কোডিং হোপ: ট্রিলিয়ন ডলারের এআই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বাংলাদেশ

কোডিং হোপ: ট্রিলিয়ন ডলারের এআই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বাংলাদেশ
৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:২১  
  • ট্রিলিয়ন ডলার লক্ষ্য ও তৃতীয় স্তম্ভ: ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে পোশাক ও রেমিট্যান্সের পর ‘জ্ঞানকর্মী’ (Knowledge Worker) এবং নিজস্ব কম্পিউটকে তৃতীয় অর্থনৈতিক স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

  • সিলিকন ভ্যালি রোডশো ও ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা: প্লাগ অ্যান্ড প্লে-এর সাথে চুক্তির মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ টেক সেন্টার’ ও এআই সেন্টার অব এক্সিলেন্স স্থাপনসহ হাই-টেক খাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের কার্যকর রোডম্যাপ।

  • সার্বভৌম এআই ও ডেটা স্বাধিকার: এআইয়ের নিছক পরনির্ভরশীল ভোক্তা না হয়ে নিজস্ব মডেল ও বাংলায় ট্রেনিং নিশ্চিতকরণ, প্ল্যাটফর্মের ওপর নারীর নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং নিজস্ব মাটিতে ডেটা ও কম্পিউট অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব অর্জন।

ঢাকা ও সিলিকন ভ্যালির ভৌগোলিক দূরত্ব বারো হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। তবে বর্তমানে যে দূরত্বটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তা আরও সূক্ষ্ম ও দুর্লঙ্ঘ্য—আর তা হলো মানসিকতা, দক্ষতা, মূলধন, পারস্পরিক আস্থা এবং সেই মিলি-সেকেন্ডের ব্যবধান, যা একটি জাতিকে তার নিজস্ব কম্পিউট (Compute) বা গণনা-সক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) এই বৈপ্লবিক যুগে বাংলাদেশ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকতে রাজি নয়। দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক শিল্প রূপান্তরগুলো আমাদের ওপর একতরফাভাবে কেবল চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু এবার আমরা এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে চাই।

এই অভিপ্রায়টি মূলত একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপকল্পেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি সুস্পষ্ট জাতীয় গন্তব্য নির্ধারণ করেছেন: চলতি দশকেই অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। এটি কেবল রাজনৈতিক কোনো অলংকারিক ঘোষণা নয়; বরং এটি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীল সক্ষমতা বৃদ্ধি, টেকসই বিনিয়োগ এবং আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর দাঁড়ানো একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ফার্মাসিউটিক্যালস, কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল সার্ভিসেস, এগ্রো-প্রসেসিং, উন্নত হাই-এন্ড টেক্সটাইল, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশ্বমানের লজিস্টিকস পর্যন্ত এর কর্মপরিধি বিস্তৃত। আমাদের অর্থনীতি সম্প্রতি অর্ধ-ট্রিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক মাইলফলক অতিক্রম করেছে। পরবর্তী আট বছরে এটিকে দ্বিগুণ করা নিঃসন্দেহে এক বিশাল ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। তবে উৎপাদনশীলতায় গুণগত রূপান্তর এনে প্রবৃদ্ধির পরবর্তী চালিকাশক্তিকে প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে এই স্বপ্ন কোনো কল্পনা নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত ও অর্জনযোগ্য জাতীয় গন্তব্য।

