এআই যুগের ইন্টারনেট শাসন নিয়ে বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামে

দেশে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় গুরুত্ব

  • বিটিআরসি ভবনে শুরু তিন দিনব্যাপী ২১তম বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম
  • ১২টি অধিবেশনে অংশ নেবেন দুই শতাধিক প্রতিনিধি
  • আলোচনায় থাকছে এআই নীতি, ডেটা গভর্ন্যান্স ও সাইবার নিরাপত্তা

দেশে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় গুরুত্ব
১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:৪১  

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে নিরাপদ ইন্টারনেট, মানসম্মত বাংলা ডিজিটাল কনটেন্ট এবং প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্ব দিয়ে শুরু হয়েছে ২১তম বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম ২০২৬। তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনে ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনা, এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ভবনে ফোরামের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.)।

বিটিআরসি ও বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের (বিআইজিএফ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে ১২টি অধিবেশনে নীতিনির্ধারক, টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীসহ দুই শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেবেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.) বলেন, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে শুরুর দিকে ভয়েস কলের সংযোগ নিশ্চিত করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। সময়ের সঙ্গে ভয়েস থেকে ডেটা এবং সেখান থেকে দেশ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। এআইয়ের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান কর্মপ্রবাহ ও পরিচালন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন।

গত তিন দশকে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও সেগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে মানুষকে অনলাইনে যুক্ত করা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে সক্ষম করে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ভাষা রয়েছে, যার মধ্যে বাংলা বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ভাষা। অথচ ইন্টারনেটের মোট কনটেন্টের মধ্যে বাংলার অংশ প্রায় ০.১ শতাংশ। অনলাইনে বাংলা ভাষার কনটেন্টের এই স্বল্পতা দূর করতে আরও মানসম্মত বাংলা কনটেন্ট, ডিজিটাল সেবা ও এআইভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী শিক্ষা, পেশা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইন্টারনেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারলেই অর্থবহ সংযোগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ফোরামে বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ খলিল উর রহমান (অব.) জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সংবেদনশীল তথ্য ও অত্যাবশ্যকীয় সেবা সুরক্ষায় জাতীয় সাইবার নিরাপত্তার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরেন। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কৌশলের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঘটনা মোকাবিলা ও সমন্বয়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, আইনগত ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো, দক্ষ জনবল উন্নয়ন ও শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ডিপফেক ও স্বয়ংক্রিয় ফিশিংসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সাইবার হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেন তিনি।

সিঙ্গাপুর থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের (এপনিক) সিনিয়র অ্যাডভাইজার জয়েস চেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব তুলে ধরেন। অনলাইন নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে জাতিসংঘের ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম সচিবালয়ের ডিজিটাল নীতি ও নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ আনজা গেঙ্গো শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাইবার বুলিং প্রতিরোধ এবং ডিজিটাল পরিসরে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ ছাড়া ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ ড. মো. মুঞ্জুর ই খোদা তরফদার অনলাইন প্রতারণা, তরুণদের ওপর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সামাজিক প্রভাব এবং শহর ও গ্রামের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করেন। ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

স্বাগত বক্তব্যে জাতিসংঘের তথ্য সমাজবিষয়ক গ্রুপের মাল্টি-স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন গ্রুপের সদস্য এ. এইচ. এম. বজলুর রহমান নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবকেন্দ্রিক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, কার্যকর ইন্টারনেট গভর্ন্যান্সের জন্য মানবাধিকার সমুন্নত রাখা, নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলমান এ ফোরামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, ডেটা গভর্ন্যান্স, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, টেকসই উন্নয়ন ও ডিজিটাল গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। সরকার, শিল্পখাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করে বাংলাদেশের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও সহনশীল ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলাই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।

//ডিবিটেক/এআরটি/এসএমপি/ওইএম//