ক্যান্সার রোগীদের টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ

বিএমইউতে ক্যান্সার ও লিম্ফেডিমা পুনর্বাসন কর্মশালা অনুষ্ঠিত

  • বিএমইউতে ক্যান্সার-পরবর্তী লিম্ফেডিমা চিকিৎসায় দিনব্যাপী হাতে-কলমে আধুনিক টেকসই পুনর্বাসন কর্মশালা অনুষ্ঠিত।
  • চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে তুরস্কের সহযোগিতায় ফেলোশিপ ও স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের প্রস্তাব গ্রহণ।
  • বিএমইউতে অঙ্গভিত্তিক ক্যান্সার চিকিৎসা এবং যৌথ ক্লিনিক চালু করার গুরুত্ব প্রকাশ।

বিএমইউতে ক্যান্সার ও লিম্ফেডিমা পুনর্বাসন কর্মশালা অনুষ্ঠিত
১ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:০৭  

ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা-পরবর্তী শারীরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক যত্ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মেডিকেল Университеটিতে (বিএমইউ) ‘ক্যান্সার অ্যান্ড লিম্ফিডিমা রিহ্যাবিলিটেশন’ শীর্ষক দিনব্যাপী হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএমইউর শহীদ ডা. মিলন হলে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সোসাইটি অব ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন (বিএসপিএমআর) এবং বিএমইউর ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে। তরুণ চিকিৎসকদের বিশ্বমানের বায়োমেডিকেল প্রযুক্তি ও আধুনিক ক্লিনিক্যাল কৌশলে দক্ষ করে তুলতে অনুষ্ঠানটি সাই-টেক-ফার্স্ট মেথডোলজিতে পরিচালিত হয়।

বিএসপিএমআরের এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মো. তছলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম জানান, লিম্ফেডিমা ম্যানেজমেন্টের ওপর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা ক্যান্সার রোগীদের, বিশেষ করে স্তন ক্যান্সারের অস্ত্রোপচারের পর সৃষ্ট জটিলতা ও লিম্ফেডিমা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আমরা এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে পারলে রোগীদের আরোগ্য প্রক্রিয়া আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে এবং তাদের পরিচর্যা ও চিকিৎসা সহজতর হবে। তিনি আশা প্রকাশ করে জানান, তুরস্ক ও বাংলাদেশের মধ্যকার এ ধরনের বিনিময় কর্মসূচি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। দেশের বাইরের জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে আমাদের চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে তারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ ধরনের সহযোগিতার জন্য আমরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।

তিনি তুরস্কের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে আশা করে আরও বলেন, একইভাবে আমাদের তরুণ চিকিৎসকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য তুরস্কে পাঠানোর সুযোগও তৈরি করা যেতে পারে। অধ্যাপক পিনার বোরমনকে আবারও অনুরোধ করব, আমাদের তরুণ শিক্ষকদের ক্যান্সার-সম্পর্কিত লিম্ফেডিমার ওপর স্বল্পমেয়াদি ফেলোশিপ বা প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিতে। তিনি বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ। বিভাগটি যাতে প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আরও শক্তিশালীভাবে গড়ে উঠতে পারে, সেজন্য আমরা সবসময় সহযোগিতা করে আসছি। আমাদের প্রশাসনও এ বিভাগের বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। বর্তমানে জায়গার কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো পূর্ণাঙ্গ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে বিভাগটিকে আরও সম্প্রসারিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএমইউর মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ জানান, পুনর্বাসন রোগ ব্যবস্থাপনার একটি অংশ। এটি চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিষয়টি অবহেলিত থেকে যায়। তাই এ ধরনের কার্যক্রম শুরু করার জন্য আমি ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সোসাইটিকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। গতকাল আমাদের একটি ফ্যাকাল্টি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগটি এই ফ্যাকাল্টি অধীন। ওই সভায় আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্গভিত্তিক ক্যান্সার চিকিৎসা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব করেছি। আমি মনে করি, ক্যান্সার রোগীদের জন্য অঙ্গভিত্তিক চিকিৎসা চালু করতে পারলে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে। দেশের অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় এটি একটি নতুন যুগের সূচনা করবে।

অনুষ্ঠানে বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসাইন জানান, ক্যান্সার ও পুনর্বাসন বিষয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। বিশেষ করে লিম্ফেডিমা একটি বড় সমস্যা। এর অন্যতম জটিলতা হলো অপরিবর্তনীয়তা। একবার লিম্ফেডিমা দেখা দিলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। তাই অস্ত্রোপচারের পর প্রথম দিন থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। স্তন ক্যান্সারের রোগীদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে অস্ত্রোপচার ও রেডিয়েশন থেরাপির পর। মাস্টেকটমি ও রেডিয়েশন থেরাপির পরও লিম্ফেডিমা হতে পারে। ভারতের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৩ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে দুই বছরের মধ্যে এ ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। সার্বিকভাবে প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ রোগী এ সমস্যায় ভুগে থাকেন। ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের পক্ষ থেকে আমার একটি প্রস্তাব রয়েছে। আমরা প্রতি মাসে ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে একটি ক্লিনিক পরিচালনা করতে পারি। কারণ আমাদের কাছে অনেক রোগী আসেন, যারা নানা ধরনের শারীরিক কষ্টে ভুগেন। যৌথভাবে এমন একটি ক্লিনিক পরিচালনা করা হলে তা রোগীদের জন্য আরও কার্যকর ও উপকারী হবে।

এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ডা. এ. কে. এম. মতিউর রহমান ভূঁইয়া, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল, পেইন মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও ডিভিশন হেড ডা. এ. কে. এম. আখতারুজ্জামান, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন এবং বিএমইউর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. ইরতেকা রহমান।

কর্মশালায় ক্যান্সার পুনর্বাসনের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা, ক্যান্সারজনিত ব্যথা ব্যবস্থাপনা, ক্যান্সারে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ভূমিকা, রোগীর মূল্যায়ন প্রোটোকল ও পুনর্বাসন কৌশল নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি কর্মশালায় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ সেশন পরিচালনা করেন আঙ্কারা মেডিপল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডা. পিনার বর্মন। এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা ক্যান্সার ও লিম্ফেডিমা পুনর্বাসনের বিভিন্ন ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

কর্মশালার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেশনে ‘হোলিস্টিক ক্যান্সার কেয়ার থ্রু ইন্টারডিসিপ্লিনারি কোল্যাবোরেশন’ বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সমন্বিত ভূমিকা এবং রোগীকেন্দ্রিক পুনর্বাসন সেবার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ডা. মো. নাদিম কামাল। কর্মশালার সঞ্চালনায় দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক ডা. ফাতেমা নেওয়াজ এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন বক্তব্য প্রদান করেন ডা. এম. এ. কে. আজাদ।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ক্যান্সারের চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর শারীরিক সক্ষমতা, দৈনন্দিন কার্যক্রম, স্বাধীনতা এবং জীবনমান উন্নয়নে পুনর্বাসন সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্যান্সার-পরবর্তী জটিলতা ও লিম্ফিডিমা ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পুনর্বাসন সেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আছে। এই ব্যবহারিক কর্মশালার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা ক্যান্সার ও লিম্ফেডিমা পুনর্বাসনের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ক্যান্সার পুনর্বাসন সেবার মানোন্নয়ন এবং আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা জোরদারে কর্মশালাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে গণমাধ্যমকর্মীদের জানানো হয়।

//ডিবিটেক/বিএমও/এসএমপি/এমআইএসটি//