পাওয়ার ৩৫ শতাংশে উঠলে গ্রিডে যেতে পারে ৩০০ মেগাওয়াট
রূপপুরে পাওয়ার স্টার্টআপ ২৫ অক্টোবর, ডিসেম্বরে বিদ্যুতের লক্ষ্য
- প্রথম ইউনিটে ১১ অক্টোবর নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক ফিশন শুরু হয়েছে
- প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য
- ডিসেম্বরের সময়সীমা নির্ভর করছে পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ওপর
স্বপ্নের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে আগামী ২৫ অক্টোবর শুরু হতে যাচ্ছে পাওয়ার স্টার্টআপের পরবর্তী ধাপ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা গেলে প্রাথমিকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সবকিছু নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এগোলে আগামী ডিসেম্বরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে পরীক্ষার ফলাফল, কারিগরি সক্ষমতা যাচাই এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে এ সময়সীমা।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পাওয়ার স্টার্টআপের পর রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। প্রতিটি ধাপে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সংশ্লিষ্ট প্যারামিটার যাচাই করা হবে। সবকিছু সন্তোষজনক হলে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে উৎপাদন পর্যায়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য পূরণ হতে পারে।
সূত্র জানায়, পাওয়ার স্টার্টআপের প্রাথমিক পর্যায় থেকে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে সাধারণত প্রায় ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। তবে এ সময় নির্ভর করবে পরীক্ষার ফলাফল ও কারিগরি পরিস্থিতির ওপর। কোনো পরীক্ষা ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট সমস্যা সমাধান করে পুনরায় পরীক্ষা করতে হবে। এতে উৎপাদন শুরুর সময় পিছিয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে রিঅ্যাক্টরের ফিশন রিঅ্যাকশন-সংক্রান্ত পরীক্ষা ও বিভিন্ন কারিগরি যাচাই চলছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ পর্যায়ের কাজ শেষ হলে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) অনুমোদন সাপেক্ষে পাওয়ার স্টার্টআপের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।
ফিশন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপ ব্যবহার করে বাষ্প তৈরি করা হয়, যা টারবাইন ঘোরায়। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ। ফলে রিঅ্যাক্টরে ফিশন বিক্রিয়া শুরু হওয়া এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়া এক বিষয় নয়। এর মধ্যবর্তী প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাই করতে হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ফিজিক্যাল স্টার্টআপ পর্যায়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও রিঅ্যাক্টরের প্যারামিটার পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কম তাপীয় ক্ষমতায় এসব পরীক্ষা চালানো হয়। পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে ধীরে ধীরে তাপীয় ক্ষমতা বাড়িয়ে টারবাইন চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হবে। টারবাইন ও জেনারেটরের কার্যকারিতা যাচাইয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এসব ধাপে বায়েরার প্রয়োজনীয় অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রায়াল অপারেশনে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস
পাওয়ার স্টার্টআপের পর বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হবে ট্রায়াল অপারেশন বা পরীক্ষামূলক পরিচালনা। এ পর্যায়ে উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে ও কমিয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয়, বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, ট্রায়াল অপারেশনের এ পর্যায়ে প্রায় ১০ মাস সময় লাগতে পারে। এ সময় বাংলাদেশের অপারেটররা রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করবেন। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা, কারিগরি তদারকি ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁদের দক্ষতা বাড়বে। পরীক্ষার প্রয়োজনে এ পর্যায়ে স্বল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখার প্রয়োজনও হতে পারে।
ডিসেম্বরে উৎপাদন নিয়ে সংশয়
প্রকল্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, আদর্শ কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ করা গেলে ডিসেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হতে পারে। তবে শেষ মুহূর্তে কোনো পরীক্ষায় সমস্যা দেখা দিলে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি লাগতে পারে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা না করে নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত করা কঠিন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অন্য সূত্রগুলোও ডিসেম্বরের লক্ষ্য নিয়ে কিছুটা সংশয়ের কথা জানিয়েছে। তাদের মতে, ছোট কোনো কারিগরি সমস্যা দেখা দিলেও সংশ্লিষ্ট কাজ নতুন করে সম্পন্ন করতে হতে পারে। ফলে ডিসেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য থাকলেও তা নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। পরীক্ষার ফলাফল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনই শেষ পর্যন্ত সময়সূচি নির্ধারণ করবে।
জরুরি প্রস্তুতি পর্যালোচনায় আইএইএ
এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) একটি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের কর্মসূচি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৮ থেকে ১৮ নভেম্বর আইএইএর ‘ইমারজেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস রিভিউ’ (ইপিআরইভি) মিশনের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা। এ মিশনের আওতায় পারমাণবিক জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি, সমন্বয় ও সাড়াদানের সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হবে। তবে কর্মসূচির নির্দিষ্ট তারিখ ও বিস্তারিত কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে, প্রতিটির পরিকল্পিত উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য পূরণ হলে তা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির সংযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে। তবে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব কারিগরি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন সম্পন্ন হওয়াই এখন প্রধান শর্ত।
//ডিবিটেক/ আইএইচ/এসএমপি/এমআইএসটি//





