তালা ভেঙে প্রবেশের প্রতিবাদে জাতীয় ছাত্রশক্তি; রাজধানীতে ঢাকাস্থ চুয়েটিয়ানদের মানববন্ধনের ডাক

 

চুয়েটে ভিসি ভবনে তালা ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, বুয়েট শিক্ষার্থীদের সংহতি

  • সদ্য সাবেক উপাচার্য ড. সায়েমকে পুনর্বহাল ও নতুন ভিসি ড. শরীফুল আলমের পদত্যাগের দাবিতে বাসভবন অবরুদ্ধ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন।
  • চুয়েটের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও স্টাফদের যৌথ সর্বাত্মক অসহযোগে স্থবির ক্যাম্পাস; আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংহতি প্রকাশ বুয়েট শিক্ষার্থীদের
    চুয়েটে ভিসি ভবনে তালা ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, বুয়েট শিক্ষার্থীদের সংহতি
    ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১৮  

    চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের পদত্যাগ এবং সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলন এক নজিরবিহীন ও চূড়ান্ত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে।

    ১২ অক্টোবর, সোমবার শিক্ষার্থীদের দেওয়া নির্দিষ্ট আলটিমেটাম অতিক্রান্ত হওয়ার পর নতুন উপাচার্যকে তার সরকারি বাসভবনে অবরুদ্ধ করে মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে চুয়েটের শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি এবং দেশের শীর্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্য সংহতিতে এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকট এখন জাতীয় রূপ লাভ করেছে।

    সোমবার সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমের সামনে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম পদত্যাগপত্র জমা দিলে ভবনের তালা খুলে তাকে ও তার সঙ্গীদের নিরাপদে ক্যাম্পাস ত্যাগের সুযোগ দেওয়া হবে। এ জন্য তাকে নিজ হাতে পদত্যাগপত্র লিখে শিক্ষার্থীদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে অথবা গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হবে। অন্যথায় অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তাকে ভেতরে অবরুদ্ধ রাখা হবে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, দুপুর ১২টার মধ্যে ভবন ত্যাগের সময়সীমা অমান্য করে উপাচার্য ভেতরে অবস্থান করায় প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হন তারা। এর আগে বহিরাগতদের সাথে নিয়ে উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের খবর ছড়িয়ে পড়া এবং শিক্ষার্থীদের বাস যাতায়াত ঠেকাতে হাটহাজারীর কুয়াইশ এলাকায় ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়ার ঘটনায় ক্যাম্পাসে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

    এদিকে চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রতি আনুষ্ঠানিক সংহতি প্রকাশ করেছেন বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ১২ অক্টোবর রাতে বুয়েটের প্যাডে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। গ্রহণযোগ্য সমাধান না করে সংকট দীর্ঘায়িত করায় শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বিবৃতিতে বুয়েট শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট ঘোষণা করেন, "একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা কেবল আনুষ্ঠানিক নিয়োগের ওপর নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের আস্থা অর্জনের ওপরও নির্ভরশীল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা চুয়েটের শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছি এবং তাদের মতামত উপেক্ষা করে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যকে প্রত্যাখ্যানের অবস্থানের সঙ্গে একাত্মতা জানাচ্ছি।"

    ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। সংকট নিরসন ও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবিতে তারা একযোগে পূর্ণ অসহযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সকল প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।

    অন্যদিকে, ছাত্রদলের প্রোটোকলে ভিসির তালা ভেঙে দপ্তরে প্রবেশের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় ছাত্রশক্তি। সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক সরদার নাদিম মাহফুজ শুভ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের পাশে থাকার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে।

    রাতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, "অ্যালামনাই হিসেবে ওনার (ভিসি) বিপক্ষে আমাদের কোনো আন্দোলন ছিল না। আমাদের ভিসিকে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সরিয়ে দেওয়ায় তাকে পুনর্বহালের আন্দোলন করছিলাম। কিন্তু বর্তমান ভিসি শিক্ষকদের হয়রানি ও হুমকি দিয়েছেন, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বন্ধ করিয়েছেন। এরপর আমরা তাকে ভিসি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করি। অথচ তিনি চোরের মতো বহিরাগত নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন এবং শহর থেকে ফিরে আসার বাসগুলোর ওপর বর্বর আক্রমণ করিয়েছেন। দুই দফা বাসে আক্রমণ করা হলেও প্রশাসনের কোনো সাহায্য মেলেনি। ফলে এই ভিসিকে শিক্ষার্থীরা আর কোনোভাবেই মেনে নেবে না।"

    পরবর্তীতে অবরুদ্ধ ভিসির জন্য খাবার ও পানি সরবরাহে ক্যাম্পাসে আসেন রাউজান উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংছিং মারমা। তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে খাবার সরবরাহের সহযোগিতা চাইলে চরম ক্ষোভের মধ্যেও অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের রান্না করা খাবার ও পানি অবরুদ্ধ ভিসির কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

    সার্বিক অচলাবস্থা নিরসন এবং চুয়েটের শিক্ষার্থীবাহী বাসে দফায় দফায় হামলার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে ঢাকাস্থ চুয়েট শিক্ষার্থীরা মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীতে এক প্রতিবাদী মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সেখানে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

    //ডিবিটেক/ সিজিএইচ/ এসএমপি/এমআইএসটি//