মহাকাশে অল্পের জন্য রক্ষা
ভারতীয় বর্জ্যের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াল বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১
- মাত্র ৮৫২ মিটার দূরত্বে চলে আসা ভারতীয় বর্জ্য এড়িয়ে বিএস-১ অক্ষত রেখেছে প্রকৌশলীরা
- নিজস্ব দক্ষ পরিচালনায় জ্বালানি সাশ্রয় হওয়ায় স্যাটেলাইটের মেয়াদ অতিরিক্ত ১৭ মাস বাড়ল
- ভবিষ্যতে কক্ষপথ সুরক্ষায় প্রকৌশলীদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিএসসিএল
মহাকাশের চরম প্রতিকূল ভূস্থির কক্ষপথে নিখুঁত গাণিতিক কৌশলে এক ভয়াবহ মহাজাগতিক সংঘর্ষ এড়িয়ে অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’ (বিএস-১)। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তাৎক্ষণিক জরুরি সতর্কবার্তায় ভারতের একটি অকেজো উপগ্রহের দ্রুতগতির ভগ্নাংশের (স্পেস ডেব্রিস) মুখোমুখি আঘাত থেকে দেশীয় প্রকৌশলীদের পরিচালনায় অল্পের জন্য রক্ষা পায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ। একই সঙ্গে এর জীবনকাল বেড়েছে ১৭ মাস।
প্রাপ্ত তথ্যে প্রকাশ, মহাকাশে মধ্যাকর্ষণ ও বিপরীত ঊর্ধ্বমুখী বলের ভারসাম্যের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারানো বিভিন্ন মহাকাশযানের হাজারো ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। গত আগস্ট মাসে নাসার ‘স্পেস ট্র্যাকার’ থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত বিএসসিএলের মূল গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে অতিজরুরি সংকেত আসে। বার্তায় জানানো হয়, ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপিত এবং গত ৬ সেপ্টেম্বর যান্ত্রিক ত্রুটি ও জ্বালানি সংকটে অকেজো হয়ে যাওয়া ভারতের প্রথম প্রজন্মের যোগাযোগ উপগ্রহ ‘ইনস্যাট-১এ’–এর একটি দ্রুতগতির ধ্বংসাবশেষ বিএস-১-এর গতিপথের দিকে ধেয়ে আসছে। পরবর্তী ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এটি বাংলাদেশি কৃত্রিম উপগ্রহটির মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে আসার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়।
চুক্তি অনুযায়ী নাসা প্রতি দুই ঘণ্টা পর পর বিএস-১-এর নিরাপত্তাসম্পর্কিত তথ্য হালনাগাদ পাঠালেও ওই বার্তাটি ছিল চূড়ান্ত সতর্কতামূলক। এর আগে ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মহাকাশে রাশিয়ার অকেজো স্যাটেলাইট ‘কসমস-২২৫১’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সচল ‘ইরিডিয়াম-৩৩’-এর মধ্যে সংঘর্ষে দুটি মহাকাশযানই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ফলে বিএস-১-কে ঘিরে তৈরি হয় অস্তিত্বের লড়াই।
সংকটকালীন পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান জানান, নাসার বার্তা আসার পরপরই জয়দেবপুর গ্রাউন্ড স্টেশনের ৫০ জনের বেশি কর্মীর ছুটি বাতিল করে ২৪ ঘণ্টা নিবিড় তদারকি শুরু হয়। টানা চার দিন ধরে চলা এই অভিযানে দুই দিন তিনি সরাসরি গাজীপুরের প্রকৌশল দলের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসাদ সার্বক্ষণিক ভার্চুয়ালি যুক্ত থেকে প্রকৌশল দলকে দিকনির্দেশনা দেন।
চরম উত্তেজনাকর সেই মুহূর্তের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান জানান, সময় ছিল খুবই সীমিত। আঘাত এড়াতে বিএস-১-কে সামনে-পেছনে বা ডানে সরানোর কোনো সুযোগ ছিল না। আবার বাঁয়ে সরাতে গেলে অন্য একটি সক্রিয় স্যাটেলাইটের বিপজ্জনক সান্নিধ্যে চলে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। ফলে স্যাটেলাইট স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল। শেষ পর্যন্ত সময় যত ঘনিয়ে আসছিল, ধ্বংসাবশেষটি আরও কাছে চলে আসায় দেশীয় প্রকৌশলীরা চরম সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে বিএস-১-কে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সামান্য বাঁয়ে সরিয়ে নেন এবং মহাকাশ বর্জ্যটি অতিক্রম করা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। মহাকাশ বর্জ্যটি মাত্র ৮৫২ মিটার দূর দিয়ে উপগ্রহটিকে অতিক্রম করে যাওয়ার পর বিএস-১-কে নিরাপদে পূর্বের নির্ধারিত অরবিটাল স্লটে (১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে) ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় স্যাটেলাইটের কোনো ক্ষতি হয়নি।
