আন্তঃসংযোগঃ বাংলা QR

আর্থিক খাতে আন্তঃসংযোগ ও বাংলা কিউআর: মনোপলি ভাঙার নতুন দিগন্ত

আন্তঃসংযোগঃ বাংলা QR
৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:০৩  

  • আর্থিক ও প্রযুক্তি খাতে উন্মুক্ত আন্তঃসংযোগ না থাকলে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য ও ক্লোজড সিস্টেম তৈরি হয়।
  • নব্বইয়ের দশকে টেলিকমের বিটিটিবি-জিপি সংকট ২০০৭ সালে আইসিএক্স চালুর মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান পেয়েছিল।
  • ২০১২ সালে এনপিএসবি চালুর সময়েই এমএফএস ও ব্যাংকের মধ্যে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হলেও তা দীর্ঘ ১৪ বছর পিছিয়ে ছিল।
  • ২০২২ সালে ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘বিনিময়’ প্ল্যাটফর্মটি অকার্যকর হওয়ায় ২০২৫ সালের আগস্টে তা বন্ধ হয়ে যায়।
  • ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ব্যক্তিগত বাংলা কিউআর ও এনপিএসবি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যাংক, এমএফএস ও ই-ওয়ালেটের মধ্যে সরাসরি ব্যক্তি পর্যায়ের (P2P) অর্থ স্থানান্তর চালু হচ্ছে।

সম্প্রতি গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেড’ একটি জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘জিপে’ (GPAY) নামে পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (PSP) বা ই-ওয়ালেট সেবা চালু করেছে। এ উদ্যোগ দেখে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—আমার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে কি সরাসরি একজন জিপে গ্রাহককে টাকা পাঠানো সম্ভব? যেখানে আজও বিকাশ ও নগদের মধ্যে সরাসরি অর্থ লেনদেনের পথ তৈরি হয়নি, সেখানে বিকাশ কি জিপেকে দ্বিপাক্ষিক আন্তঃসংযোগ দেবে? গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ের এই পূর্ণাঙ্গ আন্তঃসংযোগ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

টেলিকম বা ফাইন্যান্সিয়াল খাতের মতো গণসেবায় যখন একাধিক অপারেটর সক্রিয় থাকে, তখন তাদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন ‘আন্তঃসংযোগ’ বা ইন্টারঅপারেবিলিটি বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। আন্তঃসংযোগের অনুপস্থিতি একটি উন্মুক্ত ব্যবস্থার পরিবর্তে ক্লোজড সিস্টেম (Closed System) তৈরি করে। এই ব্যবস্থা কেবল সেবার মান নয়, বরং গোটা বাজার অর্থনীতি ও নাগরিক সুবিধার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

আন্তঃসংযোগ কার্যকর করতে নির্দিষ্ট হারে ফি বা চার্জ নির্ধারিত থাকে। এই সংযোগ দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক (Bilateral) চুক্তিতে হতে পারে, অথবা নিয়ন্ত্রক সংস্থা একটি নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ কিংবা নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে তা সম্পাদন করতে পারে। টেলিকম খাতের ভয়েস কলে প্রতি মিনিট এবং আর্থিক খাতে প্রতি লেনদেন বা মোট লেনদেন মূল্যের শতকরা হারে এই ইন্টারকানেকশন চার্জ ধার্য করা হয়। ফলে নিজস্ব নেটওয়ার্কে (অন-নেট) সেবামূল্য কম হলেও ভিন্ন নেটওয়ার্কে (অফ-নেট) সেবা দিতে গেলে বাড়তি আন্তঃসংযোগ চার্জ যুক্ত হয়।

বাজারে যদি এক বা একাধিক প্রভাবশালী বড় অপারেটরের আধিপত্য থাকে, তবে তারা ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তঃসংযোগ না দিয়ে একচেটিয়া (Monopoly) বা স্বল্পচেটিয়া (Oligopoly) পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে তৎকালীন সরকারি ল্যান্ডফোন অপারেটর বিটিটিবির কাছ থেকে যথাযথ আন্তঃসংযোগ না পেয়ে গ্রামীণফোন বাধ্য হয়ে ‘জিপি-টু-জিপি’ নামে একটি ক্লোজড সিস্টেম সেবা চালু করেছিল। পরবর্তীতে মোবাইল অপারেটররা একত্রিত হয়ে বিটিটিবিকে এড়িয়ে ‘মোবাইল-টু-মোবাইল’ সংযোগ গড়ে তোলে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে (ITU/GSMA) এ ঘটনা একসময় কেস স্টাডি হিসেবে আলোচিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিএক্স (Interconnect Exchange) লাইসেন্স প্রবর্তনের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষের নিরপেক্ষ আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করে সব অপারেটরের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতেও আন্তঃসংযোগের ইতিহাস দীর্ঘ ও জটিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্পূর্ণ কায়িক বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে চেক ক্লিয়ারিং করত। ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সেমি-অটোমেটেড ব্যবস্থায় ব্যাংকের প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বসে চেক নিষ্পত্তি করতেন। ২০০৫-০৬ সালের দিকে ব্যাংকগুলো নিজস্ব অনলাইন কোর ব্যাংকিং ও আন্তঃশাখা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, যা পরবর্তীতে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও অ্যাপভিত্তিক সেবায় রূপ নেয়।

