ই-ক্যাবে ফিরছে ভোটাধিকার: অরাজনৈতিক ও অবাধ নির্বাচনের বিকল্প নেই

ই-ক্যাবে ফিরছে ভোটাধিকার: অরাজনৈতিক ও অবাধ নির্বাচনের বিকল্প নেই
৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:০০  

হাইলাইটস

  • দীর্ঘ আইনি অচলাবস্থা কাটিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন পুনর্গঠিত বোর্ডের মাধ্যমে ই-ক্যাবে ভোটাধিকার ফিরে এসেছে।
  • আগামী ১৯ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখে সরাসরি ব্যালটের মাধ্যমে ১১টি পদের জন্য কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
  • বাণিজ্য সংগঠনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার ও অরাজনৈতিক উদ্যোক্তাদের নেতৃত্বে আনার জোর তাগিদ।
  • ডিবিআইডি (DBID) প্রক্রিয়াকে ই-টিনের মতো ১০ মিনিটে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও বিনামূল্যে দেওয়ার দাবি।
  • ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে অতিরিক্ত মনোনয়ন ফি হ্রাসের বিনীত আহ্বান।

দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা, আইনি জটিলতা আর নেতৃত্বহীনতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ব্যালটের ধারায় ফিরছে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন এবং পুনর্গঠিত নির্বাচন বোর্ডের ঘোষিত নির্বাচনী তফসিল সাধারণ সদস্যদের মাঝে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার নতুন প্রত্যাশা ও স্বস্তি তৈরি করেছে।

২০১৪-১৫ সালে যাত্রা শুরুর পর দীর্ঘ সময় ই-ক্যাবে কোনো উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তীতে সাধারণ সদস্যদের সম্মিলিত আন্দোলন, দাবি ও লেখনীর মুখে ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো সরাসরি ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত হয়। সে সময় তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিতে মনোনয়ন ফি ৭৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। ফলে একদল উদ্যমী ও অরাজনৈতিক উদ্যোক্তা নেতৃত্বে আসার সুযোগ পান। তবে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও পটপরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে সেই প্রক্রিয়া পুরোপুরি থমকে যায়।

এরপর বিগত সময়ে দফায় দফায় সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও আইনি মারপ্যাঁচে আটকে পড়ে সংগঠনটি। স্বার্থান্বেষী মহলের দায়ের করা রিট পিটিশনের কারণে স্থগিতাদেশ আসে। মূলত সরাসরি ব্যালটের নিরপেক্ষ লড়াই এড়িয়ে 'পকেট কমিটি' গঠনের কৌশল হিসেবেই সময়ক্ষেপণ করা হয়েছিল।

অ্যাসোসিয়েশনের অস্তিত্ব ও খাতের মূল সংকট

দীর্ঘ সময় ধরে ই-ক্যাবে নির্বাচিত নেতৃত্ব না থাকায় দেশের উদীয়মান ই-কমার্স খাত কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল। নিবন্ধিত ৩ হাজারের বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সদস্যের পাশাপাশি দেশে বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ সাধারণ, নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সক্রিয় রয়েছেন—যাদের সামগ্রিক বাজার আকার প্রায় ২২ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা।

একটি জাতীয় বাণিজ্য সংগঠনকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে সম্পূর্ণ পেশাদার ও অরাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে ন্যস্ত করা এখন খাতের টিকে থাকার শর্ত। একজন সরকারি কর্মকর্তা রুটিন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন; কিন্তু খাতের নীতিগত সংস্কার, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ কিংবা উদ্ভাবনী পরিবেশ তৈরি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। নির্বাচিত পরিষদ না থাকায় যেসব সংকট প্রকট হয়েছে:

  • ডিবিআইডি (DBID) সহজীকরণ ও অটোমেশন: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল বিজনেস আইডি (DBID) আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বছরের পর বছর আটকে আছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের e-TIN-এর মতো ডিবিআইডি-কেও অবিলম্বে স্বয়ংক্রিয় ও বিনামূল্যে ঘরে বসে পাওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি।

  • ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা: লক্ষাধিক নারী ও তরুণ উদ্যোক্তার পক্ষে কথা বলার মতো নির্বাচিত অভিভাবক না থাকায় লজিস্টিকস ও কুরিয়ার কোম্পানিগুলোর মনোপলি, অযৌক্তিক চার্জ ও ডেলিভারি জটিলতায় মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

  • নীতিগত সংস্কার ও প্রণোদনা আদায়: এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কর রেয়াত, ভ্যাট অব্যাহতি ও সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণের সুবিধা আদায়ে শক্তিশালী অরাজনৈতিক দরকষাকষির সুযোগ ব্যাহত হয়েছে।

  • আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগ: নির্বাচিত ও দূরদর্শী বোর্ড না থাকায় ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং বিদেশি অংশীদারদের আস্থা অর্জনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

