প্রথম পর্ব: জনমত, রাষ্ট্র ও তথ্যযুদ্ধের নতুন বাস্তবতা

বট বাহিনী: ডিজিটাল যুদ্ধের অদৃশ্য সৈনিক

বট বাহিনী: ডিজিটাল যুদ্ধের অদৃশ্য সৈনিক
২ আগষ্ট, ২০২৬ ১২:২৯  

একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল রক্তাক্ত সীমান্ত, পদাতিক সৈন্য, কামান কিংবা যুদ্ধবিমান। কূটনৈতিক সংঘাতের সরাসরি পরিণতি দেখা যেত সমরে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের মানচিত্র এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী রণক্ষেত্র হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখানে গোলাবারুদ বা অস্ত্রের বদলে সমানে ব্যবহৃত হচ্ছে তথ্য, গুজব, অপপ্রচার, বিভেদ, আবেগ এবং অ্যালগরিদম। আর এই ডিজিটাল যুদ্ধের সবচেয়ে কার্যকর ও ধারালো অস্ত্রগুলোর একটি হলো "বট বাহিনী"—এমন এক অদৃশ্য ডিজিটাল শক্তি, যা কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তৈরি করা জনমতকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে, সামাজিক বিভাজনে ঘৃতাহুতি দিতে পারে কিংবা পুরো একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চরিত্র ও গতিপ্রকৃতিতে যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে মূল চালিকাশক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অভাবনীয় অগ্রগতি। আগের দিনের বটের কাজ ছিল কেবল নির্দিষ্ট কিছু লেখা বা বার্তা বারংবার পোস্ট বা প্রচার করা। কিন্তু আধুনিক এআই-চালিত বট স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মতো যৌক্তিক ভাষা ব্যবহার করতে পারে, যেকোনো প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে পারে, অনলাইন বিতর্কে অংশ নিতে পারে, এমনকি আলাদা মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝে ভিন্ন ভিন্ন ধারার বার্তাও তৈরি করতে পারে। ফলস্বরূপ, সাধারণ একজন ব্যবহারকারীর পক্ষে রক্তমাংসের প্রকৃত মানুষ এবং কৃত্রিমভাবে পরিচালিত অ্যাকাউন্টের পার্থক্য চেনা ক্রমেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে।

প্রযুক্তি গবেষকেরা এই নজিরবিহীন পরিবর্তনকে সংজ্ঞায়িত করছেন "কম্পিউটেশনাল প্রোপাগান্ডা" (Computational Propaganda) নামে। এর মূলকথা হলো—কম্পিউটিং সিস্টেম, উন্নত অ্যালগরিদম, স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে জনমত গঠন বা পরিবর্তন করা। এই প্রোপাগান্ডার একমাত্র লক্ষ্য যে কেবল নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা, তা নয়; বরং জনমনে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট করা এবং সমাজে এমন এক কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি করা—যেখানে সত্য ও মিথ্যার সূক্ষ্ম সীমারেখাটি একেবারেই অস্পষ্ট হয়ে যায়।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) তাদের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক ঝুঁকি মূল্যায়নে "ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যকে" (Misinformation & Disinformation) মানবজাতির জন্য অন্যতম প্রধান স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ, কৃত্রিমভাবে ভাইরাল হওয়া একটি অসত্য তথ্য কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একটি দেশের জাতীয় নির্বাচন, জাতীয় অর্থনীতি, স্বাস্থ্যনীতি বা সামাজিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর প্রত্যক্ষ ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে সক্ষম। প্রযুক্তি যত দ্রুত উৎকর্ষ লাভ করছে, অপপ্রচারকারীরাও তত নিখুঁত ও চটজলদি তাদের ডিজিটাল চাল চালতে পারছে।

আজকের বট বাহিনী আর কেবল কয়েকটি স্বয়ংক্রিয় ভুয়া অ্যাকাউন্টের সমষ্টিমাত্র নয়। এর পেছনে যুক্ত হয়েছে জটিল ট্রল নেটওয়ার্ক, ডিপফেক (Deepfake) ভিডিও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি ও কণ্ঠস্বর এবং অ্যালগরিদম নির্ভর নিখুঁত প্রচারণা। অনেক সময় একই ন্যারেটিভ বা বার্তা হাজার হাজার সমন্বিত অ্যাকাউন্ট থেকে একযোগে শেয়ার বা কমেন্ট করা হয়। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সেটিকে "অত্যন্ত জনপ্রিয়" বা "ট্রেন্ডিং" হিসেবে চিহ্নিত করে স্বাভাবিক ব্যবহারকারীদের টাইমলাইনে ঠেলে দেয়। সাধারণ পাঠকের কাছে তখন মনে হয়, এটাই বুঝি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত। অথচ বাস্তবে সেই তুমুল আলোচনার সিংহভাগই একটি সুনির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত।