আর্থিক কাঠামোর আধুনিকায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের অক্টোবরে চালু করে ‘বাংলাদেশ অটোমেটেড চেক প্রসেসিং সিস্টেমস’ (BACPS) এবং এমআইসিআর (MICR) প্রযুক্তি। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাগুজে চেকের নির্ভরতা কমাতে চালু হয় ‘বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক’ (BEFTN)—যার মাধ্যমে করপোরেট বেতন, রেমিট্যান্স, ইউটিলিটি বিল ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অর্থ ইলেকট্রনিক উপায়ে স্থানান্তর শুরু হয়। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ’ (NPSB), যা আন্তঃব্যাংক এটিএম, পয়েন্ট অব সেলস (POS) এবং অ্যাকাউন্ট ফান্ড ট্রান্সফারকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই এক ব্যাংকের কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের এটিএম থেকে টাকা তোলার পথ উন্মুক্ত হয়। তবে এনপিএসবি চালুর সময়েই মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS) দ্রুত বিকাশ লাভ করলেও অজ্ঞাত কারণে এমএফএস অপারেটরদের এই সুইচে যুক্ত করা হয়নি। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের অক্টোবরে তাৎক্ষণিক উচ্চমূল্যের (এক লাখ টাকার বেশি) লেনদেনের জন্য ‘বাংলাদেশ রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট’ (BD-RTGS) চালু করা হয়।

বিদ্যমান শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মগুলো কার্যকর থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালের অক্টোবরে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের ‘আইডিয়া’ (iDEA) প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বিনিময়’ নামে পৃথক একটি ইন্টারঅপারেবল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় যাচাই ছাড়াই রাজনৈতিক বিবেচনায় চাপিয়ে দেওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি কার্যকারিতা ও সুশাসনের অভাবে ব্যর্থ হয় এবং ২০২৫ সালের আগস্টে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক গেটস ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ওপেনসোর্স ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘মজালুপ’ (Mojaloop) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা ২০২৭ সালের জুলাই নাগাদ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় সার্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ (Bangla QR) প্রবর্তন আর্থিক ডিজিটাইজেশনের ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি। এই কাঠামোর ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের একক কিউআর কোড থাকবে না; বরং একটি অভিন্ন কিউআর কোডেই বিকাশ, নগদ এবং সব ব্যাংক ও ই-ওয়ালেট অ্যাপ থেকে মূল্য পরিশোধ করা যাবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত লেনদেনে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (MDR) মওকুফ করা হয়েছে, যা আগে প্রায় ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। এই পেমেন্টগুলো মূলত ২০১২ সালে স্থাপিত এনপিএসবি অবকাঠামোর মাধ্যমেই তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি হচ্ছে।

এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ব্যক্তিগত বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে বা ইমেজ আপলোড করে এক আর্থিক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে (ব্যাংক, এমএফএস ও পিএসপি) ব্যক্তি পর্যায়ের সরাসরি অর্থ স্থানান্তর (P2P) সুবিধা চালুর প্রস্তুতি চলছে।

দীর্ঘ ১৪ বছরের নীতিগত দোদুল্যমানতা পেরিয়ে অবশেষে দেশের আর্থিক খাতে একটি সমন্বিত আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা কার্যকর রূপ পেতে যাচ্ছে। নতুন এই মুক্ত বাজার পরিকাঠামোয় প্রচলিত ব্যাংক, এমএফএস, পিএসপি এবং সদ্য ছাড়পত্র পাওয়া ডিজিটাল ব্যাংকগুলো কীভাবে প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান গড়ে তোলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


লেখক পরিচিতি || প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), ইন্টারক্লাউড লিমিটেড।


এডিটরস নোট || আলোচ্য নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ লেখকের নিজস্ব। দেশের পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের সংস্কার, ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং আন্তঃসংযোগ নীতিমালার বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার স্বার্থে লেখাটি সম্পাদকীয় প্রমিতকরণসহ প্রকাশ করা হলো।



দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।