স্মার্ট বাংলাদেশের ভিত্তি মজবুত করতে ফাইবার অবকাঠামো ও নীতিমালায় জোর দেওয়ার তাগিদ

স্মার্ট বাংলাদেশের ভিত্তি মজবুত করতে ফাইবার অবকাঠামো ও নীতিমালায় জোর দেওয়ার তাগিদ
১৯ আগষ্ট, ২০২৬ ১৪:৫১  

দেশের সর্বত্র সাশ্রয়ী মূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছাতে ফাইবার ক্যাবলিং, ডেটা সেন্টার এবং ক্লাউড সেবার সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর অদূরে গাজীপুরের ছুটি রিসোর্টে টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘ফিক্সড ব্রডব্যান্ড: ফিউচার অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালায় তারা এ মত প্রকাশ করেন। এতে ঢাকার বিভিন্ন গণমাধ্যমের ৩০ জন আইসিটি ও টেলিকম সাংবাদিক অংশ নেন।

কর্মশালায় তিনটি পৃথক সেশন পরিচালনা করেন ফাইবার অ্যাট হোমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মইনুল হক সিদ্দিক, চিফ টেকনোলজি অফিসার (সিটিও) সুমন আহমেদ সাবির এবং মাইক্রোসফটের সাবেক কর্মী মোঃ জামান।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে টেলিকম নীতিমালার দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে পরিবর্তনের উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলেন ফাইবার অ্যাট হোমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মইনুল হক সিদ্দিক। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৬ সালের আইএলডিটিএস নীতিমালার প্রায় দুই দশক পর নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালা চূড়ান্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নীতিমালা প্রণয়নে সরকার শিল্পের বাস্তবতা, বিভিন্ন অংশীজনের মতামত ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করছে। তিনি আইটি ও টেলিকম খাতকে পৃথক না ভেবে সমন্বিত নীতিমালার ওপর জোর দেন।

পরিকল্পিত অবকাঠামো ও সুরক্ষার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মইনুল সিদ্দিকী বলেন, "ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সাধারণত ১৫-২০ বছর কার্যকর থাকে। কিন্তু দেশে অবাধ প্রতিযোগিতার নামে একই এলাকায় বার বার নতুন নেটওয়ার্ক বসানো হচ্ছে। ফলে ছোট-বড় সব বিনিয়োগকারীর অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।" তিনি অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা থামিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগবান্ধব রেগুলেশনের দাবি জানান। এছাড়া তিনি বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক খাতগুলোতে সমান সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের ব্রডব্যান্ড খাতের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে ব্রডব্যান্ড গ্রাহকপ্রতি রাজস্ব (ARPU) ৩০ থেকে ৫০ ডলার হলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ৫ থেকে ১০ ডলার। এই সীমিত আয়ের মধ্যে ২০-২৫ এমবিপিএস থেকে দেশের প্রতি ঘরে ১০০ এমবিপিএস গতি পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন এক অর্থনৈতিক সমীকরণ। একই সাথে সাবমেরিন ক্যাবল থেকে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করলে দেশীয় গতি কমে যায়—এমন ধারণাকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে তিনি দেশের বিদ্যমান সক্ষমতার যথাযথ ব্যবহারের তাগিদ দেন।

আইটি উদ্যোক্তা মাইনুল ইসলাম তার বক্তব্যে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা সুনির্দিষ্ট করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, "আমাদের ফিক্সড ব্রডব্যান্ড নীতিমালায় কত কোটি পরিবারকে কত বছরের মধ্যে সংযোগ দেওয়া হবে, তার স্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা উচিত।" তিনি নীতিমালায় আইটি ও টেলিকমকে আলাদা করার সমালোচনা করে বলেন, সরকারের সঠিক রূপরেখা না থাকলে শুধু ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ দিয়ে ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।

টেকনোলজি সেশনে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল ও আইটিসির মাধ্যমে পর্যাপ্ত ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা রয়েছে মন্তব্য করে সুমন সাবির বলেন, বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করলে দেশের ইন্টারনেট ধীরগতির হয়ে যায়-এমন ধারণার বাস্তব ভিত্তি নেই। এজেন্য দেশের বিদ্যমান ও সম্প্রসারিত সক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার এবং নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আর ফাইভ-জির শতভাগ সুবিধা পেতে প্রতিটি টাওয়ার পর্যন্ত ফাইবার সংযোগ আবশ্যক। একই এলাকায় ১০টি আইএসপি আলাদা ১০টি লাইন না বসিয়ে একটি 'কমন বা শেয়ারড অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক' ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।  

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট টেনে মোঃ জামান বলেন, কোভিডের সময় যুক্তরাষ্ট্র যেমন হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করেছিল, তেমনি চীনও ২৫ বছর ধরে গুগলকে ঢুকতে দেয়নি। বৈশ্বিক ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সাইবার ও ক্লাউড প্রযুক্তিতে নিজস্ব বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পলাশী থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস টেনে জনসংখ্যার চেয়ে জনশক্তিকে কাজে লাগানো এবং প্রযুক্তিতেউ নিজেদের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।

এর আগে টিআরিএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জমান রবিন এবং সাধারণ সম্পদক ফারুক হোসাইন টেলিকম ও আইসিটি খাতের গণমাধ্যমকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত কর্মশালা আয়োজন এবং নীতিনির্ধারণী সংলাপ অব্যহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। 
//ডিবিটেক/এনএপি/এমআইএস//