আট বছর বয়সী এই স্যাটেলাইট আগামীতে এমন আরও মহাকাশ বর্জ্যের মুখোমুখি হতে পারে উল্লেখ করে ডিজিবাংলা’র এক প্রশ্নের জবাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘‘ইতিমধ্যেই আমাদের প্রকৌশলীরা বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে। তবে তাদের আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে এই দক্ষ প্রকৌশলীদের অ্যাডভান্স ট্রেনিং দেওয়া হবে। সাধারণ প্রকৌশলীরাও যেন স্যাটেলাইটের অবস্থান নিখুঁতভাবে সামনে-পেছনে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, সেজন্য তাদেরও এই বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।’’
বিএসসিএল সূত্র জানায়, কক্ষপথে বিএস-১-এর এমন ঝুঁকির মুখে পড়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০২১ সালে রাশিয়ার একটি অকেজো কৃত্রিম উপগ্রহের ধ্বংসাবশেষ এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সচল কৃত্রিম উপগ্রহ বিপজ্জনক দূরত্বে চলে এসেছিল। তবে এবারের সফল পদক্ষেপে উপগ্রহটির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিএসসিএলের মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন) শাহ আহমেদুল কবির জানান, প্রকৌশলীদের অত্যন্ত হিসাবি ও দক্ষ পরিচালনার ফলে স্থানান্তরের সময় স্যাটেলাইটের জ্বালানি অপচয় রোধ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে বিদ্যমান জ্বালানি দিয়েই বিএস-১ অতিরিক্ত ১৭ মাস কার্যকর রাখা যাবে, যা স্যাটেলাইটটির সামগ্রিক জীবনকাল বাড়িয়ে দিয়েছে।
মহাকাশ বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. খলিলুর রহমান জানান, মহাকাশে কোনো বস্তু দ্রুতগতিতে কাছে চলে এলে স্যাটেলাইটের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করে সংঘর্ষ এড়ানো একটি সর্বোচ্চ স্তরের কারিগরি দক্ষতার বিষয়। দেশীয় প্রকৌশলীরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এই সাফল্য অর্জন করায় তা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মানে প্রশংসার দাবিদার।
ফ্রান্সের থালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের নির্মিত এই উপগ্রহটি ২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ ব্লক ৫ রকেটের মাধ্যমে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। শুরুতে ফরাসি কোম্পানি যৌথভাবে বিদেশি গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে এটি তদারকি করলেও ২০২১ সাল থেকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব বুঝে নেয় বিএসসিএল। ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১৫ থেকে ১৮ বছর মেয়াদি এই কৃত্রিম উপগ্রহে রয়েছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার (২০টি অভ্যন্তরীণ ও ২০টি আন্তর্জাতিক ব্যবহারের জন্য)। দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর নিরবচ্ছিন্ন সম্প্রচার, দুর্গম অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জরুরি টেলিযোগাযোগ অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য জাতীয় প্রযুক্তি অবকাঠামো হিসেবে এটি কাজ করছে।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমপি/বিপিও//





