কৃষক কার্ড পেয়ে ভাইরাল হওয়া কবির হোসেন সত্যিই কৃষক

কৃষক কার্ড পেয়ে ভাইরাল হওয়া কবির হোসেন সত্যিই কৃষক
১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ২০:৩১  

টাঙ্গাইল জেলার শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে ১৪ এপ্রিল এক অনুষ্ঠানে সদর উপজেলার প্রান্তিক কৃষক কবির হোসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে ‘কৃষক কার্ড’ গ্রহণ করেন এবং এ উপলক্ষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। কিন্তু ‘কৃষক কার্ড’ গ্রহণের পর থেকেই তাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জন্ম দেয়। কবির হোসেন প্রকৃতই ‘প্রান্তিক কৃষক’ কি না তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। এরইমধ্যে এআই জেনারেটেড কিছু ছবিও সনাক্ত হয়েছে।

এসব ছবিতে দেখা যায়, কবির হোসেন প্রাইভেটকারের ওপর বসে আছেন, সাঁতার কাটছেন সুইমিং পুলে কিংবা দেশের বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন। তবে এসব ছবি এআই দিয়ে তৈরি বলে ফ্যাক্টচেকে প্রমাণ মিলেছে। 

অপরদিকে ভাইরাল সেই কবির হোসেন প্রকৃতই ‘প্রান্তিক কৃষক’ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি। কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসক শরীফা হক জানিয়েছেন, “প্রাথমিকভাবে জেলা প্রশাসকের অধীনে করা তদন্ত কমিটি যাচাই করে জানতে পেরেছে, কবির হোসেন প্রকৃত অর্থেই কৃষক। বিষয়টি নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করেছে।”

কবির প্রকৃত কৃষক ‘না’ বলে অভিযোগ তোলা হলেও স্থানীয়রা বলছেন, নিজের জমি না থাকলেও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন কবির। তার সেচ পাম্পও রয়েছে। আর কৃষি বিভাগ বলছে, প্রকৃত কৃষকদের দেওয়া হয়েছে কার্ড। 

স্থানীয় সাংবাদিকরা আলোচিত কৃষক কবির হোসেন-কে নিজের সেচ পাম্প থেকে পানি দিয়ে বর্গা নেওয়া জমিতে পরম মমতায় কাজ করতেও দেখেছেন। । ১৬ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সরেজমিনে কখনও হাতে কাঁচি নিয়ে নিড়াচ্ছেন ঘাস, কখনও বা মনের সুখে গান গেয়ে ফসলের মাঠ মাতিয়ে রাখতে দেখা গেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেলো, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ঘারিন্দা ইউনিয়নের উত্তর তারুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা কবির হোসেন। তিনি কৃষিকাজের পাশাপাশি কৃষকদের জীবন ও বিচিত্রা নিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করে ফেসবুকে আপলোড করেন।

এদিকে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, সদর উপজেলার উত্তর তারটিয়া গ্রামের কবির হোসেন প্রান্তিক কৃষক কি না তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংশয় প্রকাশ করা হয়। এ অবস্থায় ‘প্রকৃত সত্য’ উদঘাটনে বুধবার পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

“তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্তপূর্বক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে, উক্ত প্রতিবেদনে ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড নীতিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী তিনি ‘প্রান্তিক কৃষক’ হিসেবে কৃষক কার্ড পাওয়ার যোগ্য মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে।”

সূত্রমতে, মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়েদুর রহমান মন্ডলের নেতৃত্বে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ১৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করে এক কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকও এ বিষয়ে সরেজমিন তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তিন ধাপে যাচাই-বাছাই করে যথাযথভাবে কৃষক নির্ধারণ করা হয়েছে- উভয় কমিটির তদন্তে এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দু’টিতে টাঙ্গাইল জেলার সদর উপজেলার ঘারিন্দা ইউনিয়নের সুরুজ কৃষি ব্লকের অন্তর্গত উত্তর তারূটিয়া গ্রামের বাসিন্দা কবির হোসেন (পিতাঃ মোঃ আবু সাইদ তালুকদার) একজন প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষী হিসেবে প্রমাণিত হয়। তার নিজস্ব জমির পরিমাণ ১৩ শতাংশ এবং চলতি বছর তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ১৬০ শতক জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেছেন।

আর স্থানীয় কৃষক হাকিম তালুকদার জানান, গ্রাম অঞ্চলের মধ্যে কবির হোসেনের পরিবার পুরাতন গেরস্ত। তার বাপ দাদার আমলে একসময় ভালো অবস্থান ছিল। এখন সেই সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা হওয়ায় জমির পরিমাণ কমে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, কবির হোসেনরা দুই ভাই ও দুই বোন। তাদের মধ্যে তিনিই সবার বড়। কবির হোসেনের বাবা কৃষকের কাজ করে ৪ জন সন্তানকে লালন পালন করেছেন। কৃষকের সন্তান কখনো কৃষক হবে না, এটা কীভাবে হয়। এছাড়া কবির হোসেনের তেমন পড়াশোনা নেই। তাহলে একজন অশিক্ষিত লোক যার কোন চাকরি করার ক্ষমতা নেই। সে কি করে সংসার চালাবে!

তারা আরও জানান, কবির হোসেনের সংসারে রয়েছে স্ত্রীসহ এক ছেলে এক মেয়ে। কৃষি কাজ করেই মেয়েটিকে বিয়ে দিয়েছে। ছেলেটিকে এসএসসি পাশ করিয়ে এক বছর যাবৎ দেশের বাহিরে পাঠিয়েছে।

আর আক্রান্ত কৃষক কবির হোসেন জানান, ‘এক সময় তার বাপ-দাদার জমি জমা থাকলেও বর্তমানে তাদের খুব একটা জমি নেই। তবে নিজের জমি না থাকলেও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে নিয়মিত চাষ করেন এবং একটি সেচ পাম্প রয়েছে তার। এছাড়া গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি লালন পালন করে পরিবার পরিজন নিয়ে নিজ বাড়িতে বসবাস করেন।’

ডিবিটেক/ইএফবি/এমইউআইএম