• অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কঠোর আইন প্রণয়ন টেকসই সমাধান নয়
  • ব্যক্তির অপরাধে গণমাধ্যম বন্ধ ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচার বিধান বাতিলের দাবি বিশিষ্টজনদের

সরকারের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন

সরকারের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন
১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:৪৬  

অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে প্রস্তাবিত কাঠামোয় সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন পাস করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে এবং সরকারের জন্যও আত্মঘাতী হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু কঠোর আইন করলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

১৮ অক্টোবর, রবিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পর্যালোচনা ও মতামত প্রদানের লক্ষ্যে নাগরিক সমাজের ১৯টি সংগঠন এবং সম্প্রতি গঠিত ১৭ সদস্যবিশিষ্ট মিডিয়া কমিটির অংশগ্রহণে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঞ্চালনায় সভায় বিশিষ্ট সাংবাদিক, সম্পাদক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেছে। ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে অপতথ্য ও ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার পেছনে এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফাকেন্দ্রিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যবসা সম্প্রসারণের স্বার্থে মেটা সংঘাত ও সহিংসতামূলক বক্তব্য বেশি প্রচার করে, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ ও যৌক্তিক আলোচনার বিষয়বস্তু সেন্সর করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রযুক্তি ব্যবসার অশুভ আঁতাতের কারণে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর কঠোর আইন চাপিয়ে দেওয়া টেকসই সমাধান নয়। অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে বর্তমান কাঠামোয় আইন পাস করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সরকারের জন্যও বুমেরাং হতে পারে। অপতথ্য ঠেকানোর নামে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষার প্রশ্নে নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম একই অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল করে সংশোধনের আহ্বান জানান।

সভায় সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইন প্রয়োজন, তবে সরকারের সমালোচনা ও অপরাধকে এক করে দেখা যাবে না। গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা হবেই। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়—এ কথা বিবেচনায় রেখেই আইন প্রণয়ন করা উচিত। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তির অপরাধের জন্য পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। প্রস্তাবিত আইনে এমন বহু বিষয় রয়েছে, যা সরকারকেই দেখা উচিত। সরকারের উচ্চপদস্থদের নিয়ে সম্প্রতি সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে যে কমিটি হয়েছে সেটি সংশোধনের প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরকার তো আছেই, তাহলে আবার উচ্চপদস্থদের নিয়ে কেন কমিটি দরকার। সাইবার অপরাধ দমনের নামে সরকারের সমালোচনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রাখা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। কোনো ব্যক্তির অপরাধে সংবাদমাধ্যম বন্ধ, সন্দেহের ভিত্তিতে প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম জব্দ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা দেওয়ার মতো বিধান অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতাসীন নেতার ফোনেও কাউকে গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং কোনো সংবাদ কারও অপছন্দ হলেই সেটিকে ভুল তথ্য বা মানহানিকর বলে দাবি করার ঝুঁকি রয়েছে। তাই ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্যের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং আইন প্রণয়নের আগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে চরিত্রহনন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। ২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধপল্লিতে হামলা ও ২৫টি প্যাগোডা ভাঙচুর, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের গণহত্যাকে উসকে দেওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে জনতাকে উসকে দিয়ে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনায় ফেসবুকের অপব্যবহার হয়েছে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা কঠিন হচ্ছে। তিনি প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৬(ক) ধারা বাদ দেওয়া, ২৫ ধারায় মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা, ৮(৩) ধারার অপব্যবহার রোধ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে বৃহত্তর ঐকমত্যের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ব্যক্তির সম্মানহানি ঠেকাতে সাইবার আইনের পরিবর্তে প্রচলিত মানহানির আইন কার্যকর করা যেতে পারে। মানহানির অভিযোগে কারাদণ্ডের পরিবর্তে দেওয়ানি আইনে ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত না করেই ভুক্তভোগীদের প্রতিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশে মানহানিসংক্রান্ত প্রচলিত আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় মিথ্যা সংবাদ ও অপপ্রচারের শিকার ব্যক্তিরা প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে কেউ যা ইচ্ছা লিখতে পারেন, টেলিভিশনে গিয়ে যে কারও নামে মিথ্যা কথা বলতে পারেন। ইন্টারনেটে প্রকাশিত তথ্য দীর্ঘদিন থেকে যাওয়ায় মিথ্যা বা নেতিবাচক তথ্যের কারণে ব্যক্তির সুনাম দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক হিসেবে তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাইলেও সাংবাদিকতাকে দায়িত্বশীল হওয়ার তাগিদ দেন।

সভায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত আইনের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দেখে মনে হচ্ছে এটি ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে এবং এতে গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, আইনে একজন ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের কারণে পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার বিধান রয়েছে এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি জব্দ করার ক্ষমতা পেতে পারেন, যার ফলে একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। মানহানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকার কথা তুলে ধরে তিনি তৃণমূল পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান।

রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরীফুজ্জামান পিন্টু প্রস্তাবিত আইনের দায়মুক্তির বিধান, অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং অনলাইন কনটেন্ট ব্লকের প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সাংবাদিকতা ও মূলধারার গণমাধ্যম যাতে আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রাখার দাবি জানান তিনি।

পাশাপাশি জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের প্রস্তাবিত গঠনকাঠামো নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান করে মন্ত্রী, সচিব ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য নেই। নির্বাহী বিভাগকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য শুভ নয় মন্তব্য করে তিনি কাউন্সিলে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সদস্য হিসেবে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।

//ডিবিটেক/ আইএইচ/এসএমপি/এমআইএসটি//