আজ অন্যের কল রেকর্ড, কাল কার?
নাগরিকের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও গণমাধ্যমের দায়িত্বের প্রশ্ন
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিগত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা এবং কখনো কখনো সাধারণ নাগরিকের কথোপকথনের অডিও বা কল রেকর্ড প্রকাশ হতে দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব রেকর্ডে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অপরাধের অভিযোগের সূত্র থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে তদন্ত ও জনস্বার্থের প্রশ্ন অবশ্যই রয়েছে।
কিন্তু এর পাশাপাশি আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—
আজ যাদের কল রেকর্ড প্রকাশিত হচ্ছে, আগামীকাল বর্তমান সরকার বা বর্তমান ক্ষমতাকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কল রেকর্ড প্রকাশ হবে না—তার নিশ্চয়তা কোথায়?
আর যদি ভবিষ্যতে কোনো সরকার ক্ষমতা পরিবর্তনের পর আজকের ক্ষমতাবানদের ব্যক্তিগত কথোপকথন প্রকাশ করে, তখন কি আমরা বলব সেটি ন্যায়সংগত?
এই প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা দলের পক্ষে-বিপক্ষে নয়। এটি রাষ্ট্র, আইন, নাগরিক অধিকার এবং গণতন্ত্রের প্রশ্ন।
সংবিধান কী বলে?
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের যোগাযোগের গোপনীয়তাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদের (খ) দফায় প্রত্যেক নাগরিকের correspondence and other means of communication”-এর privacy বা যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ ফোনে কথা বলা, চিঠিপত্র, ই-মেইল কিংবা আধুনিক যোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যম—এসব ব্যক্তিগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপেরও একটি সাংবিধানিক সীমা রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—
গোপনীয়তার অধিকার কোনো অপরাধীর জন্য বিশেষ সুবিধা নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার।
কেউ অপরাধ করলে তদন্ত হবে, তার যোগাযোগ আইন অনুযায়ী তদন্তের আওতায় আসতে পারে। কিন্তু অপরাধের তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আর নির্বিচারে ব্যক্তিগত যোগাযোগ সংগ্রহ বা প্রকাশ—দুটি এক বিষয় নয়।
তাহলে কি সরকার কখনো কল রেকর্ড সংগ্রহ করতে পারবে না?
না। বিষয়টি এত সরল নয়।
রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, গুরুতর অপরাধের তদন্ত কিংবা আইন প্রয়োগের বৈধ প্রয়োজন থাকতে পারে। বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ রয়েছে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশ্ন হলো—কোন পরিস্থিতিতে নজরদারি করা যাবে, কে অনুমোদন দেবে, কতদিন করা যাবে, কী তথ্য সংগ্রহ করা যাবে, সেই তথ্য কে ব্যবহার করবে এবং কখন তা ধ্বংস করতে হবে?
রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা থাকা এবং রাষ্ট্র সেই ক্ষমতা যেকোনোভাবে ব্যবহার করতে পারা—এক জিনিস নয়।
আইনের শাসনের মূল কথাই হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতারও সীমা থাকবে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় নতুন আইন—কতটা সুরক্ষা দিচ্ছে?
বাংলাদেশে ডিজিটাল যুগের বাস্তবতায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে Personal Data Protection Ordinance, 2025-এর মাধ্যমে। এই অধ্যাদেশ ব্যক্তিগত তথ্যকে ব্যক্তির সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করার ভিত্তি গ্রহণ করেছে এবং তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনি কাঠামো তৈরি করেছে।
এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন শেষ নয়। কারণ ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইন থাকলেই নাগরিক নিরাপদ হয়ে যায় না। আইন কতটা স্বাধীনভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কতটা জবাবদিহির মধ্যে রয়েছে এবং নাগরিক বেআইনি নজরদারির বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রতিকার পাচ্ছেন—সেটিই আসল পরীক্ষা।
বর্তমান কাঠামো নিয়ে অধিকার ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোরও উদ্বেগ রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) ২০২৬ সালে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশের কিছু বিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, অপরাধ প্রতিরোধ, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের মতো বিস্তৃত ভিত্তিতে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের সুযোগ অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ আইন হয়েছে—এটি ইতিবাচক; কিন্তু আইনের ক্ষমতার সীমা ও স্বাধীন তদারকি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্র কি নাগরিকের তথ্যের মালিক?
