ভবিষ্যতের মেডিসিন- ফাস্টিং ও ফ্যাট

ভবিষ্যতের মেডিসিন- ফাস্টিং ও ফ্যাট
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১২:৫০  
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ২০:৫৩  

আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফাস্টিং এবং ফ্যাট নিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রচুর তহবিল আসছে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের সেন্টার অব ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিনের কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ড. মজিবুল হক বলেছেন, এখন এই ফাস্টিং এবং ফ্যাটকে ভবিষ্যতের মেডিসিন বলা হচ্ছে। তিনি জানান, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলেও এর মধ্যে মাঝখানে লেবুর পানি, ইসবগুলের ভূষি ও সবজু চা খেলে ফাস্টিং ভাঙে না। 

মানুষের মাঝে বিদ্যমান চর্বি ভীতিকে (ফ্যাট ফোবিয়া) উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, চর্বি স্বাস্থ্যের জন্য সব সময় কিন্তু ক্ষতিকর নয়। শরীরে ৭০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক আসে খামারে বেড়ে ওঠা প্রাণীর গোস্ত থেকে। এভাবে নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে গিয়ে মানুষের জন্য উপকারী গাট ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে শরীরে টক্সিসিটি (বিষক্রিয়া) বেড়ে যাচ্ছে। শরীরকে প্রাকৃতিক উপায়ে টক্সিসিটিমুক্ত করতে পারলেই নিরোগ থাকা সম্ভব। 

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরাল ও পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রিপ্রাপ্ত অধ্যাপকের মতে, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা বা ফাস্টিংকে হালকাভাবে দেো ঠিক নয়। এর পেছনে রয়েছে বিস্ময়কর বিজ্ঞান। আমরা বলে থাকি ‘আমি বা ওমুক সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করে না বা করি না’ বলে স্বাস্থ্য ভালো না, অসুস্থ হয়ে গিয়েছি। কিন্তু এই ধারণা ভুল, টাইমলি না খাওয়াতেই কল্যাণ, এটাই ওষুধ। আপনি যখন খাচ্ছেন না, তখন আপনার শরীরের অন্য কিছু খাচ্ছে, আপনার শরীরে থাকা টক্সিসিটি পরিষ্কার হয়ে যায় তখন। 

রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের (এডব্লিউসি) উদ্যোগে ৩১ আগস্ট, রবিবার সন্ধ্যায় নিজের স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বই ‘সুস্থতার মূলমন্ত্র’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। 

জীবন যাপন পদ্ধতির পরিবর্তনের মাধ্যমে সুস্থ থাকার বিষয়ে বইয়ে সন্বিবেশিত বিষয়বস্তুর নানা দিক তুলে ধরেন ড. মজিবুল হক। বলেন, সুস্থ থাকতে জীবন যাপন পদ্ধতির পরিবর্তন ও ব্যস্ততার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে পারলে ওষুধ ছাড়াই সস্থ থাকা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রকৃতি থেকে দূরে সরে গেছি। ঢাকা শহরে কোনো পার্ক নেই, মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে?’

সুস্থ থাকতে নিয়মিত শরীর চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সুস্থ থাকতে যেটুকু খেলার জায়গা আছে, সেটুকু কাজে লাগাতে হবে। সকাল-বিকাল একটু পানির কাছে, বাগানে ও পার্কে যাওয়া উচিত। সবাই যাওয়া শুরু করলে রমনা আর চন্দ্রিমায় জায়গা হবে না, তখনই আরও জায়গা তৈরি হয়ে যাবে।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন অধ্যাপক ড. মজিবুল হক বলেন, যদি শর্করা (কার্বো-হাইড্রেড) বাদ এবং সঙ্গে ফ্যাটিফুড যুক্ত করা হয়, তাহলে এটা হবে আপনার জন্য ওষুধ। আলোচনায় চাল ও চিনিসহ সকল সাদা খাবার পরিহারের পরামর্শ দেন তিনি। 

তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে আরো বলেন, আধুনিক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় আমাদের ডায়েটে পরিবর্তন এসে গেছে, ইলেকট্রনিক ডিভাইস বেশি বেশি ব্যবহারের কারণে আমরা রেডিয়েশনের শিকার হচ্ছি। এ কারণে মানসিক চাপে (মেন্টাল স্ট্রেস) ভুগছি, ঘুম হচ্ছে না। আর এর ফল স্বরূপ আমরা নানা ধরনের রোগে ভুগছি। সাদা চিনি, সাদা আটা, বেশি ক্যালরি গ্রহণ এবং ননস্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ (এনএসএআইডি) আমাদের শারীরিক ক্ষতি ডেকে আনছে। তাছাড়া পোল্ট্রিজাত প্রাণী, দুধ ও ডিম খাওয়ার কারণে আমাদের শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। 

অধ্যাপক মজিবুল হক বলেন, পোল্ট্রি খাবারে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশে কোনো গবেষণা না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দুই কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়ে থাকে লাইভস্টক ফার্মে।  

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রক্রিয়াজাত খাবার (প্রসেসফুড) এবং কেমিকেল ইন্টারভেনশনের কারণে নানা রোগ হচ্ছে আমাদের। তিনি উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন, লাল গোসত (রেডমিট) থেকে প্রাপ্ত চর্বি স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। লাল গোসতের মধ্যে ১১ ধরনের উপকারি অ্যামিনু এসিড এবং অনেক ধরনের খনিজ পদার্থ রয়েছে। এটা খাওয়া উপকারী কিন্তু বেশি খাওয়া অবশ্যই ক্ষতিকর। 

ড. মজিবুল হক বলেন, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফাস্টিং এবং ফ্যাট নিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রচুর তহবিল আসছে। কারণ এই ফাস্টিং এবং ফ্যাটকে ভবিষ্যতের মেডিসিন বলা হচ্ছে। তিনি জানান, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলেও এর মধ্যে মাঝখানে লেবুর পানি, ইসবগুলের ভূষি ও সবজু চা খেলে ফাস্টিং ভাঙে না। 

এই  বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, আমরা যদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে বিনিয়োগ করি, তা শুধু আজকের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। মানুষ যদি সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করায়, সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করে এবং জীবনযাপনে সতর্ক থাকে, তবে ব্যয়বহুল চিকিৎসা সেবার প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমে যাবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। যদি জনগণ নিজেদের স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হয় এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার দিকে মনোনিবেশ করে, তবে শুধু স্বাস্থ্য খাতে নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিতেও তা একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এডব্লিউসির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. মজিবুল হক সেমিনারে তার ১১ বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। 

স্বাস্থ্য সচিব অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা খাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাপনার সংযোজনকে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন। 

মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিলে যেসব রোগের চিকিৎসা গ্রহণে মানুষ ব্যয় করে, সেগুলোর পূর্বাভাস করা সম্ভব হবে। যার ফলে শুধু চিকিৎসার খরচ কমবে না, মানুষের কর্মক্ষমতা ও স্বাস্থ্যও উন্নত হবে।

এডব্লিউসির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হকের সভাপতিত্বে আয়োজিত সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিভিন্ন বিশিষ্ট পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী ব্যক্তিরা। সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য সেন্টার অব ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিনের কনসালটেন্ট অধ্যাপক ড. মজিবুল হক মূল আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি নিয়ে দর্শকদের প্রশ্নের উত্তর দেন।

এছাড়াও সেমিনারে আমেরিকান ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) দিক থেকে খাদ্য ও চিকিৎসার সংমিশ্রণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সেখানে বলা হয়, আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, তাতে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ আমাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সৃষ্টি করতে পারে।