওয়ার পর এটি ফাইন টিউন করা যাবে।”
সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য ব্যবহারকারীরা বেশি দামে ফোন কেনার চিন্তা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন, কারণ এনইআইআর চালু হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সচল ফোন বন্ধ হচ্ছে না এবং বিদেশ থেকে স্বজনদের আনা ফোন নিবন্ধনের পথ সুগম করা হচ্ছে।
সূত্রমতে পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আগামী মাসে স্থানীয় উৎপাদক, আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে চূড়ান্ত মতামত সংগ্রহ করবে। প্রক্রিয়াটি সহজ ও ব্যবহারকারী-বান্ধব করার মাধ্যমে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এনইআইআর কার্যকর হলে তা দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই//