ডিজিটাল আইল্যান্ড নয়, চাই ডিপিআই: বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের আসল সমাধান

বিনিয়োগের জটিল পাজল ও ডিপিআই: বাংলাদেশে টেকসই বিনিয়োগের পথরেখা

বিনিয়োগের জটিল পাজল ও ডিপিআই: বাংলাদেশে টেকসই বিনিয়োগের পথরেখা
১ আগষ্ট, ২০২৬ ০০:১০  

বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) কিংবা অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ—কোনোটিই আশানুরূপ বাড়ছে না। বিডা (BIDA) বা সার্বিক উন্নয়ন কাঠামোর আওতায় এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে জটিল মনে হলেও এর গোড়ার সমস্যাগুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

বাংলাদেশের মতো আকর্ষণহীন বিনিয়োগ গন্তব্যে মূলধন আনাটা মূলত একটি জটিল রিয়েল-লাইফ পাজল (Real-life puzzle) মেলাবার মতো। এই পাজল সঠিকভাবে সমাধান না করে কেবল লাক্সারি অফিস তৈরি, একের পর এক আলোঝলমলে ইনভেস্টমেন্ট সামিট আয়োজন কিংবা চীন-জাপানে নতুন দফতর খুলে অর্থ গচ্চা দিলে কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না। এতে হয়তো সামান্য কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখা যাবে, তবে প্রকৃত বা উল্লেখযোগ্য 'ডেল্টা চেঞ্জ' (Delta change) আসবে না।

বিনিয়োগ পাজলের প্রধান বাধাটি শুরু হয় খাতভেদে ১২ থেকে ১৮টি বিভিন্ন পারমিশন বা ছাড়পত্র নেওয়ার দীর্ঘসূত্রতা থেকে। বিদেশি বা দেশি—কোনো বিনিয়োগকারীরই বছরের পর বছর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরে এসব ছাড়পত্র সংগ্রহ করার সময় বা ধৈর্য নেই। অথচ আমরা আজও তাদের একটি কার্যকর 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস' (One Stop Service - OSS) দিতে পারছি না। সিঙ্গেল সার্ভিস উইন্ডোর নামে আমরা কেবল সময় নষ্ট করছি। এখন পর্যন্ত যে টুকটাক কাজ হয়েছে, সেগুলো মূলত একেকটি আইসোলেটেড ‘সাইলো’ (Silo) বা ডিজিটাল আইল্যান্ড (Digital Island)—যা আদতে একটি আই-ওয়াশ মাত্র।

এক্ষেত্রে যেসব পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে—যেমন পিডব্লিউসি (PwC), বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ (BCG) কিংবা স্থানীয় কনসালট্যান্টরা—তারা অধিকাংশই পুরোনো আমলের আমলাতান্ত্রিক ধাঁচে অকার্যকর রূপরেখা বিক্রি করে আসছে। গত এক দশক ধরে তারা একই খসড়া বিক্রি করেছে, পুরোনো ডিভাইসের বাণিজ্য করেছে। ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের (Digital Transformation) প্রকৃত রূপ রূপায়ন ও কৌশল সম্পর্কে তাদের নিজেদেরই ধারণা সীমিত। এটি কোনো ধারণানির্ভর কথা নয়, বরং দীর্ঘদিনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া বাস্তব উপলব্ধি।

বাংলাদেশের আজ প্রয়োজন ‘এন্ড-টু-এন্ড ন্যাশনাল ইন্টারঅপারেবিলিটি’ (End-to-End National Interoperability)। নতুন কোনো ডিজিটাল আইল্যান্ড বা বিচ্ছিন্ন সাইলো নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা যা দেশের সব ডেটাবেজের মধ্যে একটি সুরক্ষিত কানেক্টিভিটি হাইওয়ে (Connectivity Highway) তৈরি করবে। এই জাতীয় হাইওয়ে তৈরি থাকলে তার ওপর ভিত্তি করে যখন-তখন নতুন ও উদ্ভাবনী সার্ভিস লেয়ার (Service layer) কিংবা অ্যাপ্লিকেশন যুক্ত করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, আমাদের দ্রুত 'ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার' (DPI) গড়ে তুলতে হবে।

কিন্তু আমরা যদি ডিপিআই-কে কেন্দ্রীয় জাতীয় এজেন্ডা না বানাই, তবে ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নিজেদের মতো করে পৃথক পৃথক আইসিটি প্রজেক্ট করতে থাকবে। এতে আরও কিছু নতুন সাইলো বা ডিজিটাল দ্বীপ তৈরি হবে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত ডিপিআই বা টেকসই সমাধান কখনোই আসবে না।

