টিকার কার্যকারিতা কমায়নি বর্তমান হামের ভাইরাসের নতুন মিউটেশন

হাম ভাইরাসে জিনগত পরিবর্তন ঘটেনি: আইসিডিডিআর’বি

  • গবেষণায় টিকার সুরক্ষা এড়ানোর জিনগত প্রমাণ মেলেনি
  • ছড়ানো ভাইরাসটি বৈশ্বিক বি৩ জিনোটাইপের অন্তর্ভুক্ত
  • শিশুদের সুরক্ষায় সব টিকার ডোজ পূর্ণ করার আহ্বান

হাম ভাইরাসে জিনগত পরিবর্তন ঘটেনি: আইসিডিডিআর’বি
২ আগষ্ট, ২০২৬ ১৯:৪৭  

২ আগস্ট, রবিবার: দেশে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে ভাইরাসের কোনো জিনগত পরিবর্তন ঘটেছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি)। প্রতিষ্ঠানটির অনুসন্ধানের প্রাথমিক ফলাফলে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া হাম ভাইরাসে এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যেতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত ১৫ হাজার ২৭২ জন হাম রোগীর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামজনিত সন্দেহে ৭২১টি এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত ৯৫টি মৃত্যু রেকর্ড করা হয়।

এই প্রাদুর্ভাবের মধ্যে আইসিডিডিআর’বি এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ জন শিশুকে নিয়ে একটি অনুসন্ধান চালান। পরীক্ষাগারে ৩২৪ জন শিশুর হাম নিশ্চিত হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ছিল তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরা। এই বয়সী ১৪১ জন শিশুর মধ্যে ১৩৭ জনের শরীরেই হাম শনাক্ত হয়।

গবেষণায় বয়স ও টিকা নেওয়ার বিচারে ৩৪১ জন শিশুকে চারটি দলে ভাগ করা হয়:

  • ৯ মাসের কম বয়সী (টিকার বয়স হয়নি): ১৪৬ জন শিশুর মধ্যে ১৪২ জন (৯৭.৩%) পজিটিভ।
  • টিকার বয়স হলেও ১ ডোজও না পাওয়া: ১২৬ জন শিশুর মধ্যে ১২২ জন (৯৭%) পজিটিভ।
  • ১ ডোজ পাওয়া: ৪৮ জন শিশুর মধ্যে ৪৪ জন (৯২%) পজিটিভ।
  • সুপারিশকৃত ২ ডোজ পাওয়া: ২১ জন শিশুর মধ্যে ১৬ জন (৭৬%) পজিটিভ।

গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, টিকার সুরক্ষা না থাকা শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার ৯৭ শতাংশ থেকে কমে দুই ডোজ পাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে ৭৬ শতাংশ হওয়া প্রমাণ করে টিকা এখনও সুরক্ষা দিচ্ছে। তবে এটি হাসপাতালভিত্তিক অনুসন্ধান হওয়ায় জনসংখ্যা পর্যায়ে টিকার সামগ্রিক কার্যকারিতা নির্ধারণে আরও বড় গবেষণার প্রয়োজন।

জিনগত বিশ্লেষণে জানা যায়, বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি বি৩ জিনোটাইপের (সাবক্লেড বি৩) অন্তর্ভুক্ত, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রাদুর্ভাবেও পাওয়া গেছে। আইসিডিডিআর’বি এবং আইইডিসিআর যৌথভাবে ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ভাইরাসের এইচ (H) প্রোটিনে ৪টি মিউটেশন শনাক্ত করেছে। তবে ভাইরাসটি এখনো একক সেরোটাইপ হওয়ায় প্রচলিত টিকা কার্যকর রয়েছে।

গবেষণার বিষয়ে আইসিডিডিআর’বির সংক্রামক রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, “এই প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতা দেখে টিকা এখনো কার্যকর কি না, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের অনুসন্ধানে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার কম ছিল। তবে হাসপাতালভিত্তিক এই অনুসন্ধান দিয়ে জনসংখ্যা পর্যায়ে টিকার কার্যকারিতার হার নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।” ২ ডোজ পাওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়ার পেছনে অ্যান্টিবডি কমে যাওয়া, অপুষ্টি বা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত কারণ থাকতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আইসিডিডিআর’বির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “হাম প্রতিরোধ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একইসঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার তুলনামূলকভাবে বেশি বলে জানানো হলেও এই প্রাদুর্ভাব এত বড় হলো কেন, সেটিও আমাদের বুঝতে হবে।”

প্রতিষ্ঠানটির ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ড. কামরুন নাহার বলেন, “শিশুরা কেন টিকা নিতে পারছে না এবং জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের যে হার জানানো হচ্ছে, তার আড়ালে কোনো কোনো এলাকায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়েছে কি না, তা আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। এসব গবেষণার তথ্য বাংলাদেশকে টিকাদান কৌশল আরও কার্যকর করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাবে শিশুদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করবে।”

আইসিডিডিআর’বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, “এই প্রাথমিক ফলাফল কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে যে, আমাদের আরও অনেক কিছু জানা প্রয়োজন। টিকা নেওয়া কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হয়েছে, গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর পেছনে কোন বিষয়গুলো কাজ করছে, অপুষ্টি সুরক্ষাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং শিশুরা কখন মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি হারায়, তা অনুসন্ধানে আইসিডিডিআর’বি আরও বিস্তৃত গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে।”

বর্তমানে আইসিডিডিআর’বি ৪টি বিভাগীয় হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল কোহর্ট গবেষণা, জিনোমিক নজরদারি, জিংক ব্যবহারের পাইলট গবেষণা এবং ক্যমিউনিটিভিত্তিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। গবেষকরা অভিভাবকদের কোনো বিলম্ব না করে শিশুদের হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার সব ডোজ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
//ডিবিটেক/ আইসিডিডিআর’বি/এসএমই//