শরতেও জমজমাট শতবর্ষী ‘ঘিওর নৌকার হাট’
মানিকগঞ্জ: বর্ষা পেরিয়ে চলছে শরৎকাল। ভাদ্রের শেষে শরতেও মানিকগঞ্জের নদ-নদীতে বাড়ছে পানি। চর ও নিম্নাঞ্চলের পথঘাটে তাই আবারও প্রয়োজন হয়ে উঠেছে নৌকা। কৃষিপণ্য ও গবাদিপশুর খাবার পরিবহন, মাছ ধরা কিংবা হাটবাজারে যাতায়াত করতে অনেক এলাকার মানুষের কাছে এখনো কাঠের নৌকাই ভরসা। নদ-নদীতে পানি বাড়ায় শরতেও জমে উঠেছে ঘিওর শতবর্ষী নৌকার হাট। সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল […] The post শরতেও জমজমাট শতবর্ষী ‘ঘিওর নৌকার হাট’ first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

মানিকগঞ্জ: বর্ষা পেরিয়ে চলছে শরৎকাল। ভাদ্রের শেষে শরতেও মানিকগঞ্জের নদ-নদীতে বাড়ছে পানি। চর ও নিম্নাঞ্চলের পথঘাটে তাই আবারও প্রয়োজন হয়ে উঠেছে নৌকা। কৃষিপণ্য ও গবাদিপশুর খাবার পরিবহন, মাছ ধরা কিংবা হাটবাজারে যাতায়াত করতে অনেক এলাকার মানুষের কাছে এখনো কাঠের নৌকাই ভরসা। নদ-নদীতে পানি বাড়ায় শরতেও জমে উঠেছে ঘিওর শতবর্ষী নৌকার হাট।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল গড়াতেই একে একে মাঠে উঠতে থাকে নৌকা। কোনোটি আমগাছের কাঠে তৈরি, কোনোটি চাম্বুল কিংবা কড়ই কাঠের। আকারেও রয়েছে বৈচিত্র্য— ছোট, মাঝারি থেকে শুরু করে বড় নৌকা। ক্রেতারা একেকটি নৌকা ঘুরে দেখছেন, কাঠের গাঁথুনি হাত দিয়ে পরীক্ষা করছেন, মেপে নিচ্ছেন দৈর্ঘ্য। এরপর শুরু হচ্ছে দরদাম।
বুধবারের এই ব্যস্ততা কোনো নদীর ঘাটে নয়, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে। বর্ষা এলেই সপ্তাহের অন্য সময়ের চেনা মাঠটি হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী ঘিওরের নৌকার হাট। পানির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানে জমে ওঠে নৌকা কেনাবেচার আসর।
একসময় গরু, পাট ও ধানের জন্য বিখ্যাত ছিল ঘিওরের এই হাট। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে এর চেহারা। একসময় প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত হাটটি এখন অনেকটাই ছোট হয়ে বাজারে পরিণত হয়েছে। তবে বর্ষা এলে পুরোনো ঐতিহ্যের নতুন পরিচয়ে ফিরে আসে ঘিওরের হাট। স্থানীয়দের কাছে তখন এটি পরিচিত হয় ‘নৌকার হাট’ নামে।
ঘিওর ১৯১৯ সালে থানা হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর হাটটির প্রশাসনিক রেকর্ড পাওয়া গেলেও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ইতিহাস আরও পুরোনো। ব্রিটিশ শাসনামলেরও আগে থেকে এখানে বেচাকেনা হয়ে আসছে বলে জানান তারা।
অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ সিরাজ খান বলেন, ব্রিটিশ শাসনামলের আঠারো শতকের প্রথম দিকে ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদীর তীরবর্তী এই হাট গরু, পাট ও ধানের জন্য বেশ পরিচিত ছিল। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরা এখানে আসতেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, পাবনাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন এই হাটে। একসময় সরকারের রাজস্ব আদায়েরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত ছিল ঘিওর হাট।
কালের বিবর্তনে অবশ্য সেই জৌলুস আর নেই। বড় হাটটি ধীরে ধীরে ছোট হয়েছে, বদলে গেছে বেচাকেনার ধরনও। তবে বর্ষা মৌসুমে নৌকার হাট বসার মধ্য দিয়ে এখনো টিকে আছে এর পুরোনো ঐতিহ্যের একটি অংশ।
পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী ও ইছামতী নদীবেষ্টিত মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয়, হরিরামপুর ও ঘিওর উপজেলা। এসব এলাকার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল বর্ষায় পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগও কঠিন হয়ে পড়ে। তখন মানুষের চলাচলের অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠে ডিঙি নৌকা।
শুধু যাতায়াত নয়, মাছ ধরা, হাঁস পালন, কৃষিকাজ কিংবা পানিবন্দী এলাকায় দৈনন্দিন চলাচলেও এসব নৌকা ব্যবহার করেন স্থানীয়রা। ফলে বর্ষা মৌসুমে নৌকার চাহিদা বাড়ে। আর সেই চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করে ঘিওরের এই নৌকার হাট।
প্রতি বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে নৌকা কেনাবেচা। মান ও আকার অনুযায়ী প্রতিটি নৌকার দাম প্রায় ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা। মানিকগঞ্জের পাশাপাশি ঢাকার সাভার ও ধামরাই এবং টাঙ্গাইল থেকেও ক্রেতা-বিক্রেতারা আসেন এই হাটে।
নৌকার সারির মধ্যে বসে ক্রেতার অপেক্ষায় ছিলেন ব্যবসায়ী রমিজ উদ্দিন সরকার। দীর্ঘদিন ধরে এই হাটে নৌকা বিক্রি করছেন তিনি। রমিজ উদ্দিন বলেন, প্রায় ১৬ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে ঘিওরের নৌকার হাটে বিভিন্ন আকার ও মানের নৌকা বিক্রি করছেন। চলতি বছরের জুনে প্রথম নৌকার হাট বসেছে। নদী-খাল-বিলে পানি যতদিন থাকবে, হাটও ততদিন চলবে। তবে এবার ব্যবসা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নন তিনি। পানি কমতে শুরু করায় নৌকার বিক্রিও কমছে বলে জানান তিনি।
ঘিওরের নৌকার হাটের সঙ্গে শুধু বেপারি ও ক্রেতার সম্পর্ক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় কারিগরদের জীবন-জীবিকাও। প্রায় এক যুগ ধরে নৌকা তৈরি করছেন কারিগর সুবল সরকার। তিনি জানান, আম, জাম, ঝিকা, ডুমরা, মেহগনি, কড়ই ও চাম্বুল কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করা হয়। তবে চাম্বুল ও কড়ই কাঠের নৌকার চাহিদা তুলনামূলক বেশি। অধিকাংশ ক্রেতাই ছোট ও মাঝারি আকারের নৌকা কিনে থাকেন।
তার ভাষ্য, কাঠ, পেরেক, মজুরি ও পরিবহনসহ নৌকা তৈরির প্রায় প্রতিটি উপকরণের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নৌকার দামেও।
দৌলতপুর উপজেলার হাটাইল গ্রামের আব্দুর রহমান এসেছেন নিজের প্রয়োজনেই। তার মাছ ও হাঁসের খামার রয়েছে। আগের নৌকাটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন নৌকা কিনতে ঘিওরের হাটে এসেছেন তিনি। বেশ কয়েকটি নৌকা ঘুরে দেখে শেষ পর্যন্ত চাম্বুল কাঠের ৭ হাতের একটি নৌকা পছন্দ করেন। দাম পড়েছে সাড়ে ৫ হাজার টাকা।
আব্দুর রহমান বলেন, আগের তুলনায় নৌকার দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে খামারের কাজের জন্য নৌকা প্রয়োজন হওয়ায় কিনতেই হয়েছে।
শুধু স্থানীয় মানুষ নয়, টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা থেকেও নৌকা কিনতে আসেন অনেকে। নাগরপুরের বাসিন্দা করিম বিশ্বাস বলেন, এখানে একসঙ্গে অনেক নৌকা পাওয়া যায়। তাই কয়েকটি নৌকা দেখে পছন্দ করার সুযোগ রয়েছে। পছন্দ হলে দরদাম করে নৌকা নিয়ে যাবেন। তবে দাম আগের তুলনায় বেশি মনে হচ্ছে।
নৌকা তৈরির কাঠ, পেরেক ও কারিগরের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় নৌকার দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান বিক্রেতারা। কিন্তু দাম বাড়ায় অনেক ক্রেতা নৌকা না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন। এতে বিক্রেতাদেরও লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানান নৌকার বেপারি আলতাফ হোসেন।
হাটে নৌকা বিক্রি হওয়ার পর শুরু হয় সেটি গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কাজ। এ জন্য ব্যবহার করা হয় ভ্যান ও ঘোড়ার গাড়ি। নৌকা পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় অর্ধশতাধিক ঘোড়ার গাড়ি ও ভ্যানচালক।
ভ্যানচালক আজিজ মিয়া বলেন, হাটের দিনে নৌকা পরিবহনের কাজই তাদের মূল ব্যস্ততা। তবে এবার হাট কিছুটা মন্দা। পানি কমে যাওয়ায় নৌকার বেচাকেনাও কমেছে। ক্রেতারা কম দাম বলছেন। আবার বিক্রেতারাও পানি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক সময় লোকসানে নৌকা বিক্রি করছেন। দূরত্ব অনুযায়ী একটি নৌকা পরিবহনে ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেন তারা।
ঘিওর নৌকা হাটের ইজারাদার মনির হোসেন জানান, প্রতি বুধবার এই হাটে মানিকগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার শতাধিক ব্যবসায়ী ও নৌকা তৈরির কারিগর আসেন। হাটের স্থায়িত্ব মূলত নদী, খাল ও বিলে পানির অবস্থার ওপর নির্ভর করে। পানি ভালো থাকলে প্রতি বুধবার গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি নৌকা বিক্রি হয়। এতে আর্থিক লেনদেন হয় প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। তবে পানি কমতে শুরু করলে বিক্রি নেমে আসে ২ থেকে ৩ লাখ টাকায়।
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাশিতা তুল ইসলাম বলেন, ঘিওরের নৌকার হাটটি শত বছরের ঐতিহ্য বহন করছে। প্রতি বুধবার জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকা আসে এবং ক্রেতারাও আসেন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। নদী ও চরাঞ্চলের মানুষের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী এই হাট স্থানীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে।
The post শরতেও জমজমাট শতবর্ষী ‘ঘিওর নৌকার হাট’ first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