এই মহাপরিকল্পনায় আমাদের পররাষ্ট্রনীতির রয়েছে একটি প্রত্যক্ষ ও কৌশলগত ভূমিকা। আধুনিক অর্থনৈতিক কূটনীতি কেবল তৈরি পোশাক বা চামড়ার মতো সনাতন পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এটি ঐতিহ্যবাহী পাটজাত পণ্য, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির ক্রিয়েটিভ ইকোনমির পাশাপাশি আধুনিক হাই-টেক উদ্ভাবনকেও প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলো এখন আর কেবল প্রথাগত কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হবে না। এগুলো রূপান্তরিত হচ্ছে এক একটি প্রযুক্তিগত ফ্রন্টলাইনে—যেখানে নতুন ধারণাকে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব, দক্ষতা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বৈদেশিক বাজারে রূপ দেওয়া হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা তৈরি পোশাক খাত ও রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির প্রথম দুটি মজবুত স্তম্ভ তৈরি করেছিল। আর ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে আমাদের তৃতীয় স্তম্ভটি গড়ে তুলতে হবে ‘জ্ঞানকর্মী’ (Knowledge Worker) তৈরির মাধ্যমে—যা দেশে ও প্রবাসে এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত থাকবে, যে রাষ্ট্র অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে বৈশ্বিক বাজারে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বিক্রি করতে পারে।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (Bangladesh First) দর্শনের অর্থ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো আত্মতুষ্টি নয়। বরং যেমনটা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন—এর প্রকৃত অর্থ হলো একটি প্রস্তুত বাংলাদেশ: যা বিশ্বের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত, নিজস্ব নীতি ও সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং অন্যের প্রযুক্তিগত দাবা খেলার ঘুঁটি হতে নারাজ। আমরা আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলব; তবে আমাদের বুদ্ধিমত্তার স্তরটি (Intelligence Layer) কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সার্বভৌম অধিকার আমরা অন্য কারও হাতে তুলে দেব না।

কীসের জন্য এই বুদ্ধিমত্তা?

আমরা বিদেশি প্ল্যাটফর্মের কতগুলো টুলের সাবস্ক্রিপশন নিচ্ছি, তা জাতীয় প্রস্তুতির কোনো আসল মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত পরীক্ষা হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের নিজেদের জনগণের উৎপাদনশীলতা ও সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারছে কি না। ঢাকার একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার একটি এআই কো-ডিজাইনারের সহায়তায় এক সপ্তাহের মধ্যে যেন এমন একটি সমাধান তৈরি করতে পারেন যা আগে এক মাস সময় নিত, এবং তিনি হবেন সেই উদ্ভাবনের বৌদ্ধিক স্বত্বের একচ্ছত্র মালিক। রূপগঞ্জের একজন জামদানি তাঁতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনুবাদের মাধ্যমে নিজস্ব বয়ানে ইতালীয় ভাষায় তাঁর তাঁতের গৌরবগাথা তুলে ধরবেন এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া মিলানের বুটিকে সরাসরি নিজের নকশা ও পণ্যের ন্যায্য অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে পৌঁছে যাবেন। কিংবা ফরিদপুরের একজন কৃষক হাইপার-লোকাল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পড়ে নিজস্ব ভাষায় পদক্ষেপ নিয়ে ফলন নিশ্চিত করবেন। এগুলো কোনো অলংকারিক কথা নয়; এগুলোই হলো আমাদের প্রযুক্তি রূপান্তরের মূল মানদণ্ড।

যে এআই বরিশালের একজন কৃষকের মাটির ভাষা বুঝতে পারে না কিংবা কুড়িগ্রামে কোডিং শিখতে থাকা প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো মেয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে পারে না, তা বাংলাদেশের বাস্তবতায় যথেষ্ট বুদ্ধিমান নয়। গ্লোবাল সাউথের (Global South) সংকট অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত। আমাদেরকে প্রায়ই এমন সিস্টেম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয় যা অন্য কোনো গোলার্ধে প্রশিক্ষিত, অন্য সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত এবং দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত—আর সেই প্রযুক্তিগত নির্ভরতাকেই প্রগতির মোড়কে উপস্থাপন করা হয়। নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন ছাড়া কেবল অন্যের টুল ব্যবহার করা হলো এক নতুন ধরনের ডিজিটাল পরাধীনতা, যা আগের চেয়েও দ্রুতগতিতে আমাদের গ্রাস করে।

