উপশিরোনাম: চার সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শুরু
রূপপুরের নিরাপত্তায় দক্ষ জনবল গড়ার উদ্যোগ
- রূপপুরের প্রথম ক্রিটিক্যালিটি অর্জিত হয়েছে ১১ অক্টোবর ২০২৬।
- চার সপ্তাহের প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন ৪০ নবীন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী।
- তিন থেকে পাঁচ বছরে বছরে ৩–৫ আন্তর্জাতিক মানের রেগুলেটর তৈরির লক্ষ্য।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে পারমাণবিক খাতে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপারেশনাল—উভয় পর্যায়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ), বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা), বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বায়েক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
১৮ অক্টোবর, রবিবার বায়েরার আয়োজনে চার সপ্তাহব্যাপী বেসিক প্রফেশনাল ট্রেনিং কোর্সের (বিপিটিসি) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রশিক্ষণটি ১২ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চলবে। এতে বায়েরা, বায়েক ও নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ৪০ জন নবীন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী অংশ নিচ্ছেন।
নিরাপত্তা সংস্কৃতি ও দক্ষ জনবলে গুরুত্ব
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ক্রিটিক্যালিটি ১১ অক্টোবর ২০২৬ সফলভাবে অর্জিত হয়েছে। শিগগিরই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে কেন্দ্রটি দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি দেশের তরুণ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর ভাষ্য, প্রযুক্তি একা পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না; এর সঙ্গে যুক্ত জনবলকে প্রশিক্ষিত, সচেতন ও দক্ষ হতে হবে। পারমাণবিক খাতে উৎপাদনের পাশাপাশি পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা জরুরি।
প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে তিনি আইএইএ বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করার আহ্বান জানান। দক্ষতা উন্নয়নে কোনো দ্বিধা বা সংকোচ না রেখে প্রশিক্ষণে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর আশা, এই কর্মসূচি দেশের পারমাণবিক খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের পারদর্শিতা প্রশংসনীয় উল্লেখ করে সচিব বলেন, আইএইএসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের ন্যায্য অবস্থান ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
বছরে ৩–৫ জন আন্তর্জাতিক মানের রেগুলেটর তৈরির লক্ষ্য
বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বায়েরা থেকে প্রতিবছর তিন থেকে পাঁচজন আন্তর্জাতিক মানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটর তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। তাঁর প্রত্যাশা, তাঁরা দেশের অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গবেষণা সংস্থাতেও অবদান রাখতে পারবেন।
বায়েরাকে আরও শক্তিশালী করতে তিনি তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেন—পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলা, মানবসম্পদ ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করে সেবা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি। বক্তব্য শেষে তিনি প্রশিক্ষণ কোর্সের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন এবং অংশগ্রহণকারীদের সফলতা কামনা করেন।
পারমাণবিক নিরাপত্তায় প্রশিক্ষণের ভূমিকা
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, প্রশিক্ষণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা, জ্ঞান ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ১৯৯৮ সালে আইএইএ প্রণীত এই প্রশিক্ষণ কোর্স পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা ও পরিচালনার প্রতিটি পর্যায়ে কারিগরি এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, কোর্সে পারমাণবিক পদার্থবিদ্যা, বিকিরণ সুরক্ষা, নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের নকশা, জ্বালানি চক্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা মূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীরা অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে দেশে নিরাপদ, সুরক্ষিত ও টেকসই পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির ওপর জোর
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বায়েরা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান আইএইএ প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়তার জন্য সংস্থাটিকে ধন্যবাদ দেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে যেকোনো পারমাণবিক ও তেজস্ক্রিয় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবুল খায়ের মোঃ আক্কাস আলী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইএইএর টেকনিক্যাল অফিসার রাহিলা হাম্মাদ।
চার সপ্তাহের এ প্রশিক্ষণে আইএইএ থেকে আসা চার কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ দেবেন। তাঁরা হলেন টেকনিক্যাল অফিসার রাহিলা হাম্মাদ, আইএইএ কর্মকর্তা বেনোইট গ্যাব্রিয়েল এবং আইএইএ বিশেষজ্ঞ মেহমেত তোম্বাকোগলু ও বারিস গুরনার। তাঁদের সঙ্গে দেশীয় বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরাও প্রশিক্ষণ পরিচালনা করবেন।
অনুষ্ঠানে বায়েরা, বায়েক ও এনপিসিবিএলের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, ৪০ জন নবীন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী প্রশিক্ষণার্থী এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
//ডিবিটেক/এসটিএমএএম/এসএমপি/বিপিও//