বিশ্বব্যাংকের ২৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নে পরিচালিত 'সিটা' (CITA) প্রকল্পটি যখন একনেকে (ECNEC) ওঠার কথা, তখন আমি জোর দিয়ে বলেছিলাম—এই পুরো তহবিলকে 'ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার' (DPI) এজেন্ডায় ডাইভার্ট করতে হবে এবং এর আওতায় সেক্টরাল ইন্টার-অপারেবিলিটি হাব ও এক্সচেঞ্জ গড়ে তুলতে হবে। বিষয়টি রিভিউ করার জন্য ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ স্যার দায়িত্ব দেওয়ার পর আমি এনবিআর (NBR), বিবিএস (BBS), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (CAG), পাবলিক প্রকিউরমেন্ট কর্তৃপক্ষ এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাথে যৌথ বৈঠক করি। দেশি-বিদেশি ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে টিএপিপি (TAPP) ও ডিপিপি-র (DPP) ওপর একটি বিস্তারিত ৩৪ পৃষ্ঠার রিভিউ ফিডব্যাক জমা দিই। পরবর্তীতে আইসিটি বিভাগের 'ডি-স্টার' (D-STAR) প্রজেক্টটিকেও আমরা আমূল রূপান্তর করে ডিপিআই এজেন্ডার আওতায় এনেছি এবং এর ডিপিপিতে আর্কিটেকচার ও হাই-লেভেল স্পেসিফিকেশন তৈরি করে দিয়েছি।

এখন নির্বাচিত কিংবা দায়বদ্ধ সরকারকে এই দুটি কাজ ঠিকঠাক বাস্তবায়ন করতে হবে। ডিপিপি-কে সঠিক টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনে রূপান্তর করে টেন্ডারিংয়ে যেতে হবে এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। ১১ মাসের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে সাধ্যের সবটুকু দিয়ে আমি যে ভিত্তিমূল তৈরি করেছি, তার চেয়ে বেশি হয়তো ওই সময়ে সম্ভব ছিল না। তবে এই দুটি প্রকল্প ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ডিপিআই-এর মূল ফাউন্ডেশন দাঁড়িয়ে যাবে—একটি 'অল-টু-অল' (All-to-All) বা 'অল-এপিআই' (All-API) কানেক্টিভিটি তৈরি হবে। গড়ে উঠবে সেন্ট্রাল সিকিউর এক্সচেঞ্জ ও বিভিন্ন সেক্টরাল এক্সচেঞ্জ।

তখন আর কোনো বিনিয়োগকারীকে আবেদন করার জন্য ১২টি দফতর ঘুরে ১৮টি সার্টিফিকেট ম্যানুয়ালি আপলোড করতে হবে না। রুট-কি ভেরিফাইড ই-সিগনেচার (Root-key verified e-signature) ও রিয়েল-টাইম অথেন্টিকেশনের মাধ্যমে সবকিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিস্টেম যাচাই করে নেবে। ডেটার ক্রস-ডোমেইন চেক, জাল ডকুমেন্ট শনাক্তকরণ, ফোর্জারি প্রতিরোধ, রাজস্ব ফাঁকি রোধ কিংবা তথ্য যাচাইয়ের জন্য আমরা এখানে ব্লকচেইন (Blockchain), সিস্টেমাটিক প্রোপাগেশন, ফেডারেটেড সিস্টেম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রয়োগ করতে পারব। এ ধরনের সমন্বিত নেটওয়ার্ক থাকলে প্রপার ক্রেডিট রেটিং (Credit rating) বাস্তবায়ন করা সহজ হবে—যা বর্তমানে আমাদের খেলাপি ঋণের পর্বতসম সমস্যা দূরীকরণে মূল ভূমিকা রাখবে।

অবশ্য ডেটা সিকিউরিটি বা তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সে কারণেই আমরা সময়োপযোগী 'পার্সোনাল ডেটা প্রটেকশন আইন' তৈরি করেছি এবং এর তদারকির জন্য 'ন্যাশনাল ডেটা গভর্নেন্স অথরিটি' গঠনের বিধান এনেছি। এই ডেটা অথরিটি একই সাথে সিকিউরিটি এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে, আইন এনফোর্স করবে এবং ডেটা ব্রোকার হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

অথচ এই আর্কিটেকচারকে সর্বজনীন ও সবার জন্য এডাপ্টিভ (Adaptive) না করে, সবাই এখনো বিচ্ছিন্ন প্রজেক্ট নেওয়ার দিকে ঝুঁকছে! ফলে দিনশেষে ডিজিটাল বিন (Business Identification Number - BIN) কিংবা ইলেকট্রনিক ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করলেও সেখানে ১২ থেকে ১৮টির বেশি কোলেটেরাল লেগে যায়। বিডা সম্প্রতি ৬৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস' ও 'BanglaBiz' প্রজেক্টের কথা বলছে। একইভাবে ই-জুডিশিয়ারি, ই-রেজিস্ট্রেশন, ই-ল্যান্ড সার্ভিস, ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা ই-ট্রেডমার্কের জন্য ডিপিআই এজেন্ডাকে পাশ কাটিয়ে সবাই ৩০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার পৃথক পৃথক বিচ্ছিন্ন প্রজেক্ট করছে। সবাই কেবল নতুন বায়োমেট্রিক ও আইরিশ (Iris) স্ক্যানার ডিভাইস কেনাতেই ব্যস্ত!

