মস্কোর ফোরামে বললেন ফকির মাহবুব আনাম

শিশুর অনলাইন সুরক্ষায় বৈশ্বিক সহযোগিতার আহ্বান বাংলাদেশের

  • শিশুদের সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময় ও যৌথ উদ্যোগের বিকল্প নেই। 
  • অনলাইন শোষণ প্রতিরোধে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা আইনের পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো জরুরি।
  • শিশুদের অধিকার রক্ষায় বৈশ্বিক জোটে সক্রিয়ভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করল বাংলাদেশ।

শিশুর অনলাইন সুরক্ষায় বৈশ্বিক সহযোগিতার আহ্বান বাংলাদেশের
৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৪০  

সাইবার স্পেস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের যুগে নতুন প্রজন্মের নিরাপদ মানসিক বিকাশ এবং অনলাইন ঝুঁকি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদারের তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ। অ্যালগরিদম ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কের বিস্তৃতিতে শিশুদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে সমন্বিত প্রযুক্তিগত ও আইনি ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার রাশিয়ার মস্কোয় অনুষ্ঠিত “Digital Childhood Without Borders: Best International Practices for Child Safety Online” শীর্ষক আন্তর্জাতিক বিজনেস আইটি ব্রেকফাস্টে বক্তব্য প্রদানকালে গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য জানানো হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে বক্তব্য রাখেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে আয়োজক গ্লোবাল ডিজিটাল ফোরাম এবং রাশিয়ার অ্যালায়েন্স ফর দ্য প্রোটেকশন অব চিলড্রেন ইন দ্য ডিজিটাল এনভায়রনমেন্টকে এই সময়োপযোগী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার জন্য ধন্যবাদ জানান। বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা এই আন্তর্জাতিক নীতি-নির্ধারণী ফোরামে অংশগ্রহণ করেন।

বক্তব্যে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শিশুরা শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের জন্য অনলাইন জগতের অবারিত সুযোগ গ্রহণ করছে। তবে একই সঙ্গে তারা নতুন ও পরিবর্তনশীল বিভিন্ন ধরনের সাইবার ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আর কেবল অভিভাবক বা শিক্ষকদের একক দায়িত্ব নয়; বরং সরকার, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজসহ সব অংশীজনের এটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।

আইনি কাঠামোর বিষয়ে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ শিশুদের ডেটা সুরক্ষা এবং অনলাইন শোষণ থেকে রক্ষায় ‘সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট’সহ সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তবে শুধু অভ্যন্তরীণ জাতীয় আইন দিয়ে বৈশ্বিক এই চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, সেরা চর্চা এবং কার্যকর ও বিস্তৃত পরিসরে প্রয়োগযোগ্য কারিগরি সমাধান বিনিময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে উত্থাপিত ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স টু প্রটেক্ট চিলড্রেন ইন দ্য ডিজিটাল এনভায়রনমেন্ট’-এর খসড়া যৌথ বিবৃতি এবং কার্যপরিধি পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে রুশ ফেডারেশনকে এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের জন্য অভিনন্দন জানান তিনি। প্রস্তাবিত দলিলটি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের আলোকে অধিকারভিত্তিক একটি সমন্বিত কাঠামো উপস্থাপন করেছে উল্লেখ করে তিনি এই উদ্যোগের তিনটি মূল নীতির প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সমর্থন জানান: শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, সব অংশীজনের যৌথ দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সেরা অনুশীলন বিনিময় করা।

তিনি আরও বলেন, এই জোটে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলসহ বিশ্বের সব ভৌগোলিক অঞ্চলের ন্যায্য ও সুষম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে বহুপক্ষীয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এতে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও অভিজ্ঞতা বৈশ্বিক কৌশল প্রণয়নে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল চাইল্ডহুড সেফটি ইনডেক্স প্রণয়ন এবং গবেষণা ও সেরা চর্চা বিনিময়ের জন্য একটি বিশেষ কারিগরি প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে বাংলাদেশ স্বাগত জানায়।

ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, শিশু, অভিভাবক ও শিক্ষকদের কারিগরি সাক্ষরতা বাড়ানো এই বৈশ্বিক লড়াইয়ের প্রধান ভিত্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ ইমার্জিং প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও জনসচেতনতা গড়ে তোলা গেলে সাইবার বুলিং, অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়বস্তু এবং অনলাইন ক্ষতির বিরুদ্ধে একটি কার্যকর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তিনি জানান, বৈশ্বিক এই জোটের যৌথ বিবৃতিতে বর্ণিত নীতিমালার প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ অঙ্গীকার রয়েছে। অনলাইন বুলিং, যৌন নিপীড়ন, ডেটা চুরি এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ক্ষতি থেকে শিশুদের রক্ষায় অ্যালায়েন্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী বাংলাদেশ। জাতীয় নীতিমালা ও বৈশ্বিক কাঠামোর মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরিতে এই ফোরাম ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।

বক্তব্যের ইতি টেনে মন্ত্রী বলেন, ভৌগোলিক সীমানা বা জাতীয়তা নির্বিশেষে প্রতিটি শিশু যেন নিরাপদ, সৃজনশীল ও নির্ভীকভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারে—এমন একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বাংলাদেশ কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি জানান, আজকের সম্মিলিত উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিনিয়োগ এবং ডিজিটাল ভবিষ্যৎকে শুধু কানেক্টেড নয়, বরং নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিশুবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।

//ডিবিটেক/এমএমএ//এসএমই/এমএসআই//