প্রথমবার স্বাধীন যাচাইয়ে উঠে এলো জাতীয় নেটওয়ার্ক চিত্র

জিপি-বাংলালিংকের দাপটে টেলিটক পিছিয়ে

  • বাংলালিংক ও গ্রামীণফোন জেলা পর্যায়ে সব কেপিআইয়ে শতভাগ কমপ্লায়েন্ট।
  • রবির ভয়েস মান ভালো, তবে ফোরজি গতিতে পিছিয়ে।
  • ডেটা ঘাটতি ও VoLTE অনুপস্থিতিতে টেলিটক সবচেয়ে দুর্বল।

জিপি-বাংলালিংকের দাপটে টেলিটক পিছিয়ে
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:৪৪  

দেশের সেলুলার মোবাইল নেটওয়ার্কের সেবার মান বা কোয়ালিটি অব সার্ভিস (QoS) নিয়ে জুলাই ২০২৬-এর বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম অপারেটরদের জমা দেওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই, পর্যালোচনা ও সমন্বয় করে জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ত্রিমাত্রিক মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে কমিশন।

বিটিআরসির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভয়েস কল ও ফোরজি ডেটা পারফরম্যান্সে বেসরকারি তিন অপারেটর গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও রবি একে অপরের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতায় রয়েছে। তবে ফোরজি ডেটা স্পিড, সেশন ড্রপ ও কমপ্লায়েন্সে সামান্য ব্যবধানে বাংলালিংক ও গ্রামীণফোন এগিয়ে। অন্যদিকে আধুনিক ভিওএলটিই প্রযুক্তির অনুপস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ কেপিআইয়ে ডেটা ঘাটতি এবং অসম্পূর্ণ কাঁচা/বাইনারি ফাইল জমা দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

 জাতীয় পর্যায়ে কে কোথায় 

বিটিআরসির নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ের প্রধান সূচকে চার অপারেটরের চিত্র হলো—

কেপিআই বিটিআরসি নির্ধারিত মান বাংলালিংক গ্রামীণফোন রবি টেলিটক*
২জি কল ড্রপ ≤ ১.০০% ০.৩৫৬৬% ০.৩২৯৮% ০.২৪০৫% ০.৪৭৯৬%
২জি কল সেটআপ সাফল্য ≥ ৯৯.০০% ৯৯.৭২৭০% ৯৯.৬৩২৩% ৯৯.২৮৭৭% ৯৯.২৯৮১%
৪জি গড় ডাউনলোড স্পিড ≥ ৩.৫০ Mbps ৮.৬০৭০ Mbps ৮.২২৬৪ Mbps ৬.৮৪৭৭ Mbps ১১.২০০০ Mbps
৪জি ডেটা সেশন ড্রপ ≤ ০.৫০% ০.০৯১১% ০.১৪২৩% ০.২৪৬২% ০.৬৪৩১% (ব্যর্থ)
৪জি RRC সংযোগ সাফল্য ≥ ৯৯.০০% ৯৯.৮৪২২% ৯৯.৮৩৪৫% ৯৯.৮৬৯৫% ৯৮.৪৯০৪% (ব্যর্থ)
VoLTE কল সেটআপ সাফল্য ≥ ৯৯.০০% ৯৯.৯২০৮% ৯৯.৭৩২০% ৯৯.৬৫৪৯% তথ্য নেই/প্রযোজ্য নয়
VoLTE কল ড্রপ ≤ ০.৫০% ০.০৭৩২% ০.৩৮১৪% ০.১৩৪৮% তথ্য নেই/প্রযোজ্য নয়
কম্বাইন্ড VoLTE+GSM ভয়েস ড্রপ ≤ ১.০০% ০.২৯১৫% ০.৩৪৭৮% ০.২১১৫% তথ্য নেই/প্রযোজ্য নয়
কম্বাইন্ড ভয়েস সেটআপ সাফল্য ≥ ৯৯.০০% ৯৯.৭৬২৫% ৯৯.৬৬৬৯% ৯৯.৫৯৬৪% তথ্য নেই/প্রযোজ্য নয়
CSFB সাফল্য ≥ ৯৮.০০% ৯৯.১৮৫৬% ৯৮.৬৪৫৩% ৯৮.৮৯৪২% ৯৯.৬৩৭৭%
SMS ডেলিভারি সাফল্য ≥ ৯৮.০০% ৯৯.৮০৮৬% ৯৯.৬২১১% ৯৮.৭৪৯৫% তথ্য নেই/প্রযোজ্য নয়

* টেলিটকের ক্ষেত্রে বিটিআরসির মনিটরিং সিস্টেমে কাঁচা/বাইনারি ফাইল অসম্পূর্ণ থাকায় কমিশন তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তাই টেলিটকের ক্ষেত্রে অপারেটর ঘোষিত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

