আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণে চুক্তি স্বাক্ষর
বিমানের বহরে যুক্ত হচ্ছে ১০টি নতুন এয়ারবাস
- বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এয়ারবাস থেকে ১০টি নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
- চুক্তিতে চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি এ৩২১নিও সিঙ্গেল-আইল উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
- নতুন সংযোজন বিমানের জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, রুট সম্প্রসারণ ও যাত্রীসেবার মান উন্নত করবে।
আকাশপথে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়াতে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতাসংস্থা এয়ারবাস থেকে ১০টি নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
৭ অক্টোবর, বুধবার রাতে ঢাকার রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে এই ক্রয়চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আধুনিক অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও অ্যাভিয়েশন প্রযুক্তিনির্ভর এই ১০টি উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে চারটি দীর্ঘপাল্লার এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি আঞ্চলিক ও মাঝারি পাল্লার এ৩২১নিও সিঙ্গেল-আইল এয়ারক্রাফট। নতুন প্রযুক্তির এসব উড়োজাহাজ ২০৩৩ সাল থেকে ধাপে ধাপে বিমানের বহরে যুক্ত হয়ে দেশের এভিয়েশন খাতে নতুন সাই-টেক যুগের সূচনা করবে।
চুক্তিতে এয়ারবাস ইন্ডিয়া অ্যান্ড সাউথ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুর্গেন ওয়েস্টারমেয়ার এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান রুমী এ মাহমুদ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সই করেন।
বিমানের বহর আধুনিকায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির কৌশলের ক্ষেত্রে এ চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে কর্তৃপক্ষ। বিমান জানিয়েছে, নতুন উড়োজাহাজগুলো উন্নত ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির হওয়ায় দীর্ঘপাল্লার ও আঞ্চলিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন বৈশ্বিক রুট চালু, বিদ্যমান রুট নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। যাত্রীসেবার মান উন্নয়নেও এসব আধুনিক উড়োজাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রাশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, এ উদ্যোগ শুধু উড়োজাহাজ কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশকে একটি আধুনিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তরের বৃহত্তর লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিমানের বহর, রুট নেটওয়ার্ক ও পরিচালন সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা হবে। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ যাত্রী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে পরিবহন করা হয় এবং বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রী অন্য এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যাতায়াত করেন। তাই দেশের নাগরিকদের আন্তর্জাতিক গন্তব্যে আরও বেশি পরিবহন করতে বিমানের নিজস্ব বহর বাড়ানো ও আধুনিকায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। এয়ারবাসের নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ বিমানের জন্য এমন একটি বহর গড়ে তুলতে সহায়তা করবে, যা বিভিন্ন রুটের চাহিদা ও যাত্রীসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করা যাবে। বর্তমানে উড়োজাহাজের স্বল্পতার কারণে যাত্রীদের চাহিদা পূরণে বিমানকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে মন্ত্রী জানান, নতুন এয়ারবাস বিমানের বহরকে শক্তিশালী করবে, তবে শুধু উড়োজাহাজ দিয়ে একটি এয়ারলাইনকে ভালো করা সম্ভব নয়। বিমানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কর্মীদের পেশাদারত্ব, শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধের ওপর। প্রতিটি যাত্রীকে সেবা দেওয়া, প্রতিটি ফ্লাইট পরিচালনা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি জড়িত। তাই বিমানে নিরাপত্তা, দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা, সততা ও উৎকর্ষের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করে জানান, চলতি বছরই অন্তত একটি এয়ারবাস বাংলাদেশে এসে পৌঁছাবে।
বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমী এ মাহমুদ জানান, দেশের বড় জনগোষ্ঠী এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশির সঙ্গে শক্তিশালী বৈশ্বিক যোগাযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এ বাস্তবতায় বিমানের বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনাকে তিনি বাস্তবসম্মত উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন।
এয়ারবাসের নির্বাহী সহসভাপতি মনোয়া দ্য সাঁ-এক্সুপেরি লিখিত ও ভিডিও বার্তার সূত্রে জানান, এ৩৫০ ও এ৩২১নিও-এর সমন্বয়ে বিমানের জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি বহর কৌশল তৈরি হবে। এর মাধ্যমে নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সম্প্রসারণ এবং বাড়তে থাকা যাত্রী চাহিদা পূরণে এয়ারবাসের উড়োজাহাজগুলো সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি দলের প্রধান মাইকেল মিলার জানান, এয়ারবাস কেনার চুক্তি বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করবে। এয়ারবাস বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিফলন। তিনি আরও জানান, এয়ারবাস কেনার চুক্তিতে স্বাক্ষর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা কৌশলগত বাণিজ্যিক অগ্রগতি নিশ্চিত করবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিক, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এমডি কাইজার সোহেল আহমেদ। এ সময় ভিডিও বার্তায় বক্তব্য দেন এয়ারবাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গিয়োম ফোরি।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানের বহর আধুনিকায়নের সুফল যাত্রী, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য উন্নত আকাশ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে কাজে লাগানো হবে। উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বর্তমানে ঢাকা থেকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে যাত্রী ও কার্গো পরিবহন সেবা পরিচালনা করে আসছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ।
//ডিবিটেক/ডিডিআর/বিপিও/এমআইএস//