আইনি বাধা অপসারণ ও মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ

ই-ক্যাবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং সাধারণ সদস্যদের স্বার্থ সুরক্ষায় সদস্যদের পক্ষ থেকে আমি নিজে মাননীয় সরকারপ্রধান ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বরাবর আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি পেশ করি। সেখানে অবিলম্বে রিট পিটিশন নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাণিজ্য সংগঠন আইন অনুযায়ী সরাসরি ব্যালটে অরাজনৈতিক ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জোর দাবি জানানো হয়।

পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে রিট নিষ্পত্তি হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্বাচন পুনর্গঠনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করে। ডব্লিউটিও উইংয়ের উপসচিব জনাব শরীফ মোস্তাফিজুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ৩ সদস্যের নির্বাচন বোর্ড এবং যুগ্মসচিব জনাব সুফিয়া আক্তার রুমীকে চেয়ারম্যান করে ৩ সদস্যের আপিল বোর্ড গঠন করা হয়।

২০২৬–২০২৮ মেয়াদের পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী তফসিল ও পদের তথ্য

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১১টি পদের (সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক, অর্থ সম্পাদক ও ৫টি পরিচালক পদ) বিস্তারিত সময়সূচি:

ই-ক্যাব কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচন ২০২৬–২০২৮ সময়সূচি
তারিখ ও সময় নির্বাচনী কার্যক্রম
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী তফসিল ও আচরণবিধি প্রকাশ
১৯ অক্টোবর ২০২৬ (বিকাল ৫টা) সদস্যপদ নবায়ন, বকেয়া চাঁদা পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমার শেষ সময়
২৯ অক্টোবর ২০২৬ প্রাথমিক ভোটার তালিকা প্রকাশ
৩০ অক্টোবর – ০১ নভেম্বর ২০২৬ প্রাথমিক ভোটার তালিকার ওপর আপিল বোর্ডে আপত্তি দাখিল
০৫ – ০৬ নভেম্বর ২০২৬ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ
০৬ – ১২ নভেম্বর ২০২৬ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল
২৫ নভেম্বর ২০২৬ বৈধ প্রার্থী তালিকা প্রকাশ
২৬ – ২৮ নভেম্বর ২০২৬ লিখিতভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ
২৮ নভেম্বর ২০২৬ চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ
১৯ ডিসেম্বর ২০২৬ (সকাল ১০টা – বিকাল ৪টা) সরাসরি গোপন ব্যালটে ভোট গ্রহণ ও প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা
২৩ ডিসেম্বর ২০২৬ নির্বাচন বোর্ড কর্তৃক আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা

মনোনয়নপত্র ফি (অফেরতযোগ্য)

  • সভাপতি: ১,২০,০০০/- টাকা

  • সিনিয়র সহ-সভাপতি: ১,১০,০০০/- টাকা

  • সহ-সভাপতি: ১,০৫,০০০/- টাকা

  • সাধারণ সম্পাদক: ১,০০,০০০/- টাকা

  • যুগ্ম সম্পাদক: ৮০,০০০/- টাকা

  • অর্থ সম্পাদক: ৭০,০০০/- টাকা

  • পরিচালক (৫টি পদ): প্রতি পদের জন্য ৫০,০০০/- টাকা

অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের ৪ দফা আহ্বান

  • মনোনয়ন ফি হ্রাসের অনুরোধ: ই-ক্যাবের বিপুলসংখ্যক সদস্যই ক্ষুদ্র ও কুটির উদ্যোক্তা (CMSME)। উচ্চ মনোনয়ন ফি তরুণদের অংশগ্রহণকে সংকুচিত করতে পারে। ২০২২ সালের মতো ফি কমিয়ে এটি উদ্যোক্তাবান্ধব করার আহ্বান জানাই।
  • উদ্ভাবনী পলিসিভিত্তিক প্রতিযোগিতা: কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা কাদা ছোড়াছুড়ি না করে প্রার্থীরা যেন ই-কমার্স খাতের উন্নয়ন ও গবেষণানির্ভর ইশতেহার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
  • নতুন আইনি জটিলতা বন্ধ রাখা: অতীতে মামলা ও রিটের মাধ্যমে সাধারণ সদস্যদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার যে নজির ছিল, তার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে। পুরো প্রক্রিয়াকে আইনি ষড়যন্ত্রমুক্ত রাখতে হবে।
  • স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা: বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা অনুযায়ী নামসর্বস্ব বা ভুয়া প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে কেবল প্রকৃত ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে।

ই-ক্যাবকে একটি পেশাদার, আত্মমর্যাদাশীল ও কার্যকর বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে টিকিয়ে রাখা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। আসুন, কোনো চক্রান্তের ফাঁদে পা না দিয়ে আগামী ১৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিই এবং সরাসরি ব্যালটের মাধ্যমে যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্ব বেছে নিই।


লেখক || ই-কমার্স বিশ্লেষক, উদ্যোক্তা এবং ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য।


সম্পাদকীয় নোট || আলোচ্য নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত ও তথ্য লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক। দেশের ই-কমার্স খাতের অভ্যন্তরীণ সুশাসন, ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের অধিকার রক্ষা এবং অবাধ গণতান্ত্রিক পরিবেশ সমুন্নত রাখার স্বার্থে লেখাটি সম্পাদকীয় প্রমিতকরণসহ প্রকাশ করা হলো।


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।