গণমাধ্যমকে পরিবর্তনের চালক হওয়ার আহ্বান
প্লাস্টিক দূষণ রোধে আচরণ বদলের তাগিদ
- দেশে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার বেড়ে বছরে ২২ কেজিতে পৌঁছেছে বলে কর্মশালায় জানানো হয়
- ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ৩১ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের আওতায় আসছে বলে জানান বিশেষজ্ঞ
- প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উৎস নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতার ওপর জোর
ঘুম থেকে উঠে চিরুনি ব্যবহার থেকে শুরু করে রাতে দাঁত ব্রাশ করা—দৈনন্দিন জীবনের নানা পর্যায়ে প্লাস্টিকের উপস্থিতি এতটাই ব্যাপক যে এর ব্যবহার পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কঠিন। তবে প্লাস্টিকের অপব্যবহার কমানো, একক ব্যবহার্য প্লাস্টিক বর্জন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এ জন্য ব্যক্তিগত আচরণ পরিবর্তনের পাশাপাশি শিল্প পর্যায়ে প্লাস্টিকের কাঁচামালের ব্যবহার কমানো এবং উৎপাদন থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউনিডো)।
প্লাস্টিকের পরিবেশবান্ধব ব্যবহার, সমুদ্রের আবর্জনা রোধ এবং টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে শনিবার (১৭ অক্টোবর) ঢাকার একটি হোটেলে দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করে ইউনিডো। এতে অর্ধশতাধিক গণমাধ্যমকর্মী এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। বাংলাদেশে সংস্থাটির বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা এবং পরিবেশদূষণ মোকাবিলায় জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
খেলনা রপ্তানিতে পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিকের ব্যবহার, মেডিকেল বর্জ্য কমাতে সিরাজগঞ্জভিত্তিক পরিকল্পনা এবং নারায়ণগঞ্জ ও বরিশালের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান বিশেষ প্রকল্পের অভিজ্ঞতাও আলোচনায় উঠে আসে।
টনি মাইকেলের উপস্থাপনায় কর্মশালায় একক ব্যবহার্য প্লাস্টিক বর্জন (Refuse), পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস ব্যবহার (Reuse), প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো (Reduce) এবং বর্জ্য সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেল (Recycle)—এই চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব চর্চা ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
প্লাস্টিক নিয়ে বহুমাত্রিক প্রতিবেদন জরুরি
কর্মশালার বিশেষ পর্বে চিকিৎসক, টেলিভিশন উপস্থাপক, লেখক, বিতার্কিক ও সমাজকর্মী ডা. আব্দুন নূর তুষার প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন তৈরির পরিধি বাড়ানোর পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, জিনসের প্যান্ট তৈরিতে প্রায় ২০০ লিটার পানি লাগে। তবে একটি প্যান্ট দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের সময় শুধু উৎপাদন নয়, পণ্যের স্থায়িত্ব ও ব্যবহারের ধরনও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তাঁর মতে, পরিবেশদূষণকারী মানবসৃষ্ট পণ্য কোথায় তৈরি হচ্ছে, কীভাবে বাজারজাত হচ্ছে, পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে গড়ে ওঠা দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যবসা কীভাবে চলছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া কেমন এবং কালোবাজার বা অনুপযুক্ত ব্যবস্থাপনা থেকে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করা যেতে পারে। তবে প্লাস্টিকের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সঠিক ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিলে প্লাস্টিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারও কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
প্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রসঙ্গ তুলে তুষার বলেন, শিশুদের শরীরেও প্লাস্টিক প্রবেশের বিষয়টি উদ্বেগজনক। থাইরয়েডের সমস্যা ও বন্ধ্যত্বের মতো স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের সঙ্গে প্লাস্টিকের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা ও গবেষণা প্রয়োজন। তাঁর মতে, মানবসৃষ্ট প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিকল্প নিয়ে প্রতিবেদন বাড়াতে হবে।
সিঁদুরে ব্যবহৃত সিসার বিষাক্ততা নিয়ে সচেতনতা বাড়ায় এর ব্যবহার কমার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, মানুষ বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট। কিন্তু সৌন্দর্যচর্চা ও দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্য দিয়েও অনেক সময় বর্জ্য তৈরি হয়। তিনি মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব, চুল দ্রুত পাকা, অকালবার্ধক্য ও শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্রমের সঙ্গে প্লাস্টিকের সম্পর্ক নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। এসব বিষয়ে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রযুক্তির ব্যবহারেও প্রয়োজন মাত্রাজ্ঞান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটজিপিটি ব্যবহারে পানি খরচের আলোচনা হলেও ফেসবুকের সার্ভার পরিচালনায় পানির ব্যবহার নিয়ে একই মাত্রায় আলোচনা হয় না বলে মন্তব্য করেন তুষার। প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে বাছাই করা কিছু বিষয় নয়, বরং সামগ্রিক চিত্র বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