ক্রেতা নয়, প্রযুক্তির নির্মাতা

আমাদের নীতিগত অবস্থান দ্ব্যর্থহীন—আমরা কেবল এআই প্রযুক্তির পরনির্ভরশীল ‘ভোক্তা’ হতে চাই না, আমরা হতে চাই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের ‘নির্মাতা’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটালাইজেশনের পেছনে ব্যয় করা প্রতিটি সরকারি রাজস্ব এবং প্রতিটি বিদেশি বিনিয়োগের বিপরীতে দেশে উন্নত দক্ষতা তৈরি হতে হবে; এমন সুনির্দিষ্ট ডেটাসেট ও ফাউন্ডেশন মডেল গড়ে তুলতে হবে যা আমরা জাতীয় স্বার্থে নিবিড়ভাবে নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের একটি সম্ভাবনাময় জাতি, যার তরুণ ও অনাবাসী গবেষকেরা ইতিমধ্যেই সিলিকন ভ্যালিতে বিশ্বসেরা কোড লিখছেন—সেখানে নিজস্ব সক্ষমতার ভিত না গড়ে কেবল বুদ্ধিমান সেবা ভাড়া নিয়ে চলা একটি চরম আত্মঘাতী ও লোকসানের চুক্তি।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া সফরে আমরা শীর্ষ প্রযুক্তি মহলের কাছে এই বার্তাই সরাসরি পৌঁছে দিয়েছি। গত সেপ্টেম্বরের শেষভাগে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল—যার মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি উইংয়ের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন—এনভিডিয়া (NVIDIA), অ্যাপল (Apple), সিসকো (Cisco), মেটা (Meta) এবং প্লাগ অ্যান্ড প্লে (Plug and Play)-এর শীর্ষ নেতৃত্ব, সিলিকন ভ্যালির গবেষক ও অনাবাসী বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদদের সাথে সুনির্দিষ্ট নীতিগত সংলাপে বসেন। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল অত্যন্ত বাস্তবভিত্তিক: কম্পিউট ক্যাপাসিটি, সাইবার নিরাপত্তা, যৌথ গবেষণা, ডেভেলপারদের আন্তর্জাতিক সক্ষমতা এবং ঢাকার একটি সম্ভাবনাময় ডিপ-টেক স্টার্টআপ থেকে বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল পাওয়ার কার্যকর পথরেখা তৈরি। লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত আমাদের কনস্যুলেট জেনারেলের সার্বিক প্রস্তুতি প্রমাণ করেছে—আধুনিক কূটনৈতিক মিশনগুলো কীভাবে বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত ফ্রন্টলাইনে রূপান্তরিত হতে পারে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্লাগ অ্যান্ড প্লে-এর সিলিকন ভ্যালি সদর দপ্তরে উভয় পক্ষ একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা নথিতে স্বাক্ষর করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ টেক সেন্টার’-এর সাথে যুক্ত করে দেশে এক বা একাধিক ‘এআই সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ (AI Centres of Excellence) গড়ে তোলা। এই প্ল্যাটফর্মটি ইতিমধ্যেই এমন একটি পথরেখা তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম, করপোরেট অংশীদারিত্ব এবং সেমিকন্ডাক্টর টেস্টিং ও প্যাকেজিংসহ হাই-ভ্যালু উৎপাদন খাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে আমরা জানি, নিছক আগ্রহ প্রকাশই নিশ্চিত বিনিয়োগ নয় এবং একটি চুক্তি স্বাক্ষর মানেই স্বয়ংসম্পূর্ণ সেন্টার দাঁড়িয়ে যাওয়া নয়। আমাদের বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া: সংলাপ থেকে টার্ম শিট (Term Sheet), টার্ম শিট থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মক্ষেত্র, অবকাঠামো এবং দেশে আন্তর্জাতিক মানের মেধা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।

পরিচয় এবং মানবিক মর্যাদা

‘সার্বভৌম এআই’ (Sovereign AI)-এর রূপরেখায় আমাদের জন্য দুটি বিষয় কোনো অবস্থাতেই আপসযোগ্য নয়: সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং মানবিক মর্যাদা।

