ফ্রিল্যান্সিং রেমিট্যান্স ও 'সবার আগে বাংলাদেশ': অপার সম্ভাবনা এবং ব্যাংকিং খাতের বাধা

ফ্রিল্যান্সিং রেমিট্যান্স ও 'সবার আগে বাংলাদেশ': অপার সম্ভাবনা এবং ব্যাংকিং খাতের বাধা
৪ আগষ্ট, ২০২৬ ০০:০৭  

আজকের ডিজিটাল যুগে দেশের লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর জন্য সবচেয়ে প্রমিজিং আর বাস্তবসম্মত আয়ের জায়গা হয়ে উঠেছে অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং ও আইসিটি খাত। তৈরি পোশাক শিল্পের পর খুব অল্প সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস হওয়ার সব রকম ক্ষমতাই এর আছে। সরকার যে 'সবার আগে বাংলাদেশ' বা 'Bangladesh First' নীতি নিয়ে এগোচ্ছে, তার মূলে কিন্তু রয়েছে আত্মনির্ভরশীলতা—চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণরা যেন নিজেদের দক্ষতায় বিশ্বমঞ্চ থেকে আয় করতে পারে। এই চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং ফ্রিল্যান্সারদের টাকা আনার পথ সহজ করতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু যুগান্তকারী নিয়ম চালু করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কাগুজে নীতি যতই ভালো হোক, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা, ডলারের দরের পার্থক্য আর আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামি কাজের অভাবে আমাদের তরুণরা এখনো তাদের মেধার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছেন না।

বিশ্ববাজারে আমাদের অবস্থান

বিশ্বজুড়ে আউটসোর্সিং বা গিগ ইকোনমির বাজার হু হু করে বাড়ছে। বর্তমানে এই ফ্রিল্যান্সিং বাজারের আকার কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে এটি ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আর পুরো প্রজেক্ট-ভিত্তিক কাজের বাজার হিসেব করলে তা শতবিলিয়ন ডলারের ওপর। সেখানে আমাদের দেশের অবস্থান কোথায়? আইসিটি বিভাগের মতে, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সার আছেন, যার মধ্যে নিয়মিত কাজ করেন প্রায় ৫ লাখ। তারা বছর শেষে ৫০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের মতো রেমিট্যান্স দেশে আনছেন। অর্থাৎ, এত বড় বিশ্ববাজারের তুলনায় আমরা কিন্তু এখনো ১ শতাংশের কম ধরে রাখতে পারছি। আবার যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট (OII) বলছে, বিশ্ববাজারে ফ্রিল্যান্সার সরবরাহের দিক থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয়—ঠিক ভারতের পরেই। কিন্তু আয়ের অংকের দিক থেকে আমরা এখনো বেশ পিছিয়ে। কারণ আমাদের অধিকাংশ ফ্রিল্যান্সার এখনো কম মূল্যের প্রথাগত কাজেই সীমাবদ্ধ আছেন।

আমরা কোথায় কাজ করছি এবং ঘাটতি কোথায়?

আমাদের ফ্রিল্যান্সাররা মূলত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের ক্লায়েন্টদের সেবা দেন। আমাদের মূল শক্তি হলো ওয়েবসাইট ডিজাইন ও সাধারণ ডেভেলপমেন্ট (যেমন ওয়ার্ডপ্রেস, শপিফাই), গ্রাফিক ডিজাইন, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, এসইও কিংবা ডাটা এন্ট্রি ও ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্সের কাজ। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে যে কাজগুলোর দাম সবচেয়ে বেশি—যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI/ML), সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ব্লকচেইন প্রযুক্তি কিংবা বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক ডেটা সায়েন্স—সেসব জায়গায় আমাদের উপস্থিতি খুবই কম। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্লায়েন্টের সঙ্গে দরদাম করার মতো ইংরেজি ভাষা ও প্রেজেন্টেশন দক্ষতার দুর্বলতা।

আমাদের প্রতিবেশীরা কীভাবে এগোচ্ছে?

গিগ ইকোনমিতে ফিলিপাইন, ভারত, পাকিস্তান বা ভিয়েতনাম বেশ দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ফিলিপাইন সরকার 'ফ্রিল্যান্সার প্রটেকশন অ্যাক্ট' করার পাশাপাশি এমন এক ক্যাশলেস ব্যবস্থা বানিয়ে দিয়েছে, যেখানে পেপ্যাল বা পেওনিয়ারের মাধ্যমে সরাসরি টাকা চলে আসে কোনো ঝামেলা ছাড়াই। ভারত সরকার আইটি পার্ক ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে, সফটওয়্যার আমদানিতে কর ছাড় দিচ্ছে এবং এআই-ভিত্তিক কাজের জন্য তরুণদের ট্রেইনিং দিতে বাজেট রাখছে। আর পাকিস্তান 'e-Rozgaar' ও ই-রেসিডেন্সি চালু করে ফ্রিল্যান্সারদের পেওনিয়ার বা স্ট্রাইপ ব্যবহারে পথ সহজ করেছে, এমনকি ব্যাংকে আসা প্রতি ডলারে সরাসরি নগদ প্রণোদনাও দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলারে  যা বলছে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য? 

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট সম্প্রতি এফইপিডি-১ (সার্কুলার ২২) জারির মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বেশ কিছু বড় সুযোগ দিয়েছে:

প্রথমত, ইন্টারনেটে সেবা রফতানির ক্ষেত্রে আগের মতো জটিল 'EXP Form' পূরণের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন ই-মেইল, ডিজিটাল চুক্তি, অনলাইন ইনভয়েস বা প্ল্যাটফর্মের স্টেটমেন্ট দেখালেই টাকা জমা হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত রেমিট্যান্সের জন্য কোনো প্রকার 'Form-C' পূরণ করতে হবে না। আর টাকার পরিমাণ ২০ হাজারের বেশি হলে ব্যাংক অ্যাপ বা ডিজিটাল মাধ্যমে তা জমা করার সুবিধা রাখা হয়েছে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের (OPGSP) মাধ্যমে প্রতিবারে সর্বোচ্চ ১০,০০০ ডলার পর্যন্ত সরাসরি দেশে আনা যাবে।

চতুর্থত, আইটি বা সফটওয়্যার আয়ের সর্বোচ্চ ৫০% এবং অন্যান্য সেবার আয়ের ৩০% পর্যন্ত এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা (ERQ) অ্যাকাউন্টে ডলারে রেখে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই ডলার দিয়ে ফ্রিল্যান্সাররা পরবর্তীতে সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন, ডোমেইন-হোস্টিং বা সার্ভারের বিল মেটাতে পারবেন। সাথে ডুয়াল কারেন্সি 'ফ্রিল্যান্সার কার্ড' এবং বিকাশ-নগদের মতো এমএফএস বা পিএসপির মাধ্যমে টাকা তোলার পথও খোলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর শাখা ব্যাংকের মধ্যকার নির্দেশনা এবং কাজের দূরত্বের খেসারত। 

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক এত সুন্দর নিয়ম করার পরও মাঠপর্যায়ে ফ্রিল্যান্সাররা সুফল পাচ্ছেন না কেন? মূল সমস্যা হলো, সার্কুলার জারির পর প্রতিটি ব্যাংকের হেড অফিস থেকে নিজেদের শাখাগুলোর জন্য যে অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা পাঠানো দরকার, তা তৈরিতে অনেক ব্যাংকই বিলম্ব করে। এর ওপর শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ই-কমার্স বা আইটি খাতের লেনদেন সম্পর্কে তেমন ধারণাই নেই। ফলে ঘটে চলেছে নানা রকমের ভোগান্তি:


সি-ফর্মের চক্কর: সার্কুলারে পরিষ্কার বলা আছে ২০,০০০ ডলার পর্যন্ত সি-ফর্ম লাগবে না। অথচ জেলা বা শাখা পর্যায়ে ৫০০ বা ১,০০০ ডলার এলেও ব্যাংক কর্মকর্তারা গ্রাহককে ধরে সি-ফর্ম পূরণ করাচ্ছেন।

ইআরকিউ অ্যাকাউন্ট না খোলা: আয়ের ৫০% ডলারে রাখার নিয়ম থাকলেও ঢাকার বাইরে বা মফস্বল শাখাগুলোতে এই অ্যাকাউন্ট খোলাই যায় না। শুধুমাত্র অথরাইজড ডিলার (AD) শাখায় যেতে বলায় দূর-দূরান্তের ফ্রিল্যান্সাররা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

অহেতুক যোগ্যতা যাচাই ও কর কাটা: ব্যাংকের সাধারণ অফিসারদের হাতে ফ্রিল্যান্সারের কাজের ধরন বা যোগ্যতা যাচাইয়ের ভার দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা জটিলতা। আইটি সেবায় কর ছাড় থাকার পরও অনেক শাখা না বুঝে উৎস থেকে আয়কর (TDS) কেটে রাখছে। ফলে ফ্রিল্যান্সাররা বৈধ পথে টাকা আনতে নির উৎসাহিত হচ্ছেন।