এই কৌশলটি একেবারে নতুন না হলেও, এর ব্যপ্তি ও সক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী। গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং সামাজিক আন্দোলনগুলোকে কেন্দ্র করে সমন্বিত ডিজিটাল প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। তবে ২০২৪ সালের পর থেকে এআই-ভিত্তিক কন্টেন্ট তৈরির প্রযুক্তি সবার জন্য সহজলভ্য হয়ে ওঠায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা পেয়েছে। বর্তমানে অতি অল্প খরচে সামান্য কয়েকজন ব্যক্তি বা ছোট একটি গোষ্ঠীও বিপুল পরিমাণ লেখা, ছবি ও ভিডিও তৈরি করে ইন্টারনেটে অপপ্রচারের বন্যা বইয়ে দিতে পারে।

বট বাহিনীর সবচেয়ে বড় মানসিক অস্ত্র হলো—মানুষের সংবেদনশীল আবেগকে নিশানা করা। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, ভাষা, নির্বাচন, অর্থনীতি কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে ঘিরে যখন কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়, তখন সাধারণ মানুষ দ্রুত আবেগের বশে প্রতিক্রিয়া দেখায়। আর অ্যালগরিদমের নিয়মই হলো—যে পোস্ট বা কন্টেন্টে প্রতিক্রিয়া বেশি, সেটিকে আরও বেশি মানুষের সামনে মেলে ধরা। ফলে অপপ্রচার খুব স্বাভাবিক নিয়মেই বহুগুণ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

২০২৪-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে একটি নতুন বিপজ্জনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে—"এআই-সমর্থিত প্রভাব অভিযান" (AI-Enabled Influence Operations)। এতে মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং কৃত্রিম সফটওয়্যারের শক্তি এক হয়ে কাজ করে। ধরা যাক, কোনো একজন ব্যক্তি একটি অসত্য বা বিভ্রান্তিকর মূল দাবি তৈরি করলেন; এরপর শত শত বা হাজারো স্বয়ংক্রিয় বট অ্যাকাউন্ট সেটিকে মুহূর্তেই ছড়িয়ে দিল। কোথাও বটের কাজ, কোথাও মানুষের অপপ্রচার, আবার কোথাও দুইয়ের সমন্বয়—এর ফলে কোনটা প্রকৃত জনমত আর কোনটা কৃত্রিম অপপ্রচার, তার পার্থক্য ধোঁয়াশা হয়ে যায়।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সাইবার বাস্তবতার বাইরে নয়। বিশেষ করে ২০২৪-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক উত্তেজনা এবং বিভিন্ন আলোচিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুয়া তথ্য, পুরোনো সংবেদনশীল ভিডিওকে নতুন ঘটনার রূপ দেওয়া, এডিটেড ছবি এবং মনগড়া পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। দেশের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিতভাবে এসব অপতথ্য শনাক্ত করছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে একই ধরনের বার্তা প্রচারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার পেছনে পুরোপুরি বট কাজ করেছে কিনা—তা চূড়ান্তভাবে বলতে গভীর প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন।

এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে—বট বাহিনী কি কেবলই একটি কারিগরি বা প্রযুক্তিগত সমস্যা, নাকি এটি গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক সমাজের অস্তিত্বের জন্য এক বিরাট হুমকি?

উত্তরটি বেশ জটিল। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর কেবল বিনোদন বা কুশল বিনিময়ের মাধ্যম নয়; এটি রাজনৈতিক আলোচনা, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, সংবাদ পাঠ এবং জনমত গঠনের প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। ফলে এই সামাজিক পরিসরটি যদি কৃত্রিমভাবে বিষাক্ত বা প্রভাবিত করা হয়, তবে তার মাশুল গুণতে হয় বাস্তব জীবনে। মানুষ ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত নেয়, সমাজে হিংসা ও বিভাজন বাড়ে, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি আস্থা কমে যায় এবং সরকার ও নাগরিকের মধ্যে অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ডিজিটাল তথ্যযুদ্ধে সত্যের চেয়ে মিথ্যার গতি বহুগুণ বেশি। কারণ সত্যকে যাচাই করতে সময়ের প্রয়োজন হয়, অথচ একটি চমকপ্রদ বা উত্তেজনাপূর্ণ গুজব চোখের পলকে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে তা মিথ্যা প্রমাণিত হলেও, মানুষের মনস্তত্ত্বে এবং সমাজে তার ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই থেকে যায়।

তাই এই আধুনিক ডিজিটাল যুগে বট বাহিনীকে কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিক সচেতনতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এক বৈশ্বিক বাস্তবতা। তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই নতুন যুগে যে রাষ্ট্র তথ্যক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না, এবং যে সমাজ তথ্য যাচাইয়ের সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হবে—তারা সহজেই এই অদৃশ্য বট বাহিনীর কৃত্রিম জনমত ও বিভাজনের শিকার হবে।


লেখকঃ সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।