 বাংলালিংক এগিয়ে ডেটা পারফরম্যান্সে 

জাতীয় পর্যায়ে ৪জি গড় ডাউনলোড স্পিডে চার অপারেটরের মধ্যে বেসরকারি অপারেটরদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলালিংক। তাদের গড় ডাউনলোড স্পিড ৮.৬০৭০ Mbps। ৪জি ইন্টারনেট সেশন ড্রপ বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার হারও সবচেয়ে কম, ০.০৯১১%।

VoLTE কল সেটআপ সাফল্যের ক্ষেত্রেও বাংলালিংক ৯৯.৯২০৮% নিয়ে এগিয়ে। জেলা পর্যায়ে ৬৪টি জেলার সবগুলোতেই তাদের প্রধান কেপিআই শতভাগ কমপ্লায়েন্ট।

উপজেলা পর্যায়ে নেটওয়ার্ক থাকা ৫৩৮টি উপজেলার সবকটিতে কল ড্রপ, কল সেটআপ ও ৪জি RRC মান পূরণ করেছে বাংলালিংক। তবে বান্দরবানের রুমা ও থানচি এবং রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল ও জুরাছড়িসহ ছয়টি দুর্গম উপজেলায় বাংলালিংকের কোনো সেবা সচল ছিল না।

 জিপির জেলা পর্যায়ে শতভাগ কমপ্লায়েন্স 

ফোরজি গড় ডাউনলোড স্পিডে ৮.২২৬৪ Mbps নিয়ে বাংলালিংকের পরেই রয়েছে গ্রামীণফোন। জেলা পর্যায়ে ৬৪টি জেলার সবকটিতে প্রধান কেপিআইয়ে শতভাগ কমপ্লায়েন্স দেখিয়েছে অপারেটরটি।

উপজেলা পর্যায়ে ৫৩৯টির মধ্যে ৫৩৭টিতে ২জি কল ড্রপ এবং ৫৩৮টিতে কল সেটআপের নির্ধারিত মান পূরণ করেছে গ্রামীণফোন। তবে দুর্গম পাঁচটি উপজেলায় তাদের সেবা অনুপস্থিত ছিল এবং একটি উপজেলায় শুধু ২জি সেবা পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া তিনটি উপজেলায় ভয়েস কম্বাইন্ড অস্বাভাবিক কল রিলিজের হার কিছুটা বেশি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 ভয়েসে সেরা রবি, স্পিডে পিছিয়ে 

জাতীয় পর্যায়ে ভয়েস কলের নিরিখে সবচেয়ে কম ২জি কল ড্রপ হার দেখিয়েছে রবি। তাদের কল ড্রপ হার ০.২৪০৫% এবং কম্বাইন্ড ভয়েস ড্রপ হার ০.২১১৫%।

তবে ফোরজি ডাউনলোড স্পিডে রবি প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে। তাদের গড় গতি ৬.৮৪৭৭ Mbps।

জেলা পর্যায়ে ৬৪টির মধ্যে ৬১টিতে ২জি কল সেটআপ সাফল্যের নির্ধারিত মান অর্জন করেছে রবি। তিনটি জেলায় এ সূচকে তারা ব্যর্থ হয়েছে। অন্যান্য প্রধান সূচকে জেলা পর্যায়ে তাদের কমপ্লায়েন্স শতভাগ।

উপজেলা পর্যায়ে ৫৪৪টি উপজেলায় কার্যক্রম চালানো রবি কল ড্রপ ও RRC মান পূরণ করলেও ২৪টি উপজেলায় ২জি কল সেটআপ সাফল্যের নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারেনি। অর্থাৎ এ সূচকে ৫২০টি উপজেলা কমপ্লায়েন্ট।

প্রতিবেদনের বিশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রবির প্রায় ৪১ হাজার ৮১৯টি সেলের কাঁচা বাইনারি ডেটা বিটিআরসি সাত দিনের ডেটা রিটেনশন মেয়াদের কারণে যাচাই করতে পারেনি। ফলে কমিশন রবির প্রসেসড ডেটার ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ হিসাব করেছে। আগামী মাস থেকে এ তথ্য প্রতিদিন যাচাই করার আশ্বাস দিয়েছে বিটিআরসি।

 ডেটা ঘাটতিতে সবচেয়ে পিছিয়ে টেলিটক 

সেবার মানের জাতীয় মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের ক্ষেত্রে। অপারেটরটি জাতীয় পর্যায়ে ফোরজি ডাউনলোড স্পিড ১১.২ Mbps দাবি করেছে, যা অন্য তিন অপারেটরের চেয়ে বেশি। কিন্তু এ তথ্য বিটিআরসি মনিটরিংয়ের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