তদারকির অভাব: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভালো নির্দেশগুলো শাখা পর্যায়ে মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য বা ফ্রিল্যান্সারদের অভিযোগ জানানোর মতো কোনো আলাদা 'কমপ্লেন সেল' নেই।

বাস্তব সংকট হুন্ডি, আইনি জটিলতা ও দ্বৈত কর।

একজন ফ্রিল্যান্সার দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও ব্যাংকিং টেবিলে গিয়ে পদে পদে বৈষম্যের মুখে পড়েন।

এক. হুন্ডি ও ব্যাংকের হারের বড় ব্যবধান: ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের অফিশিয়াল রেট যদি হয় ১১৮ টাকা, সেখানে খোলা বাজারে বা অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে তা ১২২ থেকে ১২৯ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। প্রতি ডলারে ৪ থেকে ১১ টাকার এই বড় ব্যবধানের কারণে অনেকেই ব্যাংকিং চ্যানেল ছেড়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে টাকা আনছেন, যা শেষ পর্যন্ত দেশের রেমিট্যান্সেরই ক্ষতি করছে।

দুই. বিদেশে ফান্ড রাখা সংক্রান্ত আইনের জট: 'ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৯৪৭' অনুযায়ী অনুমোদিত উপায় ছাড়া বিদেশে টাকা রেখে দেওয়া বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে যখন কোনো ফ্রিল্যান্সার বা এজেন্সি আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের সরাসরি প্রজেক্ট চালায়, তখন ইউকে বা অন্য দেশের বিজনেস অ্যাকাউন্ট থেকেই অপারেশনাল ও মার্কেটিং খরচ মেটাতে হয়। সব টাকা সঙ্গে সঙ্গে দেশে নিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা থাকায় তাদের বৈশ্বিক ব্যবসা বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিন. Payoneer ও প্রণোদনার জট: পেওনিয়ারের মতো বৈধ প্ল্যাটফর্ম থেকে আনা টাকার সব ডকুমেন্টস থাকা সত্ত্বেও সরকার ঘোষিত ২.৫% প্রণোদনার টাকা অনেক সময় ফ্রিল্যান্সারের অ্যাকাউন্টে ঠিকমতো জমা হয় না।

চার. দ্বৈত করের (Double Taxation) মার প্যাঁচ: বিদেশি ক্লায়েন্টদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে কাজ করার সময় ক্লায়েন্টের দেশ (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ) তাদের স্থানীয় আইন অনুযায়ী উৎসে কর (Withholding Tax) কেটে বাকি টাকা পাঠায়। আবার সেই টাকা বাংলাদেশে আসার পর ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক ট্যাক্স সার্টিফিকেটের সঠিক কাঠামোর অভাবে আবারও প্রসেসিং ফি বা ট্যাক্স কেটে নেয়। ফলে ফ্রিল্যান্সার একই আয়ের ওপর দুই দেশে কর দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এনবিআর ও ব্যাংকের মধ্যে এই দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি (DTAA) সংক্রান্ত ডিজিটাল সমন্বয় না থাকা এর প্রধান কারণ।

পাঁচ. জেনারেটিভ এআই ও পেমেন্টের লিমিটেশন: আজকের দিনে মানসম্মত কাজ করতে হলে প্রজেক্ট পরিচালনায় নামি-দামি সব এআই ও ক্লাউড টুলস (যেমন OpenAI, Midjourney, AWS সার্ভার) সাবস্ক্রাইব করতে হয়। কিন্তু আমাদের ফ্রিল্যান্সার কার্ডে বা ক্রেডিট কার্ডে বাৎসরিক ডলার খরচের যে লিমিট দেওয়া আছে, তা এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগের খরচের তুলনায় খুবই কম। সময়মতো সার্ভার বা এআই টুলের বিল দিতে না পেরে অনেক রানিং প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং বিদেশি অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড হচ্ছে।

ছয়. ERQ অ্যাকাউন্টে সুদের অভাব ও কনভার্সন রেটে লস: ইআরকিউ অ্যাকাউন্টে রাখা ডলার যখন স্থানীয় টাকায় ভাঙানো হয়, তখন ব্যাংকগুলো বাজারের স্বাভাবিক রেটের চেয়ে কম দেয়। তার ওপর সাধারণ বিডিটি সেভিংস অ্যাকাউন্টে সুদ পাওয়া গেলেও ইআরকিউ অ্যাকাউন্টের ডলারে কোনো সুদ দেয় না ব্যাংক। ফলে ডলারে টাকা জমিয়ে রাখতে আগ্রহ পান না তরুণরা।

