দেশে পারমাণবিক লোডিং শুরু
দীর্ঘ ৬৫ বছরের স্বপ্নপূরণ হলো বাংলাদেশের। পারমানবিক শক্তি ব্যবহারকারীর আন্তর্জাতিক দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হিসেবে পদ্মার তীর ঘেষা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু করলো রেসাটম।
২৭ এপ্রিল বিকের ৩টা ৩৩ মিনিটে বিশেষ সুইচে স্পর্শ করে
পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এসময় প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন,ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গ্রিগোরিয়েভিচ খোজিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, নানা ধাপ পেরিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারে রূপপুরের প্রথম ইউনিট ।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ২০২৭ সালের ২৮ এপ্রিল দ্বিতীয় চুল্লিতে জ্বালানি লোডিংয়ের প্রত্যাশা জানিয়ে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। কারণ নিরাপত্তাই বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার। এই পারমাণবিক কেন্দ্র ঢাকা ও মস্কোর মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেবে।
চুল্লিতে পরমাণু রড আপলোডে জ্ঞান ভিত্তিক প্রযুক্তি নির্ভর আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাওয়া উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ । প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেল। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
স্বাগত বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক মান ও নিরাপত্তা বজায় রেখে এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রযুক্তির নতুন দুয়ারে প্রবেশ করলো। রূপপুর থেকে এই রূপান্তর ভবিষ্যত প্রজন্মকে এগিয়ে নেবে। তিনি জানান, এক বছরে পাচটি ধাপ অতিক্রমের মাধ্যমে আজ প্রথম চুল্লিতে ইউরোনিয়াম লোডিং করা সম্ভব হলো।
রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশকে যেভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেভাবে পাশে থাকবে। বাংলাদেশের মানুষকে আশ্বস্থ করতে চাই নিরাপত্তা নিয়ে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বোচ্চ মানদন্ড বজায় রাখা হয়েছে। নিরাপদ পারমানবিক কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা হবে বিদ্যুৎ। এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সহযোগিতা থাকবে রোসাটমের।
অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। এরপর আসে আরও কয়েকটি চালান। বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে অক্টোবরে রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয় জ্বালানি। এরপর এটি মজুত করে রাখা হয়েছে রূপপুরে। অতিরিক্ত একটিসহ মোট ১৬৪টি বান্ডিল দেশে আনা হয়। রূপপুরে ব্যবহৃত প্রতিটি বান্ডিলে ৩১২টি জ্বালানি রড আছে ।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয়। প্রথমে ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট ট্যাবলেটের মতো জ্বালানি দানা (প্যালেট) বানানো হয়। এগুলোর ব্যাস সাধারণত ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার। এমন অনেক জ্বালানি দানা প্রায় চার মিটার দীর্ঘ ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে তৈরি হয় জ্বালানি রড। আবার নির্দিষ্ট কাঠামোতে অনেকগুলো রড একসঙ্গে যুক্ত করলে তৈরি হয় জ্বালানি বান্ডিল বা ফুয়েল অ্যাসেম্বলি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই জ্বালানি বান্ডিল চুল্লির কেন্দ্রে বসানো হবে। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি বান্ডিল ব্যবহার করা হবে। একবার জ্বালানি বসালে প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ব্যবহৃত জ্বালানিতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকে। তাই তা বিশেষ নিরাপত্তায় রাশিয়ায় নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নজরদারিতে প্রতিটি জ্বালানি বান্ডিলের হিসাব থাকবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবি। রি-অ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হলে ইউরিনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হবে।
এই তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রি-অ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলে।
রি-অ্যাক্টরের ডিজাইন অনুযায়ী, ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রি-অ্যাক্টর কোরে স্থাপন করতে হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৩০ দিন। এ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে সম্পন্ন করতে হয় এবং বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ। এ পর্যায়ে ডিজাইন অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিশন রি-অ্যাকশন ঘটানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে, যার জন্য প্রায় ৩৪ দিন সময় প্রয়োজন হবে। পরীক্ষা শেষে রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে ৩%, ৫%, ১০%, ২০%, ৩০% উন্নীত করা হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৪০ দিন। রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ৩ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তাবিষয়ক নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এই সময়ে এখান থেকে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।
নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ এই সময়ে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে।