প্রথমত, আত্মপরিচয়ের দাবি আমাদের ইতিহাসের পাতায় রক্ত দিয়ে লেখা। যে জাতি মাতৃভাষার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছে, সেখানে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল যদি নির্ভুলতা, ভাবাবেগ ও লোকায়ত প্রেক্ষাপট ধারণ করে বাংলায় সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া জানাতে না পারে, তবে তা কোনো নিরপেক্ষ প্রযুক্তি নয়; বরং তা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের নতুন রূপ। কৃষি, স্বাস্থ্য, বিচার বিভাগ, শিক্ষা ও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় মডেলগুলোর প্রথম-শ্রেণীর ভাষা (First-class Language) হতে হবে বাংলা—এমন নয় যে ইংরেজি বা অন্য ভাষার মডেল তৈরি শেষে দায়সারাভাবে একটি স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ জুড়ে দেওয়া হলো। যে অ্যালগরিদম পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত বৈচিত্র্য ও প্রেক্ষাপটকে একটি সাধারণ ‘গ্রামীণ পরিভাষা’ হিসেবে সমতল বানিয়ে ফেলে, তা বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় শুরুতেই ব্যর্থ। কনটেন্টের চেয়েও কনটেক্সট বা প্রেক্ষাপট বহুলাংশে গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, মানবিক মর্যাদার ক্ষেত্রে আমাদের মূলনীতি হলো—প্ল্যাটফর্মের আগে নাগরিকের নিরাপত্তা। আমরা সেই সব আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে স্বাগত জানাব যারা স্থানীয় মেধা তৈরি করে, যথাযথ কর প্রদান করে এবং যেকোনো কারিগরি ও সামাজিক ক্ষতির দায়ভার প্রকাশ্যে গ্রহণ করে। মেটাসহ শীর্ষস্থানীয় প্ল্যাটফর্মগুলোকে আমরা স্পষ্ট জানিয়েছি: দেশে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি উপস্থিতি নিশ্চিত করা কোনো নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। ডিজিটাল পরিসরে নারীর চরিত্রহনন, হয়রানি কিংবা নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে প্ল্যাটফর্মগুলোকে সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনার এটিই একমাত্র কার্যকর উপায়। প্রযুক্তির কাজ হওয়া উচিত মানুষের শ্রম ও জীবনের ভার লাঘব করা; কোনো কর্মীকে তার মানবিক মর্যাদা ও পেশা থেকে অনৈতিকভাবে উৎখাত করা নয়। নিরাপত্তা উদ্ভাবনের কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং নিরাপত্তা ও মানবাধিকারই টেকসই উদ্ভাবনের প্রধান পূর্বশর্ত।

কোড হোপ: রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি

এটাই হলো ‘কোড হোপ’ (Code Hope)—কোডিংয়ের মাধ্যমে পুরো জাতির মাঝে আত্মবিশ্বাস ও আশার সঞ্চার করা। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে কোডিং জগতের অ্যালগরিদম ও বাস্তব জীবনের জটিল সম্পর্কের বিষয়টি আমি খুব কাছ থেকে অনুধাবন করেছি। প্রযুক্তির জগতে প্রায়ই দেখা যায় স্থানীয় প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করে যান্ত্রিক কনটেন্ট চাপিয়ে দেওয়া হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা অবসানে ‘ঢাকা ডায়ালগ’-এর নীতিগত প্রস্তুতিকালে আমরা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সাথে এক টেবিলে বসে একটি অকাট্য সত্য তুলে ধরেছি: কোড হলো এমন এক মাধ্যম যার সাহায্যে একটি স্বপ্ন বাস্তব রূপ নেয়, আর সেই পথচলা হতে হবে শতভাগ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। দিনাজপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের যে মেয়েটি একটি অনন্য মোবাইল অ্যাপ কোড করতে পারে, তার ভবিষ্যৎ কোনো গতানুগতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; একইভাবে সে এমন একটি ডিজিটাল স্পেসের দাবিদার, যা তাকে জনপরিসরে দৃশ্যমান হওয়ার কারণে কোনো কুৎসিত আক্রমণের শিকার বানাবে না। আমরা কেবল নির্দিষ্ট একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর জন্য প্রযুক্তি গড়ছি না; আমরা এমন এক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ কোড করছি যেখানে নারী, কৃষক, প্রান্তিক তাঁতি এবং প্রথম প্রজন্মের উদীয়মান তরুণ প্রকৌশলীরা গর্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত হবেন।

আমাদের ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক ভিত্তি—ক্ষুদ্র কুটির শিল্প, তাঁত, কৃষি ও প্রাথমিক ক্লাসরুমের ক্ষেত্রেও একই দর্শন প্রযোজ্য। নতুন প্ল্যাটফর্মের মোড়কে আমাদের ঐতিহ্য ধ্বংস করা সরকারের উদ্দেশ্য নয়; বরং মূল ঐতিহ্য ও কারিগরি স্বত্বাধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে তাদের বিশ্ববাজারের নতুন গতির সাথে যুক্ত করাই লক্ষ্য। যে ডিজিটাল রূপান্তর শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি বাড়ায় না, লোকায়ত কারিগরের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করে না কিংবা মেধার বিকাশ ঘটায় না, সেই প্রবৃদ্ধি আমাদের কাম্য নয়।

