সমন্বিত আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ার তাগিদ 

স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের আহ্বান

  • ডিজিটাল হেলথ ট্র্যাকিং, মলিকিউলার ল্যাব ও হেলথটেক উদ্ভাবনে সরকারের বড় বরাদ্দ
  • গবেষণা বাণিজ্যিকীকরণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সাশ্রয়ী প্রযুক্তি পৌঁছানোর তাগিদ
  • নিরাপদ ডেটা আর্কিটেকচার, রোগ প্রতিরোধ ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ

স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের আহ্বান
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:১০  

ডিজিটাল হেলথ সিস্টেম, ওষুধ ট্র্যাকিং আর্কিটেকচার, মলিকিউলার গবেষণা এবং সমন্বিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

১৩ সেপ্টেম্বর, রবিবার রাজধানীর নভোথিয়েটারে 'বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬'-এর অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘Health Innovation for All: Expanding Access to Affordable and Quality Healthcare’ শীর্ষক প্লেনারি অধিবেশনে তারা এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। স্বাস্থ্যসেবা খাতের সামগ্রিক রূপান্তরে উন্নত বায়োমেডিক্যাল গবেষণা, ক্লাউডভিত্তিক রোগী ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের ওপর বক্তারা গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জোবাইদা রহমান বলেন, "স্বাস্থ্যসেবায় উদ্ভাবনকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সাশ্রয়ী, মানসম্মত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতে উদ্ভাবন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সমন্বিত সেবা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।" তিনি উল্লেখ করেন, "স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আয়, অবস্থান বা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য থাকা উচিত নয়। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে শহর পর্যন্ত সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।"

চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রাধিকার তুলে ধরে ডা. জোবাইদা রহমান বলেন, "বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অগ্রগতি ও সক্ষমতা নিয়ে আমরা গর্বিত। তবে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করতে হলে শুধু রোগের চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণের ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, প্রতিরোধই চিকিৎসার চেয়ে উত্তম। সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কর্মসূচি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অনেক জটিল রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।" তিনি আরও বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ যাতে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য না হন, সে জন্য মানুষের বাড়ির কাছাকাছি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে হৃদরোগ, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক ব্যাধির বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা প্রয়োজন। ডায়াবেটিসের আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে জাতীয় নেটওয়ার্কে যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রি-একল্যাম্পসিয়া ও গর্ভকালীন জটিলতা নিরসনে কমিউনিটি পর্যায় থেকে বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত ডিজিটাল রেফারেল ও নিয়মিত ফলোআপ কাঠামো থাকা দরকার। রক্তসেবা প্রসঙ্গে তিনি জানান, রক্ত সংগ্রহ, স্ক্রিনিং, পরিবহন ও প্লাজমা ফ্র্যাকশনেশনের জাতীয় আধুনিক ফ্রেমওয়ার্ক জরুরি। ডা. জোবাইদা রহমান বলেন, "উদ্ভাবন মানেই সবসময় ব্যয়বহুল যন্ত্র বা অ্যাপ্লিকেশন নয়; বাস্তব স্বাস্থ্য সমস্যার কার্যকর সমাধানই মূল বিষয়। এজন্য গবেষণা, প্রযুক্তি, নীতিমালা ও প্রয়োগের মধ্যে সুষম যোগসূত্র তৈরি করতে হবে।"

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানান, সরকার স্বাস্থ্য খাতে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান ও গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের তহবিল বরাদ্দ করছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, "ভ্যাকসিন গবেষণা, রোগ প্রতিরোধ ও মলিকিউলার গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি উদ্যোগে একটি বৃহৎ আধুনিক মলিকিউলার ল্যাব স্থাপনের কার্যক্রম দ্রুত গতিতে চলছে।" এছাড়া বিদেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের দেশীয় গবেষণায় যুক্ত করা হবে।

হাসপাতাল অটোমেশন ও সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, "রোগীর সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং ওষুধ ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ডোজের সঠিক বণ্টন মনিটর করা সম্ভব।" তিনি আরও জানান, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও শক্তিশালী ডেটা আর্কিটেকচার নিশ্চিত করে একটি সর্বজনীন ‘ডিজিটাল হেলথ প্ল্যাটফর্ম’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলকে পুনর্গঠন ও ক্লিনিক্যাল গবেষণার জন্য পৃথক তহবিল গঠনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন প্লেনারি সেশনে বলেন, "‘Innovate to Market’ ধারণাকে সামনে রেখে উদ্ভাবনকে কেবল গবেষণাগারে না রেখে বাণিজ্যিকীকরণ করতে হবে। এজন্য জাতীয় পর্যায়ে ‘ইনোভেশন হাব’ গড়ে তোলা হচ্ছে যা গবেষক, উদ্যোক্তা ও শিল্পের মধ্যে সরাসরি কারিগরি সংযোগ ঘটাবে।"

সেশনটি সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। কি-নোট স্পিকার ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান।

অধিবেশনে প্যানেল আলোচক হিসেবে যুক্ত ছিলেন ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের (ডিজিডিএ) মহাপরিচালক মো. আলমগীর হোসাইন, আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমীদ আহমেদ, টিএমএসএস-এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর-২ ডা. মো. মতিউর রহমান, বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি এম মোসাদ্দেক হোসাইন, ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের ডিরেক্টর অব মেডিকেল সার্ভিসেস ডা. আজহারুল ইসলাম খান এবং এসকেজেন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ডা. সাদাফ সাজ সিদ্দিকী। প্রযুক্তি, গবেষণা ও সরকারি নীতিমালার কার্যকর মেলবন্ধনে একটি মানবিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান সংশ্লিষ্টরা।
//ডিবিটেক/এমএএম/এসএমই/এফওইবি//