সাত. পেপ্যাল না থাকা ও এআইয়ের ধাক্কা: পূর্ণাঙ্গ পেপ্যাল সেবা না থাকায় এখনো পেমেন্ট পাওয়া নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ ক্যাটাগরির কাজগুলো (যেমন সাধারণ কনটেন্ট বা ডাটা এন্ট্রি) এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই করে ফেলছে। ফলে দ্রুত সময়ের মধ্যে অ্যাডভান্সড লেভেলের স্কিল অর্জন করতে না পারলে কাজ হারানোর তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। এর ওপর নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট না থাকা আর ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড বা লোন পেতে ঝামেলা তো আছেই।

'সবার আগে বাংলাদেশ' বাস্তবায়নে যা করা জরুরি। 

কোনো সরকারি অবকাঠামোগত বাজেট ছাড়াই নিজ যোগ্যতায় ঘরে বসে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন ফ্রিল্যান্সাররা। তৃণমূলের বেকারত্ব দূর আর মফস্বলের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে তাদের অবদান অনন্য। তবে কোনো নির্দিষ্ট শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তাদের মাঠপর্যায়ের কষ্টগুলো আড়ালেই থেকে যায়। 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতির সুফল নিশ্চিত করতে এবং তাদের পথের বাধা সরাতে এখনই কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার:

প্রথমত, সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে (PPP) জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এআই, ডাটা আর্কিটেকচার, সাইবার সিকিউরিটি ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের ওপর মানসম্মত বুট ক্যাম্প চালু করতে হবে। একই সাথে সব ফ্রিল্যান্সারকে সরকারি স্বীকৃতি হিসেবে স্মার্ট ডিজিটাল আইডি দিতে হবে, যা দিয়ে তারা সহজেই ব্যাংকিং লোন, ট্রেড লাইসেন্স ও ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা (Tax Exemption) পাবেন।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং ভোগান্তি কমাতে প্রতিটি ব্যাংকের জেলা বা উপজেলা শাখায় অন্তত একজন প্রশিক্ষিত অফিসার এবং আলাদা ‘ফ্রিল্যান্সার সাপোর্ট ডেস্ক’ রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সার্কুলার অনুযায়ী যেন অহেতুক সি-ফর্ম চাওয়া না হয় বা অন্যায়ভাবে কর না কাটা হয়, তা হেড অফিস থেকে মনিটর করতে হবে। পাশাপাশি এআই ও ক্লাউড ব্যবহারের জন্য ক্রেডিট ও ফ্রিল্যান্সার কার্ডের ডলার খরচের কোটা বা লিমিট বাড়ানো দরকার।

তৃতীয়ত, নীতিগত নানা জটিলতা দূর করতে ডিসিআরএএফ (DCRAF - Digital Commerce Research and Advocacy Forum)-এর মতো গবেষণা ফোরাম এবং বেসিস (BASIS), বাক্কো (BACCO) ও ই-ক্যাব (e-CAB)-এর মতো ট্রেড বডিগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ব্যাংকের হয়রানি বন্ধে এবং দ্বৈত কর জটিলতা নিরসনে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে সেতুবন্ধন হিসেবে এই প্ল্যাটফর্মগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

চতুর্থত, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের রেট বাজারের কাছাকাছি ও বাস্তবসম্মত করতে হবে। ইআরকিউ অ্যাকাউন্টের ডলারে সুদের ব্যবস্থা করা এবং তা টাকায় ভাঙানোর সময় ফেয়ার রেট দেওয়া উচিত। এছাড়া আন্তর্জাতিক ওয়ালেট থেকে আসা টাকায় সরকারের ২.৫% প্রণোদনা যেন অটোমেটিক অ্যাকাউন্টে জমা হয় সেই ব্যবস্থা করা এবং দেশে সরাসরি পেপ্যাল (PayPal) আনার দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

আমাদের লাখ লাখ তরুণ আজ নিজেদের মেধা দিয়ে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করছেন। শুধুমাত্র আদেশ বা প্রজ্ঞাপন জারি করেই কাজ শেষ ভাবলে চলবে না; ব্যাংকিং টেবিলের লালফিতার দৌরাত্ম্য দূর করা এবং এআই যুগের সাথে আমাদের তরুণদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি সফল করতে হলে দেশের এই মুক্ত পেশাজীবীদের সামনের সব বাধা অবিলম্বে দূর করতেই হবে।


লেখক: ই-কমার্স বিশ্লেষক ও প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, ই-ক্যাব 


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।