মিলিসেকেন্ড ও ডেটা সার্বভৌমত্ব

কম্পিউট বা গণনা-সক্ষমতা হলো এই প্রযুক্তি দর্শনের সবচেয়ে বাস্তব ও বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তি। বৈশ্বিক টেক প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে দূরত্ব দূর করা মানসিকতার বিষয় হলেও, নিকটতম ডেটা সেন্টারের দূরত্ব পরিমাপ করা হয় মিলি-সেকেন্ডের লেটেন্সি, আইনগত ভৌগোলিক এখতিয়ার এবং নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে। বিদ্যুৎ গ্রিড, ফাইবার অপটিক ব্যাকবোন, হাইপার-স্কেল ক্লাউড এবং তা পরিচালনার মতো নিজস্ব ভৌত পরিকাঠামো গড়ে তোলা কোনো অতীতমুখী আবেগ নয়; এটি একটি জাতির নিরেট ডেটা সার্বভৌমত্ব। যে রাষ্ট্র নিজের মাটিতে নিজস্ব ডেটা সংরক্ষণ করতে পারে না, মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে পারে না কিংবা প্রয়োজনে জাতীয় সুরক্ষায় সিস্টেমকে বন্ধ করার নিয়ন্ত্রণ রাখে না—সেই জাতি চিরকাল অন্যের প্ল্যাটফর্মে বুদ্ধিবৃত্তিক পরনির্ভরশীল হয়ে থাকবে। নিজস্ব কম্পিউট ও ক্লাউড অবকাঠামো বিনির্মাণের কোনো নিরাপদ বিকল্প আমাদের সামনে নেই।

আমরা বলছি না যে বাংলাদেশ রাতারাতি তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। তবে আমরা সেই সুস্পষ্ট রূপরেখা ও শৃঙ্খলার সূচনা করেছি যা এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে: বিদেশি সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশনের আগে দেশীয় মানবসম্পদের উন্নয়ন; এআই মডেলে বাংলার পূর্ণাঙ্গ আধিপত্য নিশ্চিত করা; বিশ্বমঞ্চের যে কূটনৈতিক মিশনগুলো তৈরি পোশাক বা পাটের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের ডিজিটাল প্রযুক্তি বিক্রি করবে; এমন আন্তর্জাতিক চুক্তি যা কেবল সেবা ভাড়া না দিয়ে দেশের মাটিতে প্রযুক্তি ও জ্ঞানের স্থায়ী স্থানান্তর ঘটাবে; এবং এমন একটি ডিজিটাল পরিমণ্ডল যা দেশের নারীদের জন্য হবে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। ট্রিলিয়ন ডলারের ভবিষ্যৎ কোনো সস্তা স্লোগানে কোড করা সম্ভব নয়; এই ভবিষ্যৎ কোড করা হবে আমাদের তরুণ উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানীদের দেশপ্রেমিক হাতেই।

দূরত্ব কমতে শুরু করেছে। এখন দৃঢ় পদক্ষেপে বাকি পথটুকু পাড়ি দিয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের আত্মমর্যাদাশীল প্রযুক্তি-নেতৃত্বে পৌঁছানোই আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।


লেখক || পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার; প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কূটনীতি বিশ্লেষক


সম্পাদকীয় নোট ||  

আলোচ্য নীতি-নির্ধারণী নিবন্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং ডেটা সার্বভৌমত্ব নিয়ে সরকারের কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত দূরদর্শিতা প্রতিফলিত হয়েছে। উন্নয়নশীল একটি দেশকে প্রযুক্তির পরনির্ভরশীল বাজার থেকে বৈশ্বিক ফ্রন্টলাইনের নির্মাতায় রূপান্তরের বাস্তবসম্মত পথরেখা তুলে ধরা হয়েছে এতে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের তাগিদে নিবন্ধটি সম্পাদকীয় প্রমিতকরণসহ প্রকাশ করা হলো।


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।