এভাবে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের মুখরোচক নামে জাতীয় রিজার্ভের মূল্যবান ডলারের শ্রাদ্ধ ছাড়া আর কিছুই হবে না। অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী মিটিংগুলোতে এসব নিয়ে কড়া কথা বলার কারণে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে আমি শত্রু তৈরি করেছি; অনেকেই ভেবেছেন আমি তাদের কোটি টাকার প্রজেক্টের ভাগাড়ে বাগড়া দিচ্ছি!

বাস্তবতা হলো—বিডা, এনবিআর, বিবিএস, পরিকল্পনা কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও আইসিটি বিভাগ—সবাইকে একটি অভিন্ন ডিপিআই ইকোসিস্টেমে আসতে হবে। জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট ইত্যাদির জাতীয় ডেটাস্টোরগুলোকে ইন্টারফেসিং, ইন্টিগ্রেটিং ও ডেটা কন্সিস্টেন্সির মাধ্যমে ইন্টারপ্রেট করতে হবে। শত শত কোটি টাকা ঢেলে বিচ্ছিন্ন সাইলো বানালে দেশের ডিজিটাল সার্ভিস ইকোনমিও বাড়বে না, বিনিয়োগও আসবে না। কানেক্টিভিটি ইকোসিস্টেমের যে মূল 'হাইওয়ে', সেখানে পেমেন্ট ইকোসিস্টেম এসে যুক্ত হবে এবং তার ওপর ভর করেই আমরা নতুন নতুন সার্ভিস লেয়ার তৈরি করে ডিজিটাল ইকোনমিকে সমৃদ্ধ করতে পারব।

একজন দেশের নাগরিক হোক বা বিদেশি বিনিয়োগকারী—কাউকে সেবা দিতে গেলে বুঝতে হবে যে মূল কানেক্টিভিটি আর্কিটেকচারটি মূলত ডিপিআই-এর একটি ‘সাব-সেট’ (Sub-set)। ডেটা গভর্নেন্স আইনের আওতায় প্রস্তাবিত 'ন্যাশনাল ডেটা অথরিটি'র ডিপিআই আর্কিটেকচার এবং একটি 'ইউনিফায়েড ট্রেড লাইসেন্স'-এর আর্কিটেকচার মূলত একই কাঠামোর বড় ও ছোট রূপ। তবে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিজনেস প্রসেস ও ডেটা প্রসেসিংয়ের চাহিদা ভিন্ন বলে তাদের আলাদা ইআরপি (ERP) লাগবে—যার কিছু অংশ হবে কমন, কিছু অংশ ইউনিক। এগুলো মূলত সার্ভিস লেয়ারের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট।

যেসব সংস্থা বড় পরিসরে সেবা দেবে, তাদের ডিপিআই সাব-সেটটি বড় হবে; আর ছোট সেবাদাতারা ডিপিআই-এর ছোট কানেক্টিভিটি লেয়ার ব্যবহার করবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রবাসকল্যাণ, এনবিআর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো বিশেষায়িত সংস্থার নির্দিষ্ট 'ইউজ কেস' (Use case) ও স্পেসিফিক ডেটা ডিমান্ড অনুযায়ী সেক্টরাল সাব-সেট বা ভিন্ন ভিন্ন কানেক্টিভিটি প্রয়োজন হবে। তবে মূল নির্যাসটি হলো—আমাদের 'অল-টু-অল' কানেক্টিভিটি লাগবে, সব ভার্টিক্যাল (সেক্টরাল ডেটা স্টোর) এবং সব হরাইজন্টাল (এনআইডি, বিডিআরইএস ইত্যাদি) ডেটাস্টোরের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ থাকতে হবে। এটি না করে যেভাবে পৃথক আইসিটি প্রজেক্টের মহোৎসব চলছে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সরকারি অর্থ অপচয় হবে, কিন্তু কোনো টেকসই সমাধান আসবে না।