কারণ, টেলিটকের কাঁচা/বাইনারি ফাইল অসম্পূর্ণ ছিল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সূচকে কমিশন মনিটরিং ভ্যালু নির্ধারণ করতে পারেনি।

ফোরজি RRC সংযোগ সাফল্যের ক্ষেত্রে টেলিটকের জাতীয় হার ৯৮.৪৯০৪%, যা নির্ধারিত ৯৯% মানের নিচে। জেলা পর্যায়ে ৬৪টির মধ্যে মাত্র ১২টি জেলায় এ সূচকে টেলিটক কমপ্লায়েন্ট; ৫২টি জেলায় নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারেনি।

উপজেলা পর্যায়েও একই চিত্র। ৫৪২টি উপজেলার মধ্যে ২জি কল ড্রপে ৯২টি উপজেলা ব্যর্থ হয়েছে। ফোরজি RRC সাফল্যের ক্ষেত্রে ৫৩৭টি উপজেলার মধ্যে ৪০১টিতে নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারেনি টেলিটক। অর্থাৎ মাত্র ১৩৬টি উপজেলা কমপ্লায়েন্ট।

এ ছাড়া মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, পঞ্চগড়ের আটোয়ারী, ভোলার কিছু অংশ এবং শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে টেলিটকের ফোরজি সেবা পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল।

আধুনিক ভিওএলটিই প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও টেলিটকের কোনো কার্যক্রম বা যাচাইযোগ্য তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

 জেলা-উপজেলায় বড় পার্থক্য 

জেলা পর্যায়ের মূল্যায়নে বাংলালিংক ও গ্রামীণফোন সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। উভয় অপারেটরই ৬৪টি জেলার প্রতিটিতে ২জি ভয়েস ড্রপ, কল সেটআপ, ৪জি ডাউনলোড স্পিড, RRC এবং কম্বাইন্ড ভয়েসের প্রধান কেপিআইয়ে শতভাগ কমপ্লায়েন্ট।

রবি ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১টিতে ২জি কল সেটআপ সাফল্যের মান পূরণ করেছে। অন্যদিকে টেলিটকের ২জি কল ড্রপে ৬৪ জেলার ৫৮টি এবং RRC সাফল্যে মাত্র ১২টি জেলা কমপ্লায়েন্ট।

উপজেলা পর্যায়ে নেটওয়ার্কের আওতা ও মানের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। বাংলালিংক ও গ্রামীণফোনের কিছু দুর্গম এলাকায় নেটওয়ার্ক অনুপস্থিত থাকলেও যেখানে তাদের সেবা রয়েছে, সেখানে প্রধান কেপিআইয়ের কমপ্লায়েন্স শক্তিশালী।

রবির ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হলেও ২৪টি উপজেলায় ২জি কল সেটআপ সাফল্যের মান পূরণ হয়নি। টেলিটকের ক্ষেত্রে ৪জি RRC সাফল্যে ৫৩৭টির মধ্যে ৪০১টি উপজেলা ব্যর্থ হওয়ায় নেটওয়ার্ক মানের বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে।

 প্রথমবার স্বাধীন যাচাইয়ে কঠোর নজরদারি 

বিটিআরসি মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আলম পারভেজ জানান, আগে অপারেটরদের পাঠানো অযাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতেই মূলত জাতীয় পর্যায়ের QoS প্রতিবেদন তৈরি করা হতো। এবার প্রথমবারের মতো ড্রাইভ টেস্ট ও সিস্টেম ভেরিফিকেশনের সমন্বয়ে জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নেটওয়ার্কের দুর্বল এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনে চিহ্নিত দুর্বল নেটওয়ার্ক এলাকাগুলোতে অপারেটরদের জরুরি ভিত্তিতে ড্রাইভ টেস্ট পরিচালনা এবং নেটওয়ার্ক অপটিমাইজেশন নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।একই সঙ্গে পরবর্তী মাসগুলো থেকে প্রাথমিক (র) ডেটা ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনা এবং QoS প্রতিবেদন আরও কঠোরভাবে প্রণয়নের কথা জানিয়েছে বিটিআরসি।

ফলে জুলাইয়ের এই প্রতিবেদন শুধু অপারেটরদের ঘোষিত সেবার মানের তুলনামূলক চিত্র নয়; বরং প্রথমবারের মতো যাচাইযোগ্য তথ্য, ভূগোলভিত্তিক পারফরম্যান্স এবং বাস্তব নেটওয়ার্ক দুর্বলতা শনাক্তের একটি নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সূচনাও করেছে।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এনএপি/এমআইএসটি//