আর্থিক বিবেচনায় বাংলাদেশের একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সব সহযোগিতা করছে রাশিয়া। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া, যেটা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মান করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
দাম
শুরুতে প্রতি ইউনিটের খরচ ৬ টাকা ধরা হলেও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে এখন দাম ১২ টাকা পড়বে।
পারমাণবিক শক্তি-শুনলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে ভয় কিংবা অজানা আশঙ্কা। পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন গোটা বিশ্বেই অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রক্রিয়া। এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণে পেরোতে হয় নিরাপত্তামূলক নানা ধাপ।
রূপপুরে ব্যবহৃত তৃতীয় প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে যেকোনো অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতেও স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কাজ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ এর নিরাপত্তা মানদ- কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট, ফুয়েল লোডিং কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, ফুয়েল লোডিং এর মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর বা চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপন করা হয় এবং ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, বরং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই এখন বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণযজ্ঞ শেষে এখন শুরু হচ্ছে এর কার্যকারিতার মূল ধাপ।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. প্রীতম কুমার দাসের মতে, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক মানদ- মেনে চলা ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়, বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রটোকলগুলো এতটাই নিচ্ছিদ্র যে, সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটলে পুরো প্রকল্প সেখানেই থমকে যেতে পারে। এতে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু করার প্রক্রিয়াই আটকে যাবে। রূপপুরের এই দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে ‘জিরো এরর বা শূন্য ত্রুটি নীতির ওপর।
রাশিয়ার ‘ফাস্ট নিউট্রন’প্রযুক্তির উদাহরণ দিয়ে রূপপুরের ব্যবহৃত জ্বালানি বা বর্জ্যকেও পুনরায় ব্যবহারের সম্ভাবনা জানান ড. প্রীতম। তিনি মনে করেন, ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের উপজাত বা ওয়েস্ট থেকে ভবিষ্যতে আবারও জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হবে, যা ভারত ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো সফলভাবে পরীক্ষা করছে। সেটি সম্ভব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ আরো কমে আসবে।
শুরুর গল্প
দেশে পারমানবিক বিদ্যুতের প্রাথমিক ধারণা আসে ষাটের দশকে। ১৯৬২ সালে সম্ভাব্য বারোটি স্থান মূল্যায়নের পর পাবনার রূপপুরকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘সফরাটম’ কর্তৃক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হলেও তৎকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে আটকে যায় প্রকল্পটি। তবে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির ভিত্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ১৯৮১ সালে ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৮৬ সালে ঢাকার সাভারে ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার গবেষণা রিঅ্যাক্টর চালু করে।
১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য একটি আন্ত:রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি সই হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয়ত্ব পরমানু সংস্থা রসাটমের মধ্যে সই হয় আরেকটি চুক্তি। ওই চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ৩ বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে তুলনা
পারমাণবিক বিদ্যুতের বড় সুবিধা হলো এর জ্বালানি দক্ষতা বেশি। একটি ১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন কয়লা প্রয়োজন হয়। সেখানে সমপরিমান বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি বছর মাত্র ২৭ টন পারমানবিক জ্বালানী লাগে। একই সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়-রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুইটি ইউনিট থেকে বছরে যে পরিমান বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, তা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস হতে উৎপাদিত বিদ্যুতের সমপরিমান। শুধুমাত্র বড়পুকুরিয়া বাদে বাকি সবগুলো কয়লার ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি করতে হয়, যা ব্যয়বহুল। অন্যদিকে দেশে গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমও চলছে ধীরগতিতে। ভয়াবহ গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুতের পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন ব্যবহত হচ্ছে। অন্যান্য খাতেও রয়েছে গ্যাস স্বল্পতা। এমন পরিস্থিতিতে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক বাস্তবতায় এটি এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত। কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি হওয়ায় এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লা নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে ২০ মিলিয়ন টন এবং গ্যাস নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করবে।
ডিবিটেক/আইএইচ/ইকে