আধুনিক তথ্য-অধিকার ও ডেটা-সুরক্ষা ধারণায় রাষ্ট্র নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের অবাধ মালিক নয়।
বাংলাদেশের নতুন ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন হলো—ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর ব্যক্তির অধিকার ও নিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দেওয়া। সরকারের ২০২৬ সালের একটি নীতিগত নথিতেও Personal Data Protection Ordinance, 2025-এর অধীনে নাগরিকের access, correction, erasure ও consent withdrawal-এর মতো অধিকারগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন। রাষ্ট্র নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে আইনের প্রয়োজনে সেই তথ্যের অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্র সেটিকে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা প্রচারণামূলক উদ্দেশ্যে অবাধে ব্যবহার করতে পারবে। আজকের সরকার কি আগামীকাল নিরাপদ থাকবে? এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বর্তমান সরকার যদি বলে—“আমরা নাগরিকের কল রেকর্ড অপব্যবহার করব না”—তাহলে সেটি রাজনৈতিক আশ্বাস হতে পারে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার কোনো সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
কারণ সরকার পরিবর্তন হয়।
ক্ষমতার ব্যক্তি পরিবর্তন হয়।
রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হয়।
কিন্তু আইন ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়। আজ যে সরকার ক্ষমতায় আছে, আগামীকাল সে সরকার ক্ষমতায় নাও থাকতে পারে। আজ যে কর্মকর্তা তথ্যের নিয়ন্ত্রণে আছেন, আগামীকাল তিনি হয়তো সেই পদে থাকবেন না।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—
বর্তমান সরকার ভালো থাকবে কি না?” নয়; বরং “যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, সে যাতে নাগরিকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করতে না পারে—সেই ব্যবস্থা কি আমরা করেছি?”
আমার মতে, এখানেই আমাদের বড় ঘাটতি।
কল রেকর্ড প্রকাশ কি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা?
এখানেও ভারসাম্য প্রয়োজন
কোনো কল রেকর্ড হাতে এলেই সেটি প্রকাশ করা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার অপরিহার্য অংশ নয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো রেকর্ডে যদি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, গুরুতর অপরাধ বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকে, তাহলে সেটি যাচাই করে জনস্বার্থে প্রকাশের প্রশ্ন উঠতে পারে।
কিন্তু একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কথোপকথন প্রকাশ করে কাউকে সামাজিকভাবে অপমান করা, রাজনৈতিকভাবে হেয় করা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে টেনে আনা সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জনস্বার্থ আর জনকৌতূহল এক নয়
মানুষ কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির ব্যক্তিগত কথোপকথন শুনতে আগ্রহী হতে পারে। কিন্তু মানুষের কৌতূহল মেটানো আর জনস্বার্থ রক্ষা করা একই বিষয় নয়।
সাংবাদিকতার শক্তি তথ্য প্রকাশে যেমন, তেমনি কোন তথ্য প্রকাশ না করা উচিত—সেই নৈতিক বিচারবোধের মধ্যেও।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বিষয়টি আরও স্পষ্ট।
বাংলাদেশ International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এ ৬ সেপ্টেম্বর ২০০০ তারিখে যোগ দেয়; এটি বাংলাদেশের জন্য ৬ ডিসেম্বর ২০০০ থেকে কার্যকর হয়।
ICCPR-এর ১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, বাসস্থান বা correspondence বা যোগাযোগের ওপর arbitrary বা unlawful interference করা যাবে না। একই সঙ্গে ব্যক্তির সম্মান ও সুনামের বিরুদ্ধে বেআইনি আক্রমণ থেকেও আইনি সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।
এখানে দুটি শব্দ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—