ইলেকট্রনিক বর্জ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই চিকিৎসক। সার্কিট বোর্ড ঘষে সোনা বের করা হলেও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রের ডিসপ্লে ও অন্যান্য অংশ শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। গাড়িতে রাখা পানির বোতলে রোদ লাগলে বিসফেনল এ (BPA) নির্গত হওয়ার সম্ভাবনা এবং তা থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির বিষয়েও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তুষার বলেন, মোমের প্রলেপ দেওয়া কাগজের স্ট্রের ব্যবহার একসময় দেখা গেলেও এখন অনেক জায়গায় আবার প্লাস্টিকের স্ট্র ব্যবহার করা হচ্ছে। একইভাবে ওভেন ও ফ্রিজের নিরাপদ ব্যবহার এবং খাবার কীভাবে সংরক্ষণ করা উচিত, তা নিয়েও পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই। খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোন ধরনের পাত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ; অথচ বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
রাজনীতিবিদ ও আমলাদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতার ঘাটতি নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তুষার বলেন, মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। তাঁর মতে, সরকার এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব নিতে পারে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পরিশোধনে সমন্বিত বর্জ্য শোধনাগার বা কালেকটিভ ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (CETP) স্থাপনের উদ্যোগ নিতে পারে। কোথায় কী ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহার করা উপযুক্ত, তা নিয়েও পরিকল্পনা দরকার।
তিনি আরও বলেন, শুধু রিসাইকেল করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; পুনর্ব্যবহারের বাইরেও বর্জ্য কমানোর উপায় খুঁজতে হবে। উৎস পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা না থাকলে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং বর্জ্য থেকেই আয়ের উৎস তৈরি হয়, কিন্তু পরিবেশগত ক্ষতি থেকে যায়।
এর আগে ন্যাশনাল এক্সপার্ট মাহবুব ইসলাম তাঁর উপস্থাপনায় চকলেট ও চিপসের মতো খাদ্যপণ্যের প্যাকেজিং থেকে সৃষ্ট দূষণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসব প্যাকেজিংয়ে একাধিক স্তর ব্যবহারের কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জটিল হয়। প্যাকেটের ভেতরে অ্যালুমিনিয়াম এবং নকশায় ব্যবহৃত উজ্জ্বল রং প্যাকেটকে আকর্ষণীয় করলেও পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সমস্যা তৈরি করতে পারে।
গণমাধ্যমকে ‘চেঞ্জ মেকার’ বলল ইউনিডো
ইউনিডো বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আলমগীর হোসেন বলেন, বিশ্বজুড়ে পরিবেশগত পরিবর্তনের বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে গণমাধ্যমকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা জটিল কারিগরি বিষয়কে সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। তবে মানুষ কেন প্লাস্টিক ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি আচরণগত পরিবর্তনের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীরা পরিবর্তনের চালক হিসেবে কাজ করতে পারেন।
ইউনিডোর অংশীদার পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সময়ের সঙ্গে সরকারি দফতরগুলোতেও পরিবর্তন আসছে এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করার সহযোগী বাড়ছে। এখন গণমাধ্যমের সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে। দেশের স্বার্থে গণমাধ্যমকর্মীরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ইউনিডোর কার্যক্রম তুলে ধরেন সংস্থাটির সিনিয়র অফিসার সত্য রঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি বাংলাদেশে পরিচালিত ২৫টি প্রকল্পের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ইউনিডোর প্রকল্পের পরিসর ও কার্যক্রম তুলে ধরেন।
ইউনিডোর টেকনিক্যাল এক্সপার্ট এস এম আরাফাত তার উপস্থাপনায় বলেন, প্রায় এক দশক আগে দেশে মাথাপিছু বছরে ৩ থেকে ৯ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহারের কথা বলা হলেও বর্তমানে গড় ব্যবহার ২২ কেজিতে পৌঁছেছে। মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত উপকরণের প্রায় ৭০ শতাংশ প্লাস্টিক বলে তিনি উল্লেখ করেন। পোশাকশিল্পেও প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জীবনের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে প্লাস্টিকের উপস্থিতির কারণে মানুষ এখন প্লাস্টিকের যুগে বসবাস করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আরাফাত বলেন, প্রায় দেড় শতাব্দী আগে হাতির দাঁতের বিকল্প হিসেবে বিলিয়ার্ড বল তৈরিতে প্লাস্টিকের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে এটি শিল্প ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে এবং দেশের জিডিপিতেও অবদান রাখছে। তাই প্লাস্টিকের ব্যবহার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে এর টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ৩১ শতাংশ ইতিমধ্যে পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাসাবাড়িতে তিন ধরনের ডাস্টবিন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে এস এম আরাফাত বলেন, পুনর্ব্যবহার করা যায় না—এমন ১৭টি ধরনের পণ্যে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিকল্প গ্রহণ এবং যথাযথ রিসাইকেলিংয়ের দিকে নজর দিতে হবে। বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে ভোক্তাকেই।
কর্মশালায় বক্তারা প্লাস্টিক দূষণ কমাতে ব্যক্তিগত আচরণ পরিবর্তন, শিল্প পর্যায়ে দায়িত্বশীল উৎপাদন, মেডিকেল ও ইলেকট্রনিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং গণমাধ্যমের ধারাবাহিক জনসচেতনতামূলক প্রতিবেদনের ওপর গুরুত্ব দেন।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমপি/এমআইএসটি//





