বিইআরসি ও বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে নেই কোনো আবেদন; বিভ্রান্তিতে ৫৫ লাখ গ্রাহক

প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের খবর ‘গুজব’

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সময়ে প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ বা ভাড়া প্রত্যাহার করে নেওয়ার যে তথ্য সরকারি দল বিএনপির ফেসবুক পেজ থেকে প্রচার করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ একটি ‘অপপ্রচার’

প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের খবর ‘গুজব’
৫ জুলাই, ২০২৬ ০২:০১  

বিদ্যুৎ বিলের সাথে প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ বা ভাড়া প্রত্যাহার করে নেওয়ার খবরটি একটি অপপ্রচার বলে জানা গেছে। গত ৩ জুন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সময় সরকারি দল বিএনপির ফেসবুক পেজ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে সরকার প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। তবে বাস্তবে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে নিয়মিতই ভাড়া কাটা হচ্ছে।

রাজধানীর প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী গ্রাহকদের কাছ থেকে ৪ জুলাই বিকালেও মিটার রিচার্জের কাগজ যাচাই করে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। ডিপিডিসির গ্রাহক নাজিমুল ইসলাম এবং পশ্চিম ধানমন্ডির বাসিন্দা আমেনা মুক্তা জানান, বাস্তবে মিটার ভাড়া কাটা কোনোদিনই বন্ধ হয়নি। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৫৫ লাখ গ্রাহকের ঘরে প্রিপেইড মিটার রয়েছে, যেখানে সিঙ্গেল ফেইজ মিটারের ভাড়া ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেইজ মিটারের ভাড়া ৪২ টাকা। এর সাথে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য আবাসিক গ্রাহকদের ৪২ টাকা করে ডিমান্ড চার্জও দিতে হয় (যেমন: ৫ কিলোওয়াটের লাইনের জন্য ২ ২০১০ টাকা)। এই ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে এমনিতেই গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

ঢাকার বাইরেও গ্রাহকদের ভোগান্তি ও ক্ষোভ:

রাজধানীর পাশাপাশি ঢাকার বাইরে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকদের কাছ থেকেও প্রিপেইড মিটার নিয়ে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। নেসকো, ওজোপাডিকো এবং আরইবি (পল্লী বিদ্যুৎ)-এর আওতাধীন গ্রাহকদের অভিযোগ, রিচার্জ করার পর মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ কাটার ফলে মূল ব্যালেন্স থেকে বড় একটি অংশ কেটে নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সামান্য অবহেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, কার্ড রিচার্জের ক্ষেত্রে সার্ভার জটিলতা এবং ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স নেওয়ার পর দ্বিগুণ টাকা কাটার মতো বিষয়গুলো নিয়ে মফস্বল ও গ্রামীণ গ্রাহকদের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। সরকারি দলের এই প্রচারণার পর অনেকে ভেবেছিলেন এবার হয়তো স্বস্তি মিলবে, কিন্তু বাস্তবে আগের মতোই টাকা কাটতে থাকায় গ্রাহকদের বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ আরও বেড়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২৯ মার্চ বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর মিটার ভাড়া প্রত্যাহারের কথা জানানো হয়েছিল এবং সেই প্রতিশ্রুতিকে ঘিরেই এই অপপ্রচারের সূত্র তৈরি হয়। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, মিটার ভাড়া তুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো বিতরণ প্রতিষ্ঠান তাদের কাছে আবেদন করেনি এবং তারা নিজেরাও এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি জানান, ২০১৭ সালের একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই মিটার ভাড়া নেওয়া শুরু হয়, সরকার চাইলে প্রজ্ঞাপনটি বাদ দিয়ে এই ঋণের দায় নিজেরা নিয়ে ভাড়া কাটা বন্ধ করতে পারে।

বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, প্রিপেইড মিটারের প্রকল্পগুলো ঋণের অর্থে বাস্তবায়িত হয়েছে, যা এই মিটার ভাড়া থেকেই পরিশোধ করা হয়। দেশের ৫৫ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে সিঙ্গেল ফেইজ হিসাব করলেও মাসে ২২ কোটি টাকা এবং বছরে ২৬৪ কোটি টাকা মিটার ভাড়া বাবদ আদায় হয়। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া এই ভাড়া প্রত্যাহারের political বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। বিতরণ সূত্র বলছে, মিটার ভাড়া বা ডিমান্ড চার্জের কোনো একটি বাদ দিতে গেলে সেই অর্থ গ্রাহকের কাছ থেকে অন্য উপায়ে আদায় করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না, অথবা সরকারকে এই ঋণের দায় নিতে হবে।

//ডিবিটেক/এসআই/এমআই//