সিঙ্গাপুরের 'Singpass' বা ভারতের 'Aadhaar' কার্ডের মতো যখন আমরা একটি কেন্দ্রীয় ডিপিআই কানেক্টিভিটি হাইওয়ে গড়ে তুলতে পারব, তখন একদিকে নাগরিক পাবে 'সিটিজেন ওয়ান আইডি' (Citizen One ID), অন্যদিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পাবে 'ডিজিটাল বিন' (Digital BIN)। সেইসাথে বিনিয়োগকারীদের ডজনখানেক পারমিটের জটিলতা এক ছাদের নিচে নিমিষেই দূর হবে। এর আগে যা-ই করা হোক না কেন—তা কেবল সাময়িক শো-কেসিং বা প্রচারণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আসল কাজের কাজ কিছুই হবে না। পরবর্তীতে যে ম্যানেজমেন্টই আসুক না কেন, তারা অন্ধকারে হাবুডুবু খাবে।

বিনিয়োগ পাজলের দ্বিতীয় অধ্যায়ে যেসব বিষয় আসে:

  • গুণগত মানের জমি: মাল্টি-মোডাল ট্রান্সপোর্টেশনের (Multi-modal transportation) সুবিধাযুক্ত জমি।
  • বিচ্ছিন্নতাহীন সেবা: লোডশেডিংমুক্ত, ভোল্টেজ-স্ট্যাবল বিদ্যুৎ এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ।
  • ডিজিটাল কানেক্টিভিটি: হাই-স্পিড ও লো-ল্যাটেন্সির কোয়ালিটি ইন্টারনেট সংযোগ।
  • নীতিমালার স্থায়িত্ব (Policy Stability): শুল্ক ও কর কাঠামোর সুনির্দিষ্ট স্থায়িত্ব। বিনিয়োগকারীকে যেন আগামী ৫ বছরের ডিউটি স্ট্রাকচার সম্পর্কে আগাম ধারণা দেওয়া যায়, যাতে তারা হঠাৎ নীতি পরিবর্তনের ধাক্কা না খায়।
  • উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা: মানসম্পন্ন এক্সপ্রেসওয়ে, উন্নত রেল সংযোগ ও সুরক্ষিত নৌ-রুট।
  • আর্থিক কাঠামোর শৃঙ্খলা: গতিশীল শেয়ারবাজার এবং স্বচ্ছ ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থা।

এর পরবর্তী ধাপে প্রয়োজন সুপার-ফাস্ট কাস্টমার রেসপন্স, পেশাদারিত্ব এবং শূন্য চাদাবাজি। সেই সঙ্গে করপোরেট ট্যাক্স সামঞ্জস্য করা, বিদেশে লভ্যাংশ নিয়ে যাওয়ার সহজ পথ তৈরি করা এবং 'Tax Holidays'-এর মতো চিরাচরিত সুবিধার বদলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী 'Cost-based Incentives'-এর দিকে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে বিনিয়োগ পাইপলাইনের চাহিদানুযায়ী 'হাই-স্কিলড ওয়ার্কফোর্স' বা দক্ষ জনশক্তি তৈরির তাগিদ তো রয়েইছে।

আমি যে 'বিনিয়োগ পাজল'-এর কথা বলছিলাম—এই পুরো পাজলটি শেষ পর্যন্ত সমাধান না করে আপনি যদি কোনো দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে আনেন, ব্যাংক ঋণ দেন, তবে দেখা যাবে কারখানার কাজ অর্ধেক হওয়ার পর তিনি গ্যাস বা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না! কিংবা পোর্টে কাঁচামাল আটকে আছে কারণ মাঝপথে সরকার শুল্কহার বদলে দিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারী কাঁচামালের অর্ডার দিয়ে, শিপমেন্ট করে সামান্য একটা ফাইলের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন (হাই-টেক পার্ক প্রজেক্টের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি)।

এভাবে কোনো দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে আস্থা পাবে না। সকল অংশীদারদের (Stakeholders) এক টেবিলে বসে উপাত্তনির্ভর (Data-driven) অগ্রাধিকার তালিকা বা 'Priority Order' তৈরি করতে হবে। আর এই ডেটা-ড্রিভেন সিদ্ধান্তের জন্য ডিপিআই নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

যে বিনিয়োগকারীর জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই পুরো পাজলটি সমাধান করা সম্ভব হবে—কেবল তাকেই জমি, লোন, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং শুল্ক কাঠামোর নিশ্চয়তা দিন। মাঝপথে কাউকে ঝুলিয়ে রেখে হয়রানি করবেন না।

আর এই পুরো পাজল সমাধান না করে এবং শক্ত ডিপিআই ভিত্তি না গড়ে বিদেশে দফতর খুলে কোনো লাভ নেই। এতে বরং কিছু বিদেশি ফাস্ট-ট্র্যাকে এসে এদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আসল রূপ দেখে বাকি বিনিয়োগকারীদেরও ভাগিয়ে দেবে, যার ফলে পুরো ইনভেস্টমেন্ট পাইপলাইনটাই স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
//ডিবিটেক/এসআই/এমআইএস//

দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।