তরুণ উদ্যোক্তায় হাজার কোটি টাকার তহবিল
- ৫০০ কোটি টাকা ঋণ, ৫০০ কোটি টাকা অনুদান
- লক্ষ্য অন্তত পাঁচ হাজার নতুন তরুণ উদ্যোক্তা
- প্রযুক্তি, ই-কমার্সসহ সব খাতে সহজ অর্থায়নের পরিকল্পনা
তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভর, উদ্ভাবনী ও টেকসই উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে এক হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিল থেকে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায় ভালো ফলাফল এবং ঋণ পরিশোধের রেকর্ডের ভিত্তিতে উদ্যোক্তাদের অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি, ই-কমার্স, উৎপাদন, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে অন্তত পাঁচ হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশেষ তহবিলের ৫০০ কোটি টাকা ঋণ এবং বাকি ৫০০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে ব্যবহৃত হবে। প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে যেসব তরুণ ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না, মূলত তাদের এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নেওয়া এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) নেতাদের সঙ্গে ১১ আগস্ট, মঙ্গলবার বিকেলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তহবিলের কাঠামো, ঋণ বিতরণ, উদ্যোক্তা নির্বাচন এবং অনুদান দেওয়ার পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সাংবাদিকদের বলেন, তরুণদের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন বা রিফাইন্যান্সিং এবং অনুদান প্যাকেজ চালুর বিষয়ে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, যেসব তরুণ ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে উদ্যোগ নিতে পারছেন না, তাদের এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাসরুর আরেফিন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ পেতে পারেন। এ ঋণের সুদহার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদহার যেখানে প্রায় ১১ থেকে ১৫ শতাংশ এবং এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের খরচও তুলনামূলক বেশি, সেখানে এই উদ্যোগের আওতায় তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এ উদ্যোগের বিশেষত্ব শুধু কম সুদের ঋণে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ব্যবসা পরিচালনায় সাফল্য এবং ঋণের কিস্তি যথাসময়ে পরিশোধের রেকর্ড বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোক্তাদের অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনাও করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মাসরুর আরেফিন বলেন, কোনো উদ্যোক্তা ১০ লাখ টাকা ঋণ নিলে পরবর্তী সময়ে তার ব্যবসার পারফরম্যান্স ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় একই পরিমাণ, অর্থাৎ সর্বোচ্চ আরও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ব্যাংকগুলো তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে এ অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে তরুণদের মধ্যে ঋণের কিস্তি যথাসময়ে পরিশোধ এবং ব্যবসা টেকসইভাবে পরিচালনার প্রবণতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে ঋণনির্ভরতার বাইরে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তার সুযোগও তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত তহবিলের ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। ফলে জমি বা অন্য কোনো সম্পদ বন্ধক রাখার সক্ষমতা না থাকলেও যোগ্য তরুণদের ব্যবসা শুরু করার সুযোগ থাকবে।
উদ্যোক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও স্থানীয় পর্যায়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বৈঠকে উপজেলা পর্যায়ে প্রকৃত উদ্যোক্তা চিহ্নিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয় ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক কিংবা নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের যাচাই-বাছাই করা হবে।
এতে তদবির, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তির ঋণ পাওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবিবির চেয়ারম্যান জানান, দেশের ৫০০টির বেশি উপজেলায় ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা খুঁজে বের করবে। উদ্যোক্তা বাছাইয়ের সময় ব্যবসার সম্ভাবনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দক্ষতা এবং প্রকৃত উদ্যোগ নেওয়ার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত তহবিলের আওতায় ব্যবসার ধরন নির্দিষ্ট কোনো খাতে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। উৎপাদন ও বাণিজ্য—দুই ধরনের উদ্যোগই এ কর্মসূচির আওতায় আসতে পারে।
সম্ভাব্য খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে মৎস্য চাষ, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য উৎপাদন, হস্তশিল্প, শতরঞ্জি তৈরি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা। এর ফলে শহরের পাশাপাশি উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের তরুণদেরও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা ও ই-কমার্স খাতের প্রবৃদ্ধিতেও নতুন গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
//ডিবিটেক/বিএনও/এমআইএস//