Unlawful— অর্থাৎ বেআইনি হস্তক্ষেপ করা যাবে না; Arbitrary— অর্থাৎ আইন থাকলেও তা যেন খামখেয়ালি, অযৌক্তিক বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রয়োগ না হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামোও ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর বলছে, অনলাইন ও অফলাইন—উভয় ক্ষেত্রেই privacy মানবাধিকার ভোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও ডিজিটাল যুগে গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে পৃথক রেজল্যুশন গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, নাগরিকের গোপনীয়তার প্রশ্ন ততই গুরুত্বপূর্ণ হবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বনাম নাগরিকের গোপনীয়তা—সমাধান কোথায়? রাষ্ট্র বলবে—জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নজরদারি প্রয়োজন। নাগরিক বলবে—আমার ব্যক্তিগত জীবন রক্ষা করতে হবে। দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সমাধান হলো না রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ অন্ধ করে দেওয়া, আবার নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রকে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া নয়। সমাধান হলো— আইন + বিচারিক অনুমোদন + প্রয়োজনীয়তা + আনুপাতিকতা + সময়সীমা + স্বাধীন তদারকি + জবাবদিহি।
কোনো নাগরিকের ফোনে নজরদারি প্রয়োজন হলে তার কারণ লিখিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। যতটা তথ্য প্রয়োজন, ততটাই সংগ্রহ করতে হবে। প্রয়োজন শেষ হলে তথ্যের ব্যবহার ও সংরক্ষণ বন্ধ করতে হবে। বেআইনি নজরদারি হলে নাগরিককে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাষ্ট্রীয় সংস্থার সংগৃহীত তথ্য রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি হতে পারবে না।
কল রেকর্ড ফাঁসের দায় কার? এখানে শুধু সরকার নয়, আরও কয়েকটি পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে।
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চিত করতে হবে যে সংগৃহীত তথ্য কঠোরভাবে নিরাপদ থাকবে।
দ্বিতীয়ত, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানগুলোরও তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে।
তৃতীয়ত, কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তি যদি বেআইনিভাবে রাষ্ট্রীয় তথ্য বাইরে দেন, তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও বুঝতে হবে—কোনো তথ্য পাওয়া মানেই সেটি প্রকাশ বা শেয়ার করার নৈতিক অধিকার পাওয়া নয়।
একটি ব্যক্তিগত কথোপকথন ভাইরাল করে দেওয়া একজন মানুষের সামাজিক মর্যাদা, পরিবার, পেশা এমনকি নিরাপত্তাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ভবিষ্যতের জন্য কী ধরনের আইন দরকার?
বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন শুধু ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইন নয়; প্রয়োজন যোগাযোগের গোপনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় নজরদারি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট, কঠোর এবং বিচারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত কাঠামো।
এমন পরিস্থিতে করণীয়
১.আদালতের অনুমোদন ছাড়া নিয়মিতভাবে নাগরিকের ব্যক্তিগত যোগাযোগে নজরদারি করা যাবে না।
২.জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষ নজরদারি হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচারিক পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩.নজরদারির সুনির্দিষ্ট কারণ ও সর্বোচ্চ সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
৪.যে উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তার বাইরে অন্য কাজে তথ্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে।
৫রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় নজরদারির তথ্য ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
৬.বেআইনিভাবে কল রেকর্ড সংগ্রহ, সংরক্ষণ, হস্তান্তর বা প্রকাশের জন্য কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৭. তদন্ত শেষ হলে প্রয়োজনহীন ব্যক্তিগত তথ্য ধ্বংস করার বিধান থাকতে হবে।
৮.নাগরিককে তার ওপর বেআইনি নজরদারি হলে প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
