ডার্ক ওয়েবে ১৮ লাখের বেশি নাগরিকের তথ্য : ঝুঁকিতে ১৫ খাত

  • ৭৬৭টি ডোমেইন পর্যালোচনায় প্রায় সবগুলোর ক্রেডেনশিয়াল উন্মুক্ত পাওয়ার দাবি সাইবারস্টেশনের
  • অন্তত ১৭ হাজার ৩৬২ জনের লগইন তথ্য এবং ১৮ লাখের বেশি রেকর্ড ছড়িয়ে আছে
  • সরকারি সেবা খাতে উন্মুক্ত নাগরিক তথ্যের পরিমাণ বেশি; প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগে উন্মুক্ততার হার সর্বোচ্চ

ডার্ক ওয়েবে ১৮ লাখের বেশি নাগরিকের তথ্য : ঝুঁকিতে ১৫ খাত
১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৩৬  

ডার্ক ওয়েবে বাংলাদেশের ১৫টি খাতের ৭৬৭টি ডোমেইন পর্যালোচনা করে ১৮ লাখের বেশি ব্যবহারকারীর রেকর্ড এবং অন্তত ১৭ হাজার ৩৬২ জনের লগইন তথ্য ছড়িয়ে থাকার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সাইবারস্টেশন। প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারি সেবা খাতে উন্মুক্ত নাগরিক তথ্যের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে, প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে তথ্য উন্মুক্ত হওয়ার হার সর্বোচ্চ। এ পরিস্থিতি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সুরক্ষা এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

১৫ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে বাংলাদেশের ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে থাকা তথ্যের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। এতে ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, প্রযুক্তি, সরকার ও শিক্ষাঙ্গনের প্রায় ১৫০ জন জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা এবং সাইবার নিরাপত্তা পেশাজীবী অংশ নেন।

সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা মাস উপলক্ষে ‘বাংলাদেশ সাইবার রেজিলিয়েন্স ব্রিফিং ২০২৬’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে ব্রেইন স্টেশন ২৩ পিএলসির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ সাইবারস্টেশন।

সেমিনারে জানানো হয়, দেশের ১৫টি খাতের ৭৬৭টি ডোমেইন পর্যালোচনা করে প্রায় সবগুলোরই লগইন-সংক্রান্ত তথ্য বা ক্রেডেনশিয়াল ওয়েবে পাওয়া গেছে। অন্তত ১৭ হাজার ৩৬২ জন ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য এবং ১৮ লাখের বেশি ব্যবহারকারীর রেকর্ড ছড়িয়ে থাকার প্রমাণ মিলেছে। সাইবারস্টেশনের দাবি, এসব পরিসংখ্যান সর্বনিম্ন হিসাব; প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, উন্মুক্ত নাগরিক তথ্যের সবচেয়ে বড় অংশ সরকারি সেবা খাতের। তবে তথ্য উন্মুক্ত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে।

সাইবারস্টেশনের সাইবার নিরাপত্তা সেবাবিষয়ক প্রধান মোহিব্বুল মোক্তাদীর তানিম বলেন, “যে ঝুঁকি আমরা দেখতে পাই না, তা আমরা সামলাতে পারি না। আমাদের লক্ষ্য, প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বুঝতে পারে কোন তথ্য উন্মুক্ত হয়েছে এবং অপরাধীরা অপব্যবহার করার আগেই ব্যবস্থা নিতে পারে।”

ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর নির্বাহী পরিচালক এম জে ফেরদৌস বলেন, “২০ বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা তৈরি করেছি সাইবারস্টেশন, আমাদের নিজস্ব সাইবার সিকিউরিটি বিভাগ। আজকের অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল দেশের সাইবার নিরাপত্তায় আমরা কোথায় আছি এবং সামনে কী কী উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তা পর্যালোচনা করা। বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশের নিজস্ব সাইবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এখানে আমাদের কোনো অবদান যদি কাজে লাগে, আমরা আন্তরিকভাবে সবার পাশে থাকতে চাই।”

অনুষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, “সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সাইবারস্টেশন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। তাদের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ আমার হয়েছে। এটি সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর প্রতিরোধ ও মোকাবিলার কৌশল তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

প্রযুক্তিবিদ মুনির হাসান ডার্কওয়াচের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর তৈরি ডার্কওয়াচের মতো দেশীয় প্রযুক্তিগত উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে আমাদের সবার সম্মিলিতভাবে কাজ করা উচিত। এ ধরনের উদ্যোগকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তায় তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”

বাংলাদেশের ডার্ক ওয়েবে তথ্য উন্মুক্ত হওয়ার ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলার উপায় নিয়ে সেমিনারে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পরামর্শক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহরিয়ার রহমান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) স্পেশাল রেসপন্স ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক, বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম সচিব (আইসিটি) মো. ইমরান খান এবং টেক স্পেশালিস্ট মাহতাব উদ্দিন আহমেদ। আলোচনায় তথ্যের অপব্যবহার প্রতিরোধ এবং এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান হামিদা কাজী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আবুল কালাম আজাদ এবং একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ড. রাজেশ পালিত, গ্রামীণ ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাজ্জাদ হোসেন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্ক্ট ফ্যাকাল্টি ও গ্রামীণফোনের সাবেক সিআইও ড. মো. লুৎফর রহমান, মবিলের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) শাফকাত মাহমুদ ফাহমি এবং স্ট্রিম কানেক্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্নেল মো. সোহেল রানা, পিএসসি (অব.) প্রমুখ।

ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর ২০ বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সাইবারস্টেশন জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। সময়মতো ঝুঁকি শনাক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। 

//ডিবিটেক/ডিইএনএস/এসএমপি/এমভিএনও/ডিপিওই//