৯.নজরদারি ব্যবস্থার ওপর স্বাধীন বিচারিক ও সংসদীয় তদারকি থাকতে হবে। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে নিয়মিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য এখনই প্রয়োজন
এই বিষয়টি কোনো আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত, এনসিপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়।
এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের বিষয়।
আজ যে দল ক্ষমতায় আছে, আগামীকাল অন্য দল ক্ষমতায় আসতে পারে।
আজ যে ব্যক্তি বিরোধী দলে আছেন, আগামীকাল তিনি সরকারে যেতে পারেন।
আজ যে কর্মকর্তা ক্ষমতার কেন্দ্রে আছেন, আগামীকাল তিনি সাধারণ নাগরিক হয়ে যেতে পারেন।
তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি বিষয়ে ঐকমত্য প্রয়োজন—
সরকার বদলালেও নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার বদলাবে না।
আজ যদি অন্যের অধিকার রক্ষা না করি। বিগত সরকারের কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকলে তার বিচার অবশ্যই হতে হবে।
তার বিরুদ্ধে প্রমাণ থাকলে তদন্ত হোক। প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হোক। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হোক।
কিন্তু সেই বিচার যেন এমন কোনো নজির তৈরি না করে, যেখানে ভবিষ্যৎ সরকারও বলতে পারে—“আগের সরকার করেছে, আমরাও করতে পারি।”
আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—আমরা আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকারও রক্ষা করতে পারি কি না।
আজ যার কল রেকর্ড প্রকাশ হচ্ছে, তিনি হয়তো ক্ষমতাবান ছিলেন। আগামীকাল তিনি ক্ষমতাহীন।
কিন্তু ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে তার নাগরিক অধিকার শেষ হয়ে যায় না।
একইভাবে আজ যিনি সরকারপ্রধান, আগামীকাল তিনিও সাবেক সরকারপ্রধান হতে পারেন।
তাই আজকের প্রশ্ন শুধু—কার কল রেকর্ড প্রকাশ হলো?
প্রশ্ন হওয়া উচিত—
কেন প্রকাশ হলো? কে প্রকাশ করল? কী আইনি প্রক্রিয়ায় তা সংগ্রহ করা হয়েছিল? এর জনস্বার্থ কোথায়? এবং আগামীকাল একই কাজ যদি আমাদের সঙ্গে ঘটে, তখন আমাদের সুরক্ষা কোথায়?
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো—ক্ষমতাবান ব্যক্তির জন্যও একই আইন, সাধারণ নাগরিকের জন্যও একই আইন।
রাষ্ট্রের শক্তি এই নয় যে সে নাগরিকের সব কথা শুনতে পারে।
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি হলো— সে নাগরিকের ব্যক্তিগত কথা শুনতে সক্ষম হয়েও আইন ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে না।
সরকার আসে, সরকার যায়।
ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়।
কিন্তু নাগরিকের অধিকার থেকে যায়।
তাই আজই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—
আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে ক্ষমতাবানরা প্রয়োজনমতো নাগরিকের ব্যক্তিগত কথোপকথন সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে পারবে, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে অপরাধের বিচার হবে, দুর্নীতির তদন্ত হবে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা হবে—কিন্তু একই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবন, যোগাযোগ ও তথ্যের গোপনীয়তাও আইনের কঠোর সুরক্ষায় থাকবে?
আমার বিশ্বাস, দ্বিতীয় পথটিই গণতন্ত্রের পথ।
কারণ— সরকার বদলায়, ক্ষমতা বদলায়, শাসক বদলায়; কিন্তু নাগরিকের অধিকার কোনো সরকারের দয়া নয়—এটি রাষ্ট্রের আইনি ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা।
আর আজ যদি আমরা অন্যের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য কথা না বলি, তাহলে আগামীকাল যখন আমাদের নিজেদের গোপনীয়তা জনসমক্ষে চলে আসবে, তখন প্রতিবাদ করার নৈতিক অধিকারও দুর্বল হয়ে যাবে।
আজ অন্যের কল রেকর্ড ফাঁসকে যদি আমরা স্বাভাবিক করে তুলি, কাল সেটিই আমাদের সবার জন্য স্বাভাবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে।
সুতরাং এখনই সময় একটি স্পষ্ট নীতি প্রতিষ্ঠার—
অপরাধের বিচার হবে, কিন্তু নাগরিকের গোপনীয়তার বিচার হবে না।
রাষ্ট্র নিরাপদ থাকবে, নাগরিকের অধিকারও নিরাপদ থাকবে।
সরকার বদলাবে, কিন্তু নাগরিকের মৌলিক অধিকার বদলাবে না।
লেখকঃ সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন





